সোমবার, নভেম্বর 29, 2021
সোমবার, নভেম্বর 29, 2021
সোমবার, নভেম্বর 29, 2021
spot_img
Homeরায়পুরদূর্নীতি ও অনৈতিক সম্পর্কের বেড়াজালে আনন্দ স্কুলের টিসি আলতাফ

দূর্নীতি ও অনৈতিক সম্পর্কের বেড়াজালে আনন্দ স্কুলের টিসি আলতাফ

লক্ষ্মীপুর জেলার কমলনগর উপজেলার আনন্দ স্কুলের টিসি আলতাফের বিরুদ্ধে অসংখ্য দূর্নীতি ও নৈতিক অবক্ষয়ের প্রমাণ পাওয়া গেছে। শিক্ষার মতো মানুষ গড়ার কারিগরের কারখানায় একটি নিকৃষ্ট মানুষের কি করে আগমন হলো-জনমনে তাই এমন হাজারো প্রশ্ন জেগেছে এখন।

শিক্ষা বিস্তারে অনেকগুলো মহতি উদ্যোগের মধ্যে সরকারের আনন্দ স্কুল একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। বিশ্ব ব্যাংকের আর্থিক সহায়তায় শিক্ষা অধিদপ্তর কর্তৃক পরিচালিত ‘রিচিং আউট অব স্কুল চিলড্রেন-রস্ক’ প্রকল্পের আওতায় এদেশের লক্ষ লক্ষ শিশু আজ নিরক্ষরতার অভিশাপ মুক্ত। উপকূলীয়, হাওড় ও পাহাড়ী অঞ্চলের মত দূর্গম এলাকার হতদরিদ্র পরিবারগুলোর শিশুদের শিক্ষার আওতায় আনার জন্য সরকারের এই বিশেষ প্রকল্প। যারা কখনো প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আসেনি অথবা যারা প্রাথমিক বিদ্যালয় হতে ঝরে পড়ে গেছে- এমন ৮ বছর বয়স থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের নিরক্ষরমুক্ত ভবিষ্যৎ বিবেচনায় ‘‘আর নয় ঝরে পড়া, আনন্দ স্কুলে লেখাপড়া’’ এই স্লোগান নিয়ে শুরু হওয়া আনন্দ স্কুলের আজ সারা দেশব্যাপী ব্যাপক সুনাম রয়েছে। অভিশাপমুক্ত জীবনের গ্লানি পেছনে ফেলে আজ লক্ষ লক্ষ ছাত্র-ছাত্রী নতুন করে জীবনের মানে খুঁজে পেয়েছে। ২৫ থেকে ৩৫ জন নতুন বা ঝরে পড়া ছাত্র-ছাত্রী নিয়ে শুরু হয় আনন্দ স্কুল। যেখানে থাকে ৯ সদস্য বিশিষ্ট একটি কেন্দ্র ব্যবস্থাপনা কমিটি (সিএমসি), যার সভাপতি একজন অভিভাবক ও সম্পাদক শিক্ষক নিজেই। যেই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ক্যাচমেন্ট এলাকায় উক্ত আনন্দ স্কুলটি অবস্থিত সেই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, ঐ ওয়ার্ডের মেম্বার, মহিলা মেম্বার, একজন শিক্ষানুরাগীসহ আরো তিনজন অভিভাবক সদস্য উক্ত কমিটিতে থাকে। প্রতি সিএমসির সভাপতি ও সম্পাদকের নামে সোনালী ব্যাংকে একটি হিসাব থাকবে, যেখানে কেন্দ্র পরিচালনার সকল অর্থ শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রকল্প অফিস হতে আসবে। স্থানীয় সংসদ সদস্য আলহাজ্ব মোহাম্মদ আবদুল্যাহর আন্তরিক প্রচেষ্টায় সুন্দর এই মহৎ প্রকল্পটি লক্ষ্মীপুর জেলার কমলনগর উপজেলায় চালু হয় ২০১৪ সালের জুন মাসে। এই পর্যন্ত কমলনগর উপজেলায় সর্বমোট ১৩২টি আনন্দ স্কুল চালু হয়, যাতে শিক্ষা গ্রহন করছে ৪৬২০ জন ছাত্র-ছাত্রী। কেন্দ্র স্থাপনের জন্য সিএমসি একটি ঘর ভাড়া নিবে, যার ভাড়া হবে মাস প্রতি ৪০০ টাকা। কেন্দ্র সাজানোর জন্য সরকার ৩৫০০ টাকা কেন্দ্র প্রতি এককালীন, ছাত্র-ছাত্রীর ছবি উঠানো বাবৎ ১২৫ টাকা, পোষাক প্রতি ছাত্র ৪০০ টাকা বছরে একবার, উপকরণ প্রতি ছাত্র ১২০ টাকা বছরে একবার, ছাত্র প্রতি উপবৃত্তি ৮০ টাকা