মঙ্গলবার, জানুয়ারী 25, 2022
মঙ্গলবার, জানুয়ারী 25, 2022
মঙ্গলবার, জানুয়ারী 25, 2022
spot_img
Homeজাতীয়অপরাধ জগত নিয়ন্ত্রণের চেষ্টায় ক্যাসিনো খালেদ

অপরাধ জগত নিয়ন্ত্রণের চেষ্টায় ক্যাসিনো খালেদ

রাজধানীতে হোটেল ব্যবসার আড়ালে অবৈধ ক্যাসিনো পরিচালনার দায়ে প্রথম গ্রেফতার ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের বহিষ্কৃত সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া জেলে বসেই অবৈধ সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণের চেষ্টায় আছেন।

গোটা রাজধানী ধরে গড়ে তোলা মাদকসহ অপরাধ জগত যেন হাতছাড়া না হয় সেজন্য গারদে বসেই বিশ্বস্তদের নির্দেশনা দিয়েছেন ক্যাসিনো সম্রাটের ঘনিষ্ট খালেদ। আন্ডারওয়ার্ল্ডের ১৫ জন কিলার ‘বসের’ (খালেদ) এই নির্দেশনা পেয়ে এরইমধ্যে কাজ শুরু করে দিয়েছে।

খালেদ ঘনিষ্ঠ ওই সূত্র জানিয়েছে, প্রায় দুই মাস আগে ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের সময় গ্রেফতার হন খালেদ। ওই সময় তার ধারণা ছিল, দ্রুতই জামিনে মুক্ত হবেন তিনি। কিন্তু এখন তিনি বুঝতে পারছেন সহজে তার রেহাই নেই। এ কারণেই এই মুহূর্তে তার পরিকল্পনা- জেলে বসেই ক্যাসিনো, ইয়াবা, চাঁদবাজি ও অপরাধ সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করা।

খালেদের ঘনিষ্ঠ আন্ডারওয়ার্ল্ডের ভয়ংকর ১৫ কিলার এরইমধ্যে নির্দেশনা পেয়ে সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা শুরু করেছেন। তাদের হাতেই রয়েছে খালেদের সব আগ্নেয়াস্ত্র। তারা আলোচিত সব হত্যা মামলার আসামি। এদের মাধ্যমেই খালেদ ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল।

জানা গেছে, খালেদের ১৫ ক্যাডারের হাতে রয়েছে শতাধিক আগ্নেয়াস্ত্র। এর মধ্যে ৪টি অত্যাধুনিক অভিজাত অস্ত্র একে-২২। অধিকাংশ অস্ত্রই চট্টগ্রামের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী যুবলীগ নেতা হেলাল আকবর চৌধুরী বাবরের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। বাবর চট্টগ্রামে জোড়া খুনসহ ১৬টি মামলার আসামি। চট্টগ্রাম থেকে অস্ত্রের চালান আসত ট্রেনে। বাবরের বন্ধুর পল্টনের অস্ত্রের দোকান থেকেও খালেদের কাছে অস্ত্র যেত। অস্ত্র মজুদ করা হতো ঢাকার শান্তিনগরের চামেলীবাগের একটি বাসা এবং কমলাপুরের একটি বাসায়। চামেলীবাগের বাসাটি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এক জনপ্রতিনিধির। আর কমলাপুরের বাসাটির মালিক একজন চিকিৎসক। তারা দু’জনেই খালেদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র, খালেদের ঘনিষ্ঠ একাধিক সহযোগীর জবানি এবং যুগান্তরের অনুসন্ধানে এসব তথ্য বেরিয়ে এসেছে। প্রায় দুই মাস আগে খালেদ র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার হলেও তার অস্ত্রধারী ক্যাডারদের কেউ গ্রেফতার হয়নি। তার বিশাল অস্ত্রভাণ্ডারও এখন পর্যন্ত অক্ষত।

খালেদের বিরুদ্ধে দায়ের করা অস্ত্র মামলার তদন্ত করে র‌্যাব বলেছে, খালেদ ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের পদ পেয়ে এলাকায় বিশাল এক সন্ত্রাসী বাহিনী গড়ে তোলেন। অস্ত্রধারী এই বাহিনীর মাধ্যমেই তিনি অবৈধ ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ করতেন। ঢাকার মতিঝিল, আরামবাগ, ফকিরাপুল, শাহজাহানপুর, মুগদা, কমলাপুর, রামপুরা, সবুজবাগসহ আশপাশের এলাকায় সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেন। র‌্যাবের তদন্তে ভয়াবহ এসব তথ্য বেরিয়ে এলেও এখন পর্যন্ত খালেদের ভয়ংকর সন্ত্রাসী বাহিনীর কাউকে গ্রেফতার করা যায়নি। র‌্যাব-৩ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল শাফিউল্লাহ বুলবুল যুগান্তরকে বলেন, খালেদের বিরুদ্ধে করা অস্ত্র মামলায় এরই মধ্যে আদালতে অভিযোগপত্র দেয়া হয়েছে। তার অস্ত্রধারী ক্যাডার বাহিনীর সদস্যরা পলাতক। তাদের আইনের আওতায় আনতে অবিরাম চেষ্টা চলছে।

