আওয়ামী লীগ বনাম বিএনপি: জামায়াত ফ্যাক্টর

ঢাকা, ২৩ নভেম্বর (খবর তরঙ্গ ডটকম)- জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে বিএনপি আর আওয়ামী লীগের টানাটানি নতুন নয়। কিছুদিন আগে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব অভিযোগ করেছেন, সামনের নির্বাচনে জামায়াতকে অংশ নেওয়ানোর চেষ্টা করছে আওয়ামী লীগ। বিএনপি নিজে জামায়াতের ঘনিষ্ঠ একটি দল। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের আমলে প্রথমে আইডিএল নামে একাত্তরের স্বাধীনতাবিরোধী এ দলটি স্বাধীন বাংলাদেশে রাজনীতির শুরু করে। পরবর্তীকালে স্বনামে আত্মপ্রকাশ করে এবং ১৯৯১ সালের নির্বাচনে তারা বিএনপির মিত্র দল হিসেবে অংশ নেয়, ২০০১ সালের খালেদা জিয়ার দ্বিতীয় আমলে জামায়াতের দুজন নেতা সরকারের মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। গত চার বছরের সরকারবিরোধী আন্দোলনেও জামায়াত বিএনপির প্রধান জোটসঙ্গী হিসেবে সম্পৃক্ত রয়েছে। বিএনপি মহাসচিবের অভিযোগ তাই চাঞ্চল্যকর, এমনকি অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে। কিন্তু এটি আসলে অবিশ্বাস্য নয়!
জামায়াতের সঙ্গে আওয়ামী লীগের দৃশ্যমান সমঝোতা এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় থেকে। জামায়াতের তখন বিএনপির সঙ্গে যোগাযোগ বেশি ছিল, কিন্তু ন্যূনতম হলেও সমঝোতা ছিল আওয়ামী লীগের সঙ্গেও। সে সময় এই দুটো বড় দলের নেতৃত্বাধীন দুটি জোটের সঙ্গে যুগপৎ কর্মসূচি দিয়ে আন্দোলনে শামিল থাকা তাই সম্ভব হয়েছিল জামায়াতের পক্ষে। এই যুগপৎ কর্মসূচি আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে জামায়াতবিরোধী যে নাগরিক আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, তার প্রভাব কিছুটা হলেও মুছে দেয়। খালেদা জিয়ার প্রথম আমলে ১৯৯২ সাল থেকে শহীদজননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে আবারও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলে বাংলাদেশের নাগরিক সমাজ। মূলত তাঁর ব্যক্তিত্ব ও নেতৃত্বগুণের কারণেই আওয়ামী লীগ এই আন্দোলনে শামিল হয়। কিন্তু যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের চেয়ে বিএনপির সঙ্গে ক্ষমতায় যাওয়ার প্রতিযোগিতা যে আওয়ামী লীগের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তা লক্ষণীয় হয়ে ওঠে ১৯৯৪ সালে জাহানারা ইমামের মৃত্যুর পরপর।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আন্দোলন শিকেয় তুলে রেখে এ সময় বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে আওয়ামী লীগ দেশব্যাপী যে আন্দোলন গড়ে তোলে, তাতে সহযাত্রী করে নেয় জাতীয় পার্টির সঙ্গে জামায়াতকেও। ১৯৯৫ সালের ২৭ জুন জামায়াত নেতা মতিউর রহমান নিজামী ও তৎকালীন জাতীয় পার্টির নেতা মওদুদ আহমদের সঙ্গে আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা একত্রে বসে সংবাদ সম্মেলনে সে সময়কার আন্দোলন প্রসঙ্গে বক্তব্য দেন। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে জিতে আসার পর তাই আওয়ামী লীগ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কোনো উদ্যোগ নেয়নি। ১৯৯৬ সালের আওয়ামী লীগ সরকারের ‘ভারতপন্থী’ ভূমিকা, সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী পদক্ষেপ ও বিরোধী দলের প্রতি নিপীড়ন আবারও বিএনপি-জামায়াতকে জোটবদ্ধ করার ক্ষেত্রে অনুঘটক হিসেবে কাজ করে।