মাসে, পরীক্ষার ফি বাবৎ প্রতি পরীক্ষা ৫০ টাকা হারে প্রতি ছাত্র বছরে ১০০ টাকা পাবে। এই সকল টাকা সিএমসি উত্তোলন করে কেন্দ্র পরিচালনার সকল ব্যয়ভার বহন করবে। সিএমসি নিজেই ঘর ভাড়া প্রদান, ছাত্র-ছাত্রীদের পোষাক তৈরী, উপকরণ ক্রয়, কেন্দ্র ব্যবস্থাপনা, পরীক্ষার ফি প্রদান করবে। কিন্তু কোন প্রকার নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে উপজেলা রস্ক প্রকল্পের ট্রেনিং কো-অর্ডিনেটর (টিসি) আলতাফ হোসেন নিজের একক সিদ্ধান্তে নিজেই পোষাক ও উপকরণ নিতে আনন্দ স্কুলের সকল শিক্ষককে বাধ্য করেন। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারী মাসে দীর্ঘ প্রতিক্ষার পর শিক্ষকদের শুধু মাত্র তিন হাজার টাকা হারে চার মাসের বেতন ও চারশত টাকা হারে চার মাসের ঘর ভাড়া প্রদান করে তিনি নিজেই বাকী টাকার নগদ চেক নিজ হাতে গ্রহন করেন। যদিও কোন চেক বা নগদ অর্থ টিসির গ্রহণের অনুমতি নেই। দু’চার জন শিক্ষক চেক দিতে অনিচ্ছা প্রকাশ করলে তিনি তাদের স্কুল বন্ধ করে দিবেন বলে হুমকি দেন। এসব ব্যাপারে তিনি উপজেলা শিক্ষা অফিসার ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারও কোন পরামর্শ নেননি বলে জানা গেছে। ঢাকার “রাজু গার্মেন্টস” নামক একটি গার্মেন্টসের নামে তিনি নিজে রেজুলেশন তৈরী করে শিক্ষকদের মাঝে বিতরণ করেন। যদিও পোষাকের গায়ে কোন গার্মেন্টেসের নাম ছিল না এবং মেয়েদের পোষাকে স্কার্ফ ও ফিতা দেয়া হয়নি। প্রায় প্রত্যেক স্কুলে ১০/১২জন করে কম ছাত্র-ছাত্রীর পোষাক বিতরণ করেন, যদিও সকল স্কুলের পোষাকের সকল বিল বাবৎ তিন লক্ষাধিক টাকা তিনি তুলে নেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন শিক্ষিকা বলেন, ‘আমরা বেশিরভাগ মহিলা শিক্ষিকা এবং আমরা বেশিরভাগ সেলাই কাজে পারদর্শী। সুতরাং আমরা কাপড়ের মান সম্পর্কে জানি। চারশত টাকার বিনিময়ে মাত্র ষাট টাকা দরে পোষাক দেওয়া হয় আমাদের। আমরা নিতে অপারগতা প্রকাশ করলে আমাদের বলে এগুলো নাকি প্রকল্প পরিচালকের কার্যালয় হতে দেয়া হয়েছে। প্রকল্প অফিসের রেজা সাহেব ও মল্লিক সাহেব নাকি বিষয়টা দেখেন। তারা নাকি প্রকল্প পরিচালকের খুব কাছের লোক।’ চর মার্টিন ইউনিয়নের ৭নং পূর্ব চর মার্টিন আনন্দ স্কুলের শিক্ষিকা শাহাদা আক্তার নিজের স্কুলের পোষাক সিএমসির মাধ্যমে তৈরী করার ইচ্ছা প্রকাশ করলে টিসি আলতাফ তাকে শাসিয়ে বলে, ‘তোমার স্কুলের ক্ষতি হলে আমি জানি না।’ তাকে বার বার পোষাক বানাতে নিষেধ করে হুমকি ধমকি দেয় টিসি। দীর্ঘ একমাস শাহাদাকে সিএমসি’র হিসাব থেকে অর্থ উত্তোলনের জন্য ছাড়পত্র প্রদান করা হয়নি শুধুমাত্র স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের পোষাকের মাপ টিসিকে দেয়নি বলে। পরবর্তীতে শাহাদা আক্তার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর লিখিতভাবে বিষয়টি জানায়। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা টিসি আলতাফকে ঢেকে দ্রুত শাহাদার স্কুলের বিল দিতে বললে তখন তিনি শাহাদাকে পুরো বিলের ছাড়পত্র প্রদান করেন।

