রবিবার, অক্টোবর 24, 2021
রবিবার, অক্টোবর 24, 2021
রবিবার, অক্টোবর 24, 2021
spot_img
Homeরাজনীতিএশিয়া কাপের ফাইনাল ঘিরে টিকিট যেন সোনার হরিণ

এশিয়া কাপের ফাইনাল ঘিরে টিকিট যেন সোনার হরিণ

রাজধানীর মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বরের পাশেই লম্বা লাইন। আগ্রহের কেন্দ্রে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি)। আসলে আগ্রহের কেন্দ্রে ব্যাংক নয়, টিকিট! টিকিট! এশিয়া কাপের বাংলাদেশ-ভারত ফাইনাল ঘিরে এই অবস্থা।

 

গতকাল ছিল শুক্রবার। জুমার নামাজ আদায় করেই অনেকে লাইনে দাঁড়িয়ে গেলেন! লাইনে দাঁড়ানো শুরু হয়েছে অবশ্য আরও আগে। সকাল ৯-১০টা নাগাদ। অথচ, এই ব্যাংক থেকে টিকিট ছাড়া হবে আজ শনিবার সকাল ১০টায়। প্রায় ২৪ ঘণ্টা আগেই টিকিটের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে পড়েছেন ক্রিকেটভক্তরা। ভাবা যায়! লাইন শুরু হতে না হতেই অবশ্য প্রায় হাজার খানেক মানুষ হয়ে গেল।

 

মিরপুরে যখন পাকিস্তান-শ্রীলংকা ‘তৃতীয় স্থান নির্ধারণী’ ম্যাচটা শুরু হলো, ততক্ষণে মানুষের ঢল নেমে গেছে। তাও প্রায় হাজার দশেক তো হবেই এক লাইনে!

 

শুক্রবার দিনগত রাত একটার দিকে মিরপুর-১০ নম্বর এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, ইউসিবি ব্যাংকের সামনে থেকে শুরু হওয়া পুরুষদের লাইনটি তিন পথ পেঁচিয়ে লেজ ঠেকেছে মূল সড়কে। দীর্ঘতর হচ্ছে সেই লেজ।

 

বৃহস্পতিবার বিকেলে দাঁড়িয়ে লাইনের দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে আছেন বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মী আরিফ ও ব্যবসায়ী শহীদ। মিরপুরের ব্যবসায়ী শহীদ বলেন, বাংলাদেশের খেলা তো দেখতেই হবে।

 

এত মানুষ একটা ফাইনাল ম্যাচ দেখার জন্য দৈনন্দিন যাবতীয় কাজ ভুলে গিয়ে ওই ‘সোনার হরিণ’ টিকিটের জন্য নাওয়া-খাওয়া বাদ দিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে পড়েছেন; অথচ এত টিকিট কোথায়? বিসিবি থেকে বলা হচ্ছে, টিকিটের একটি বড় অংশ উচ্চপর্যায়ের প্রভাবশালীরা নিয়ে নিচ্ছেন।

 

সর্বশেষ গ্রুপ পর্বের বাংলাদেশ-পাকিস্তান ম্যাচেও টিকিট নিয়ে মানুষের কম ছোটাছুটি ছিল না। বাংলাদেশ ফাইনাল নিশ্চিত করতেই, সেই রাত থেকেই বিভিন্নজন অন্তত একটা টিকিটের জন্য নানাভাবে চেষ্টা করছেন।

 

সোশ্যাল মিডিয়ায় বরাবরই টিকিট চেয়ে পোস্ট দেওয়া হয়। এবার দেখা গেল উল্টো ঘটনা। অনেকেই ‘টিকিট চাহিয়া লজ্জা দিবেন না’ বলে পোস্ট দিয়েছেন! ২৫ হাজার ধারণক্ষমতা শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে, অথচ খেলা দেখার জন্য এক মিরপুরের ওই ইউসিবির সামনেই গড়পড়তা ২০ হাজার লোক দাঁড়িয়ে গেছেন!

