পাবনায় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে ত্রিপক্ষীয় সমঝোতা স্মারক সই

পাবনায় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশ, ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে একটি ত্রিপক্ষীয় সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়েছে। এই চুক্তির মাধ্যমে ভারত প্রথমবারের মতো রূপপুর প্রকল্প নির্মাণের সাথে যুক্ত হলো।

বৃহস্পতিবার রাশিয়ার মস্কোয় এ চুক্তি সই হয়। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক শক্তি সংস্থা বা রসাটম এক বিবৃতিতে জানায়, ভারতের পরামাণবিক শক্তি বিভাগ এবং বাংলাদেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মধ্যে এই ত্রিপক্ষীয় সমঝোতা স্মারকটি স্বাক্ষরিত হয়। এ সময় রসাটমের পক্ষে নিকোলাই স্পাসকি, রাশিয়ায় নিযুক্ত ভারতের রাষ্ট্রদূত পঙ্কজ শরণ এবং বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এস এম সাইফুল হক উপস্থিত ছিলেন।

নতুন এই সমঝোতা স্মারকে উল্লেখ করা হয়, বিদ্যুৎকেন্দ্র নিরাপদভাবে পরিচালনা এবং নিরাপত্তার ক্ষেত্রসহ কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ত্রিপক্ষীয় জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময়, পরামর্শক সেবা, কারিগরি সহায়তা, সম্পদ ও অভিজ্ঞতা বিনিময় করা হবে।

বিবৃতিতে বলা হয়, ভারতীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণ ও স্থাপন কাজের সঙ্গে যুক্ত হবে। এ ছাড়া প্রকল্পের নন-ক্রিটিক্যাল (কম গুরুত্বপূর্ণ) উপকরণ ও যন্ত্রপাতি সরবরাহ করতে পারে ভারত।

এ ছাড়া জনবল প্রশিক্ষণ, জ্ঞান বিনিময় ও পরামর্শক লেনদেন করবে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয় এবং ভারতের পারমাণবিক জ্বালানি বিভাগ।

সমঝোতার স্মারক সই হওয়ার ফলে বাংলাদেশ ও ভারতের বিশেষজ্ঞ এবং রাশিয়ার ঠিকাদারদের মধ্যে পারস্পরিক অভিজ্ঞতা বিনিময়ের একটি কাঠামো তৈরি হলো।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র দেখভালে ১১০০ কর্মীকে প্রশিক্ষণ

পাবনার রূপপুরে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়গুলো দেখভাল এক হাজার ১০০ জনকে প্রশিক্ষণ দেবে রোসাটম। বিষয়টি নিয়ে নিউক্লিয়ার এশিয়ার সঙ্গে কথা বলে এ কথা জানান এএসইর সিনিয়ার ভাইস প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার খাজিন।

তিনি বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করছে রুশ প্রতিষ্ঠান রোসাটম। দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদন করা হবে দুই হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। পাশাপাশি এর স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তার দিকে যেমন নজর দেয়া হচ্ছে, তেমনি আভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক কোনো দুর্ঘটনা যাতে না ঘটে সেদিকেও খেয়াল রাখা হচ্ছে। এই প্রকল্পে কাজের জন্য এক হাজার ১০০ জনকে প্রশিক্ষণ দেবে রোসাটম।

প্রকল্পটির নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়গুলো দেখভাল করছে রোসাটমের প্রকৌশল বিভাগ ‘ইন্টারন্যাশনাল প্রোজেক্ট অব এএসই গ্রুপ অব কোম্পানিজ’। বিষয়টি নিয়ে নিউক্লিয়ার এশিয়ার সঙ্গে কথা বলেছেন এএসইর সিনিয়ার ভাইস প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার খাজিন।

চলমান এই প্রকল্পে রোসাটম এবং তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠান এএসইর ভূমিকা কী হবে- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশকে সহায়তা দেয়ার মতো যথেষ্ট দক্ষতা এবং পর্যাপ্ত বিশেষজ্ঞ আছে তাদের। এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়বে বলেও মন্তব্য করেন প্রতিষ্ঠানের এই শীর্ষ কর্মকর্তা।

খাজিন বলেন, ‘আমরা প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এবং জ্বালানি বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে অভিজ্ঞতা বিনিময় করছি। এছাড়া দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে পর্যাপ্ত সহায়তাও দিচ্ছি।’