প্রতিটা পরীক্ষার পূর্বে টিসি আলতাফ শিক্ষকদের থেকে ছাত্র প্রতি সাত টাকা হারে প্রতি প্রশ্নের জন্য নেওয়া হলেও পরবর্তীতে পরীক্ষার ফিস ঠিক মতো দেয়া হয়নি। উপজেলার হাজিরহাট দিপু ষ্টেশনারী থেকে খুব নি¤œ মানের উপকরণ দেয়া হয়। দোকানের মালিক দিপুর সাথে কথা বলে জানা যায় যে, টিসি আলতাফ উপকরণ বিল থেকে ষাট হাজার টাকা কমিশন নেয়। যার কারণে দিপু নি¤œমানের উপকরণ দিতে বাধ্য হয়। শিক্ষকদের পোষাক বিতরণের সময় ঢাকা থেকে আগত গার্মেন্টসের একজন সুপারভাইজার পোষাক দিয়ে নগদ টাকা নিয়ে যায়। টিসি আলতাফ মোটা অংকের কমিশনের বিনিময়ে তাকে বিল প্রদান করে। পোষাকের এক লক্ষ পঁয়ত্রিশ হাজার টাকার চেক সোনালী ব্যাংক, কমলনগর শাখায় ভাঙ্গাতে গিয়ে টিসি আলতাফ ব্যাংক ম্যানেজার হাতে ধরা পড়ে। ব্যাংক ম্যানেজার তাকে পোষাকের টাকা নেওয়ার কারণ জিজ্ঞাসা করলে তিনি ম্যানেজারের কাছে মাপ চেয়ে চলে আসেন। ব্যাংক ম্যানেজার উক্ত বিষয়টি ঢাকা প্রকল্প পরিচালকের কার্যালয়ে টেলিফোনে অবহিত করেন। পরবর্তীতে টিসি আলতাফ রাতের অন্ধকারে একাধিকবার ম্যানেজারের পা জড়িয়ে ধরে মাপ চান। তবুও শেষ রক্ষা হয়নি তার। ব্যাংক ম্যানেজার বিষয়টি আবারও প্রকল্প অফিসে জানিয়ে দেন। ডাক পড়ে টিসি আলতাফের প্রকল্প অফিসে। অবশেষে প্রকল্প অফিসে ত্রিশ হাজার টাকা খরচ করে রেহাই পায় আলতাফ।

বিগত ০১/০৩/১৫খ্রিঃ তারিখে নিজের পছন্দ মত ত্রিশজন শিক্ষককে নোয়াখালীতে নিয়ে পনের দিনের আবাসিক বেসিক ট্রেনিং দেয়। কিন্তু সেখানে নিন্মমানের খাবার পরিবেশন করা, আবাসিকের অপরিচ্ছন্নতা ইত্যাদি নিয়ে অনেক শিক্ষক অভিযোগ তোলেন। সূত্র জানায় সেখানে আবাসিকের ম্যানেজারের সাথে গোপন চুক্তি করে টিসি আলতাফ প্রদত্ত বিলের মোটা অংকের টাকা মেরে দেয়।