 

সাধারণত, আইসিসির ইভেন্টে ১০ শতাংশ টিকিট দেওয়া হয় সৌজন্য হিসেবে। কিন্তু বাংলাদেশে ৫০ শতাংশ টিকিট বিভিন্ন জায়গায় সৌজন্য হিসেবে বরাদ্দ থাকে। উভয় দলের খেলোয়াড়, প্রাক্তন ক্রিকেটার, বোর্ড পরিচালক ও ক্লাবগুলোর জন্যও বরাদ্দ থাকে নির্দিষ্ট পরিমাণ টিকিট। এর বাইরে মন্ত্রী-এমপি-সচিবসহ ভিআইপি পর্যায়েও সৌজন্য টিকিট দেওয়া হয়।

 

এভাবে গণহারে সৌজন্য টিকিট বিতরণ অন্যান্য দেশে নজিরবিহীন। এটা শুধু বাংলাদেশেই সম্ভব। বাকি ৫০ শতাংশ বিক্রি হয় বাজারে। পাকিস্তানের বিপক্ষে ওই ম্যাচে এই ৫০ শতাংশ টিকিটও বিক্রি করা হয়নি। নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে, ব্যাংকে দেওয়া হয়েছিল মাত্র ১৩ শতাংশ টিকিট!

 

এর ওপর টুর্নামেন্টের অন্যতম স্পন্সর, সোশ্যাল মিডিয়া হিসেবে নতুন আবির্ভূত রিং আইডি প্রতি ম্যাচে তাদের ব্যবহারকারীদের জন্য বরাদ্দ রেখেছে ৫ হাজার টিকিট। ফলে, সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। সৌজন্য টিকিটও কালোবাজারে বিক্রি হচ্ছে। গতকাল ১৫০ টাকার গ্যালারির টিকিট কালোবাজারে ৩ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে।

 

এছাড়া ৫০০ টাকার টিুকিট সাড়ে ৫ হাজার টাকায় কিনে নিয়েছেন কেউ কেউ। এই টিকিটের একটি বড় অংশ শিল্পী-তারকাদের হাতেও চলে গেছে। যারা প্রতিম্যাচেই ক্যামেরার সামনে মুখ দেখানোর জন্য ড্রেসিংরুমের পাশের গ্যালারিতে বসে থাকেন।

 

টিকিটের এত চাপ যে, বিসিবির বোর্ড পরিচালক ও সংশ্লিষ্টরা যোগাযোগের সব সূত্র বন্ধ রেখেছেন। ভাগ্যক্রমে বিসিবির টিকিট কমিটির সদস্য সচিব ওমর হোসেনকে মুঠোফোনে পাওয়া গেল। তার কাছে টিকিটের এমন সংকটের কথা জানতে চাইলে তিনি বললেন, ‘আমাদের হাত-পা বাঁধা। ২৫ হাজার দর্শকের স্টেডিয়াম আমাদের। চাহিদা তার চেয়ে অনেক বেশি।’

 

তিনি আরও যুক্ত করলেন, ‘২০১২ সালের এশিয়া কাপের সেই ফাইনালের পর টিকিটের জন্য এত চাপ ও চাহিদা আর কখনোই ছিল না। খেলা শুরু সাড়ে ৭টায়। খেলাটাও টি২০। টি২০-র কারণেই মানুষের এই ম্যাচ দেখার আগ্রহ এত বেশি।’

 

সদস্য সচিব অবশ্য এমনটা বললেও, আগের ম্যাচের পরিস্থিতি টেনেই বলা যায় যে, প্রচুর সংখ্যক টিকিট কালোবাজারিদের হাতে ইতিমধ্যেই চলে গেছে। ওই ম্যাচের টিকিট কালোবাজারিদের হাতে প্রচুর পরিমাণে বিক্রি হয়েছে। এমনকি বিসিবির কর্মকর্তা পর্যন্ত টিকিট রিকুইজিশন দিয়ে পাননি। গতকাল বিসিবির প্রত্যেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর কাছে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী ই-মেইল পাঠিয়ে জানিয়ে দিয়েছেন, ফাইনাল ম্যাচের টিকিটের কোনো রিকুইজিশন দেওয়া যাবে না।

 

একজন প্রভাবশালী ক্রীড়া সংগঠককে পর্যন্ত ২৫০ টাকার ২৩টি টিকিট ৪৩ হাজার টাকায় কিনতে হয়েছিল। এই ম্যাচের আগে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, একজন কালোবাজারি এরই মধ্যে ৩ লাখ টাকার বিভিন্ন ধরনের টিকিট কিনে ১৫ লাখ টাকায় বিক্রি করে ফেলেছেন।

 

এভাবে টিকিট কালোবাজারিদের হাতে তুলে দেওয়ার ক্ষেত্রে বিসিবির একজন বোর্ড পরিচালকই ভূমিকা পালন করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এই বোর্ড পরিচালক প্রভাবশালী একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। ওই প্রতিষ্ঠানটি বরাবরই বাংলাদেশের ক্রিকেট বোর্ডের কাছ থেকে বিভিন্ন সুবিধা আদায় করে থাকে।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -spot_img

Most Popular

Recent Comments