২০১৩ সালে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদকের পদ পাওয়ার পর রেলভবনের নিয়ন্ত্রণ নেন খালেদ। সেখানে তার দুই ভাই টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করতেন। সব টেন্ডারেই তাদের ভাগ থাকত ৪ শতাংশ হারে। ট্রেনের ক্যাটারিং এবং ক্লিনিংয়ের টেন্ডারও ভাগিয়ে নিত খালেদের সিন্ডিকেট। ট্রেনের ক্যাটারিং এবং ক্লিনিংয়ের দায়িত্বে খালেদের ঘনিষ্ঠরাই থাকত। এর আড়ালেই চট্টগ্রাম থেকে বাবরের মাধ্যমে অস্ত্র ও ইয়াবার চালান আসত। অস্ত্রের চালান রিসিভ করত কিসলু। আর ইয়াবার চালান রিসিভ করত সোহাগ।

খালেদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত সোহরাওয়ার্দী জানান, বাবরের মাধ্যমে খালেদ অস্ত্র সংগ্রহ করত। বায়তুল মোকাররম মসজিদের উল্টোপাশে পল্টনে বাবরের এক বন্ধুর একটি বৈধ অস্ত্রের দোকান আছে। বৈধ অস্ত্রের আড়ালে সেখানেও চলে অবৈধ অস্ত্রের কারবার। বাবর তার কাছ থেকেও অস্ত্র নিয়ে খালেদকে দিয়েছে। একটি সূত্র জানায়, অস্ত্র ও ইয়াবার বিনিময়ে খালেদ ব্যাগভর্তি করে বাবরকে টাকা দিত। সেই টাকা নিয়ে বাবর বিমানে করে চট্টগ্রামে যেত। ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান শুরুর পর বাবর দুবাইয়ে পালিয়ে যায়।

উল্লেখ্য, খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টায় সরাসরি জড়িত ছিলেন। ১৯৮৯ সালে ফ্রিডম পার্টির নেতাদের নেতৃত্বে শেখ হাসিনার ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে হামলা হয়। ওই হামলায় শীর্ষ সন্ত্রাসী জাফর আহম্মদ মানিক, সৈয়দ নাজমুল মাহমুদ মুরাদ এবং তাদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী খালেদ সরাসরি অংশ নেয়। পরে কৌশলে চার্জশিট থেকে খালেদের নাম বাদ দেয়া হয়। এই তথ্য জানিয়েছেন খালেদের দীর্ঘদিনের সহযোগী মোহাম্মদ আলী।

র‌্যাবের এক কর্মকর্তা বলেন, ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর খালেদের বাবা আবদুল মান্নান ভূঁইয়া সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে নিয়োগ পান। তখন তিনি ধীরে ধীরে শেখ হাসিনা হত্যাচেষ্টা মামলার অনেক নথি নষ্ট করে ফেলেন। এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই এক সময় খালেদের নামটিও কৌশলে অভিযোগপত্র থেকে বাদ যায়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ক্যাসিনো খালেদ একসময় ফ্রিডম পার্টি করতেন। পরে যুবদলের রাজনীতি করেন। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে যুবলীগ নেতা বনে যান। বহুরূপী খালেদের উত্থান শুনে গা শিউরে ‍উঠে অনেকের।

এই খালেদই শেখ হাসিনা হত্যাচেষ্টায় অংশ নেন। তবে মৃত দেখিয়ে অভিযোগপত্র থেকে তার নাম বাদ দেয়া হয়। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, খালেদ মারা যাননি।

১৯৮৯ সালে ফ্রিডম পার্টির নেতাদের নেতৃত্বে ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে হামলা হয়। ওই হামলায় শীর্ষ সন্ত্রাসী জাফর আহম্মদ মানিক, সৈয়দ নাজমুল মাহমুদ মুরাদ এবং তাদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী খালেদ সরাসরি অংশ নেয়।

এ ঘটনার ৮ বছর পর মানিক-মুরাদের সঙ্গে খালেদের সংশ্লিষ্টতার কথা উল্লেখ করে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। তবে সূত্রাপুর থানার একটি হত্যা মামলার সূত্র উল্লেখ করে অভিযোগপত্রে বলা হয়, ‘খালেদ’ মারা গেছে। কখন, কীভাবে সে মারা গেছে এ বিষয়ে কোনো তথ্য উল্লেখ করা হয়নি।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -spot_img

Most Popular

Recent Comments