একটি বেসরকারী কলেজে শিক্ষকতার মাধ্যমে কর্মজীবনে আসা আলতাফ মানষিক সমস্যার কারণে চাকরী হারায়। একটু সুস্থ হওয়ার পর বড় একজন আমলার আত্মীয় হওয়ার কারণে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে রস্ক প্রকল্পে ট্রেনিং কো-অর্ডিনেটর হিসেবে চাকরী জুটে। অনেকের সাথে এখনো তিনি অশোভন আচরণ করেন। তাই অনেকে তাকে এখনো মানষিক রুগি মনে করে। উপজেলায় দ্বিতীয় ধাপে প্রতিষ্ঠিত হওয়া ৩৮টি আনন্দ স্কুলের মধ্যে ৯৬নং বশির মাতাব্বর আনন্দ স্কুল, ৯৭নং দঃ চর লরেঞ্চ আনন্দ স্কুল, ১৩১নং চর ফলকন উচ্চ বিদ্যালয় সংলগ্ন আনন্দ স্কুল ও ১৩২নং মফিজ উল্যাহ হাজী বাড়ি আনন্দ স্কুল অনুমোদন হয়নি বলে আটকে রাখে। পরবর্তীতে ঐ চারটি স্কুলে দশ হাজার করে চল্লিশ হাজার টাকার বিনিময়ে তাদের গোপনে ঢেকে এনে বই দেয়। অসহায় গরীব শিক্ষকগণ নিরুপায় হয়ে তাকে ঘুষের টাকা দিতে বাধ্য হয়। টিসি আলতাফের বিরুদ্ধে আরো কিছু অভিযোগ রয়েছে যে, তিনি বিভিন্ন স্কুলে মাসিক ঘুষের বিনিময়ে শিক্ষকদের ছাড় দিয়ে যাচ্ছেন। ঐ সকল স্কুলের শিক্ষকরা তাদের স্কুল চালায় না বললেই চলে। টিসি আলতাফ তা জানা সত্ত্বেও না দেখার মতো রয়েছেন। চর কালকিনি ইউনিয়নে অবস্থিত ৫৯নং রফিকগঞ্জ আনন্দ স্কুলের শিক্ষক সোলায়মান সিলকো ফার্মাসিউটিক্যাল্স নামক একটি ঔষধ কোম্পানীর মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ। আনন্দ স্কুলের পরিপত্রে রয়েছে সকাল ৯টা থেকে ১টা পর্যন্ত খোলা থাকবে, যখন সোলায়মান ঔষধ কোম্পানীর দায়িত্বে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত ব্যস্ত থাকেন। এই প্রতিবেদক সরেজমিনে পরপর দুই দিন গিয়েও স্কুল খোলা পায়নি। তাছাড়া তার ক্যাচমেন্ট এলাকার মেম্বার, মহিলা মেম্বার, স্কুলের প্রধান শিক্ষকের সাথে কথা বলে জানা গেছে যে, দেড় বছর পূর্বে চালু হওয়া এই আনন্দ স্কুলটির কখনো কোন মাসিক মিটিং হয়েছে বলে তারা জানে  না। অথচ প্রতি মাসে একটি করে সিএমসির মাসিক সভা দেখাতে হয় এবং বেতন-ভাতাসহ ঘর ভাড়া উঠাতে রেজুলেশনে তাদের স্বাক্ষর লাগে। তাহলে প্রশ্ন হলো কোথা থেকে এসব স্বাক্ষর আসে? কে দেয় এসব স্বাক্ষর? তাছাড়া প্রধান শিক্ষক জানায় ঐ আনন্দ স্কুলের ১৬/১৭ জন ছাত্র-ছাত্রী তার সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের। আলাদা স্কুল ঘর তৈরী করে ভাড়া নিয়ে স্কুল চালানোর কথা থাকলেও স্থানীয় মসজিদের মক্তবে চালানো হয় স্কুলটি। কোন মাসিক ভাড়াও মসজিদ কর্তৃপক্ষকে দেয়া হয় না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষক বলে, বিগত ১৫/০৫/২০১৫ খ্রিস্টাবে অনুষ্ঠিত আনন্দ স্কুলের শিক্ষকদের উপজেলা মাসিক সভায় শিক্ষক সোলায়মান প্রকাশ্যে বক্তব্য রাখে এই বলে যে, ‘আমি বহুদিন স্কুল সময়ে লক্ষ্মীপুর আমার ব্যক্তিগত কাজে ব্যস্ত থাকি। টিসি ফোন দিলে বলি যে, আমি লক্ষ্মীপুর। কই আমারতো কোন সমস্যা হয় না। সুতরাং আপনারা স্কুল না চালালে টিসিকে ম্যানেজ করে চলবেন।’ মাসিক সভায় প্রকাশ্যে এসব দৃষ্টতাপূর্ণ বক্তব্য দিয়ে শিক্ষকদেরকে শিক্ষা কার্যক্রম থেকে নিরুৎসাহিত করা সত্ত্বেও পাশে বসে থাকা টিসি আলতাফ ছিল নিরব দর্শক। শিক্ষক সোলায়মানের মোবাইল ফোনে চেষ্টা করে তাকে পাওয়া যায়নি।