২০০১ সালের নির্বাচনে জেতার পর বিএনপি-জামায়াত জোট আওয়ামী লীগের প্রতি আরও বেশি নিপীড়নমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে এবং দেশকে সাম্প্রদায়িক ও জঙ্গিবাদী রাজনীতির তীর্থভূমি বানিয়ে ফেলে। বিএনপির দুঃশাসন এবং এক/এগারো-পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনকালে আওয়ামী লীগের প্রতি প্রশাসন ও প্রভাবশালী দাতাগোষ্ঠীর সমর্থনের কারণে আওয়ামী লীগের বড় বিজয় আগে থেকে নিশ্চিত হয়ে যায়। জামায়াতকে কাছে টেনে বিএনপিকে নিঃসঙ্গ করার প্রয়োজন তখন শেষ হয়ে আসে আওয়ামী লীগের জন্য। আওয়ামী লীগ প্রথমবারের মতো নির্বাচনী ম্যানিফেস্টোতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার করার অনুকূল পরিবেশ পায় এবং সে অঙ্গীকার জোরের সঙ্গে ব্যক্ত করে।
গত দুই দশকের রাজনীতিতে এটা তাই স্পষ্ট যে ক্ষমতায় যাওয়ার প্রয়োজনে বিএনপির মতো সরাসরিভাবে না হলেও, জামায়াতকে কৌশলগত মিত্র বা সহযাত্রী করার ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের কোনো অনীহা ছিল না। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ক্ষেত্রে তাই তাদের রাজনৈতিক আদর্শ যেমন কাজ করেছে, তেমনি ক্ষমতার রাজনীতির হিসাবও কাজ করেছে। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে বিজয়ের জন্য যখন জামায়াতের মৈত্রী প্রয়োজন ছিল, তখন নির্বাচন-পরবর্তী আওয়ামী লীগ সরকার বিচারের কথা মুখেও আনেনি। আবার ২০০৯ সালের নির্বাচনে যখন এই প্রয়োজন একেবারেই ফুরিয়ে যায়, তখন এই বিচারে অগ্রসর হতে তারা দ্বিধা করেনি। প্রশ্ন হচ্ছে, আগামী নির্বাচনে জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতার প্রয়োজন কীভাবে দেখছে আওয়ামী লীগ? সমঝোতা প্রয়োজনীয় বলে বিবেচিত হলে কি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের মতো ইস্যুতে কোনো রকম ছাড় দিতে রাজি হবে আওয়ামী লীগ?

দুই.
তাত্ত্বিকভাবে দেখলে, জামায়াতের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সমঝোতার একেবারেই প্রয়োজন নেই বলা যাবে না। দলীয় সরকারের অধীনে আগামী নির্বাচন হলে বিএনপি তাতে অংশ নেবে না বলে জোরের সঙ্গে জানিয়েছে। সে ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির সঙ্গে সঙ্গে জামায়াতও অংশ নিলে নির্বাচন গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক হয়েছে, এটি যতটা জোরের সঙ্গে আওয়ামী লীগের পক্ষে বলা সম্ভব হবে, জামায়াত অংশ না নিলে ততটা জোরের সঙ্গে বলা যাবে না। যেহেতু জামায়াতের শীর্ষস্থানীয় অধিকাংশ নেতা যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি, এই বিচারের ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ কিছুটা ছাড় দিতে রাজি হলে জামায়াত বিএনপির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে আগামী নির্বাচনে অংশ নিতে পারে। কিন্তু এমন ছাড় দেওয়া আওয়ামী লীগের জন্য সহজ হবে না।