পরমাণু প্রকল্পে কাজ করার জন্য ইতিমধ্যে বেশকিছু পেশাদার এবং দক্ষ বিশেষজ্ঞ আছে বাংলাদেশের। তবে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা মনে করে, বাংলাদেশ সম্প্রতি এ ধরনের বিদ্যুৎ প্রকল্প চালু করেছে। এ কারণেই এখনো নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়ে রাশিয়ার সহায়তা দরকার।

বর্তমানে দেশের ৫০ জন শিক্ষার্থী পরমাণু নিরাপত্তা বিষয়ে রাশিয়াতে পড়াশুনা করছে। আরো ১০০ জনকে প্রশিক্ষণ দেয়ার পরিকল্পনাও আছে প্রকল্প কর্তৃপক্ষের। এভাবে মোট ১ হাজার ১০০ জনকে প্রশিক্ষণ দেয়া হবে।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয় ১৯৬১-৬২ সালে। তবে ২০১১ সালের ২ নভেম্বর রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের আন্তঃসরকার সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর এই প্রকল্পের কাজ গতি পায়। এর ছয় বছর পর প্রকল্পের মূল নির্মাণ পর্বের কাজ শুরু হলো। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ পৃথিবীর পারমাণবিক ক্লাবের ৩২তম সদস্যদেশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হলো। একই সঙ্গে বাংলাদেশ এশিয়ার মধ্যে ষষ্ঠ এবং সার্কের তৃতীয় পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নকারী দেশের তালিকায় ঢুকল।

স্থানীয় কোম্পানিগুলোকে রূপপুর প্রকল্পে সম্পৃক্ত করা এবং এক্ষেত্রে সফলতা বিষয়ে এএসই কর্মকর্তা খাজিন বলেন, বাংলাদেশের পরমাণু সরবরাহকারীদের নিয়ে ইতিমধ্যে ঢাকা এবং মস্কোতে দুটি কর্মশালা করা হয়েছে। তার ভাষায়, ‘আমরা বাংলাদেশের ১৫টি সম্ভাব্য নির্মাণ প্রতিষ্ঠানকে রাশিয়ায় আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম। এর মধ্যে নয়টি প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছে।’

রূপপুরের ব্যাপারে ওইসব কোম্পানিকে রোসাটমের রোডম্যাপ জানানো হয়েছে বলেও তিনি জানান। এর মধ্যে তিনটি কোম্পানি পাওয়া গেছে, যাদের নিজস্ব প্রকৌশল প্রতিষ্ঠান এবং কাজের অভিজ্ঞতা আছে। তারা রোসাটমের সহযোগী হিসেবে নিয়োগ পেতে পারে।

বাংলাদেশের কোম্পানিগুলোর কাজ কোন ধরনের হবে- এই প্রশ্নের জবাবে খাজিন বলেন, ‘আমরা মূলত নির্মাণ এবং মেরামতের মতো কাজগুলো নিয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলছি। এর বাইরে প্রশাসনিক কাজেও তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে চাইছি।’

তবে এই বিষয়ের কাজ মাত্রই শুরু হয়েছে। অনেক কোম্পানি এখনো যোগাযোগ করেনি। তবে রোসাটম চায়, বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ অংশগ্রহণ থাকুক।

বর্তমানে পৃথিবীর ৩১টি দেশে ৪৫০টি পারমাণবিক বিদ্যুতের ইউনিট চলমান আছে। এগুলোর মোট উৎপাদনক্ষমতা প্রায় ৩ লাখ ৯২ হাজার মেগাওয়াট (৩৯২ গিগাওয়াট)। এছাড়া আরও ৬০টি ইউনিট বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নির্মাণাধীন রয়েছে, যার মোট ক্ষমতা প্রায় ৬০ হাজার মেগাওয়াট।

রূপপুর প্রকল্প পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে কি না- এ বিষয়ে এএসই কর্মকর্তা খাজিন বলেন, আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার ভাষ্যমতে, পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো বর্তমানে বিশ্বে ৩৮ শতাংশ সবুজ বিদ্যুৎ (গ্রিন পাওয়ার) উৎপাদন করছে। তাই মানবজাতিকে রক্ষায় পারমাণবিক প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার পরিসংখ্যান অনুসারে, আগামী ৪৫ বছর পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন অব্যাহত রাখা সম্ভব হলে বিশ্বে কার্বন-ডাই-অক্সাইড নিঃস্বরণের পরিমাণ ৫৬ গিগাটন কমানো যাবে।