আরেকজন শিক্ষিকা আকলিমা বেগম, পাটোয়ারীর হাট ইউনিয়নের ৯১নং মাতাব্বর পাড়া আনন্দ স্কুলে দায়িত্ব রত। তিনি ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রমের বর্তমানের একজন নিয়মিত শিক্ষিকা। তার বাড়ির পাশে অবস্থিত মসজিদের মক্তবে তিনি ইসলামিক ফাউন্ডেশনের শিক্ষা কার্যক্রম চালান। সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত আকলিমার ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ক্লাস চলে, যখন তিনি আনন্দ স্কুলে পাঠ দেওয়ার কথা। অন্য কোন সময়ে স্কুল চালানোর কোন অনুমতিপত্রও তিনি দেখাতে পারেননি। বিগত ০১/০৩/১৫ইং থেকে ১৫/০৩/১৫ইং পর্যন্ত নোয়াখালীতে বেসিক ট্রেনিং রত অবস্থায় ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে কোন ছুটি নেওয়া হয়নি। এ ব্যাপারে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উপজেলা সুপারভাইজার মাইন উদ্দিন ও জেলা উপ-পরিচালক রাজ্জাকুল হায়দারের সাথে যোগাযোগ করা হলে আকলিমা উক্ত তারিখে কোন ছুটি নেয়নি বলে জানান। স্কুলের সিএমসির সভাপতি আকলিমার স্বামী মাকছুদুর রহমান, যার কোন সন্তান অত্র স্কুলে পড়ালেখা করে না। বড় মেয়ে রিয়া দশম শ্রেণীর ছাত্রী ও একমাত্র ছেলে অনিক মধ্য চর ফলকন সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র। অথচ একজন অভিভাবক হবেন সিএমসির সভাপতি এমনটিই পরিপত্রে উল্লেখ আছে। কিছু ছাত্র-ছাত্রীর বাড়িতে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পোষাকের জন্য প্রতি ছাত্র ৫০ টাকা, বইয়ের জন্য ২০ টাকা ও পরীক্ষার ফিস বাবৎ ২০ টাকা প্রতি ছাত্র থেকে নেওয়া হয়েছে। উপবৃত্তির টাকা কোন ছাত্র-ছাত্রী এক-তৃতীয়াংশের বেশি পায়নি। যা সম্পূর্ণ নিয়ম বহির্ভূত। বরঞ্চ তা সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করেছে। ক্যাচমেন্ট এলাকার ইসলামগঞ্জ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, মেম্বার ও মহিলা মেম্বার কেউই অত্র স্কুলের কোন সভা সম্পর্কে অবহিত নন। তাহলে স্বাক্ষর আসলো কোথা থেকে? মাতাব্বর পাড়া ২নং ওয়ার্ডে অথচ কেন্দ্রের স্থানে স্কুল না চালিয়ে তা নিজ বাড়ি ৩নং ওয়ার্ডে চালানো হয়। গ্রীষ্মকালীন ছুটি ২৩/০৫/১৫ইং শনিবার শুধুমাত্র একদিন হওয়া সত্ত্বেও গ্রীষ্মকালীন ছুটির কথা বলে ১৭/০৫/১৫ইং থেকে এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত অদ্যাবধি আনন্দ স্কুলটি খোলা হয়নি। সরেজমিনে গিয়ে তার আনন্দ স্কুলে কোন ছাত্র-ছাত্রী পাওয়া যায়নি। তাহলে এত সকল অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের জন্যই কি স্বজনপ্রীতি করে নিজ স্বামীকে সিএমসির সভাপতি করলো আকলিমা? প্রশ্নটা ঘুরপাক খাচ্ছে সাধারণ মানুষের মনে। এই প্রতিবেদককে ঘিরে উৎসুক জনতার তাই হাজারো অভিযোগ।
চর ফলকন ইউনিয়নে অবস্থিত ৮৩নং চর ফলকন এ্যাড. আনোয়ারুল হক আনন্দ স্কুল। সরেজমিনে কোন ছাত্র-ছাত্রী পাওয়া যায়নি। সিএমসির সভাপতি শিক্ষিকার স্বামী স্বপন বাঘা। অত্র ওয়ার্ডের মেম্বার নাজিম উদ্দিনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, এই নামের কোন স্কুল আছে বলে তার জানা নেই। অথচ তিনি সিএমসির একজন সদস্য। মহিলা মেম্বারও এই ব্যাপারে কিছু জানেন না বলে অভিযোগ করেন। ক্যাচমেন্ট এলাকার চর ফলকন সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আঃ খালেক বলেন, ‘স্কুলটির প্রতিষ্ঠার শুরুতে আমার কাছ থেকে একদিন জোরপূর্বক স্বাক্ষর নিয়েছে কিন্তু অদ্যাবধি এই স্কুলের কোন মিটিং হয়েছে বলে আমার জানা নেই। তাছাড়া এই স্কুলের ক্যাচমেন্ট এলাকার প্রত্যয়নপত্র আমি দেইনি।’ তাহলে ক্যাচমেন্ট এলাকার প্রত্যয়নপত্র পেলো কোত্থেকে? প্রত্যয়নপত্র ছাড়া স্কুলটি প্রতিষ্ঠা হলো কেমন করে? নাকি বিনিময়ে শিক্ষা অফিস মোটা অংকের হাদিয়া নিয়েছেন? গোপন সূত্রে আরো জানা যায় যে, অত্র আনন্দ স্কুলটির বইটিতে দেওয়া ছাত্র-ছাত্রী ও অভিভাবকের ছবিগুলোর কোন বাস্তবতা নেই। কারণ চর ফলকন ইউনিয়ন পরিষদের তথ্য সেবাদানকারী মোঃ আরিফ হোসেনের কম্পিউটার থেকে নেওয়া এইসব এলোমেলো ছবিগুলো। সরেজমিন গিয়ে ছবির সাথে কোন ছাত্র-ছাত্রীর মিল খুঁজে পাওয়া যায়নি। এখন প্রশ্ন হলো ইনিশিয়াল ভ্যালিডেশন, ফুল ভ্যালিডেশন ও টিসি আলতাফ তাহলে কি পরিদর্শন করলেন বা করেন? নাকি অন্যভাবে ম্যানেজ হয়ে যান? এক সময়কার উপকূলীয় অঞ্চলের উসডা নামক এনজিওর জেনারেল ম্যানেজার অর্থলোভী ও নারীলোভী স্বপন বাঘা বিশ লক্ষাধিক টাকা হাতিয়ে নিয়ে দীর্ঘ পলাতক জীবনের পর আবার উদয় হয়েছে স্বামী-স্ত্রী মিলে আনন্দ স্কুলের টাকা হরিলুট করার জন্য-এমনটি ধারণা সাধারণ জনগণের। এতসব অনিয়মের কারণে কি সাধারণ মানুষের কাছে সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে না? যেখানে সরকার শিক্ষার অগ্রগতির জন্য হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করছেন।

নৈতিক অবক্ষয়ের মতো জঘন্য কাজটিও করছেন টিসি আলতাফ। হাজিরহাট ইউনিয়নে অবস্থিত ২৩নং মিয়াপাড়া আনন্দ স্কুলের শিক্ষিকার সাথে একটি গভীর সম্পর্কের বেড়াজালে আবদ্ধ টিসি আলতাফ। একটি অনৈতিক সম্পর্কের কারণে টিসি ঐ শিক্ষিকাকে ছাড় দিয়ে রেখেছেন বলে সূত্র জানায়। অন্যান্য স্কুল পরিদর্শন না করলেও  প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে টিসি অত্র স্কুল পরিদর্শন করে। টিসির উপজেলা আবাসিকের পাশের রুমের উপজেলা মৎস্য অফিসের চতুর্থ শ্রেণীর এক কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানায় যে, ‘অনেকদিন বিকেল বেলায় টিসিকে দরজাবদ্ধ অবস্থায় একটি মেয়ের সাথে একা একা কথা বলতে দেখা গেছে। যা আমাদের কাছে একেবারেই দৃষ্টিকটু।’ স্বামী বিদেশ থাকার কারণে ঐ শিক্ষিকা একটু স্বাধীন জীবন-যাপন করতে পছন্দ করেন। তার উচ্ছুঙ্খল ব্যক্তি জীবনের কথা এলাকাবাসীও কিছু জানে। মাঝে মাঝে তাকে এলাকাবাসী বিভিন্ন ছেলেদের মটর সাইকেলে ঘুরতে দেখে। আনন্দ স্কুলের বিভিন্ন পুরুষ শিক্ষকের মটর সাইকেলে মাঝে মাঝে তাকে ঘুরতে দেখা যায়।

স্কুল পরিদর্শনের জন্য টিসির আলাদা বিল থাকা সত্ত্বেও তিনি কোন স্কুল পরিদর্শন করেন না। ২/৩ মাস পরপর শিক্ষকদের উপজেলায় ডেকে নিয়ে পরিদর্শন খাতা সই করে। মাঝে মাঝে নির্ধারিত কয়েকজন শিক্ষিকার স্কুল পরিদর্শন করতে গিয়ে স্কুলের আনুষঙ্গিক বিষয় দেখার চেয়ে শিক্ষিকাদের সাথে গল্প-গুজব করতেই বেশি পছন্দ করেন। শিক্ষিকাদের মনোরঞ্জনের জন্য গানও শোনান। অন্য একজন শিক্ষক জানান, ‘টিসির অতিরিক্ত অর্থ লোভ ও হীন চরিত্রের কারণে অনেক শিক্ষক/শিক্ষিকা আনন্দ স্কুল না চালিয়ে বেতন-ভাতা পাচ্ছে। টিসি এদের কাছ থেকে মাসিক একটা টাকা নিয়ে থাকে বলে আমরা শুনেছি।’

উপজেলার প্রথম ধাপের ৯৪টি আনন্দ স্কুলের ফুল ভ্যালিডেশন হওয়ার পর ১২টি স্কুলের বিল আসেনি। টিসি ১২টি স্কুলের শিক্ষক প্রতি এক হাজার করে বারো হাজার টাকা নিয়ে অদ্যাবধি স্কুলগুলোর বিল ছাড়িয়ে আনতে পারেনি উপরন্তু আবারো এক হাজার করে টাকা চায়।

দূর্নীতির ব্যাপারে জানতে চাইলে টিসি আলতাফ বলেন, ‘মোটা অংকের বিনিময়ে নেয়া চাকরী, তাই একটু অনিয়ম তো করতে হবে।’

স্থানীয় পত্রিকা “দৈনিক মেঘনার পাড়”, “দৈনিক লক্ষ্মীপুর আলো” ও অনলাইন পত্রিকা “শিক্ষার আলো ডটকম”এর শিরোনামে বার বার উঠে আসা সত্ত্বেও অদ্যাবধি কর্তৃপক্ষ টিসি আলতাফের বিরুদ্ধে কোন আইনগত ব্যবস্থা গ্রহন করেননি। রহস্য জনকভাবে বেঁচে যাচ্ছে টিসি আলতাফ। উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষক ও সচেতন মহলের আলোচনায় রয়েছে যে, প্রকল্প পরিচালকের অফিস নাকি টিসি আলতাফের ম্যানেজে রয়েছে। সবাই এখন টিসি আলতাফের দূর্নীতির তদন্ত ও নারীর প্রতি কু-মনোবাসনার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করছে। প্রকল্পের সুনাম রক্ষার্থে প্রকল্প পরিচালক বিষয়টির তড়িৎ ব্যবস্থা নিয়ে প্রকল্পের সুনাম অক্ষুন্ন রাখবেন বলে সচেতন মহলের বিশ্বাস।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -spot_img

Most Popular

Recent Comments