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের দাবি। এই দাবিকে, বিশেষ করে তরুণ সমাজের মনে আরও গভীরভাবে প্রোথিত করার ক্ষেত্রে গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ম্যানিফেস্টো বিরাট ভূমিকা রেখেছে। বিচারের কাজ প্রায় শেষ করার পর্যায়ে এখন আওয়ামী লীগের পক্ষে তাই বিচার-প্রক্রিয়া থেকে সরে আসা সম্ভব হবে না। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিরা যেভাবে এই বিচারের গতিপ্রকৃতি নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করেন, যেভাবে কিছুদিন আগে যুদ্ধাপরাধীদের আপিল আবেদনের সময় কমিয়ে আনার আইন পাস করা হলো, তাতে এটি ভাবা অস্বাভাবিক নয় যে বিচার-প্রক্রিয়াকে ঝুলিয়ে দেওয়ার, এমনকি একে প্রভাবিত করার সুযোগ সরকারের রয়েছে। আর আপিল আদালতে বিভিন্ন পদ্ধতিগত মারপ্যাঁচে মামলাকে দীর্ঘায়িত করার এমনকি প্রভাবিত করার অভিযোগ অতীতের বিভিন্ন সরকারের মতো আওয়ামী লীগের বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধেও রয়েছে। জামায়াত যদি এটি বিশ্বাস করে যে যুদ্ধাপরাধের দণ্ডের মাত্রা বা বিচারের গতি নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে সরকার প্রভাব বিস্তার করতে পারে, তাহলে সরকারের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে নির্বাচনে আসার আলোচনা তারা করতে পারে। বাংলাদেশের অধিকাংশ দলের মতো জামায়াতের কাছে দলের নীতির চেয়ে নেতার স্বার্থরক্ষণ বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে এমন সমঝোতা অসম্ভব নয়।
প্রশ্ন হচ্ছে, আওয়ামী লীগ কি এ ধরনের সমঝোতার ঝুঁকি নেবে? দেশের অনেক প্রগতিশীল ও উদারমনা মানুষের কাছে এখনো আওয়ামী লীগ তুলনামূলকভাবে পছন্দনীয় দল। অতীতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্রার্থী কর্তৃক গোলাম আযমের কাছে দোয়া কামনা, জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে বিএনপিবিরোধী আন্দোলন এবং গত নির্বাচনের আগে খেলাফত মজলিশের সঙ্গে চুক্তির নজির থাকার পরও আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিএনপির রাজনীতির কিছুটা পার্থক্য এখনো রয়েছে। সেটি হচ্ছে, আওয়ামী লীগ এ ধরনের সমঝোতা করে থাকে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য, রাজনৈতিক আদর্শের নৈকট্যের জন্য নয়। অন্যদিকে, বিএনপি, জামায়াতসহ দেশের দক্ষিণপন্থী দলগুলোর ঐক্যের ভেতর কিছুটা হলেও আদর্শিক নৈকট্য রয়েছে (যেমন—বিদেশনীতি, ধর্মভিত্তিক রাজনীতির প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি ও দলীয় সংস্কৃতির অভিব্যক্তি)। তার পরও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের মতো অতি সংবেদনশীল বিষয়ে কোনো সমঝোতা আওয়ামী লীগ করলে এই পার্থক্যের কথা আর মনে রাখতে চাইবে না মানুষ। বর্তমান আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক দেউলিয়াপনার চূড়ান্ত পরিচায়ক হিসেবেও এটি বিবেচিত হতে পারে অনেকের কাছে।

তিন.
ভালো হয়, দুটি বড় দল যদি যুদ্ধাপরাধের বিচারের ইস্যুটি রাজনীতির বাইরে রাখে। আওয়ামী লীগকে এই বিচার বিতর্কমুক্ত রাখতে হবে এবং এটিকে রাজনৈতিক দর-কষাকষি বা হিসাবের ঊর্ধ্বের বিষয় হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। অন্যদিকে, ক্ষমতায় গেলে এই বিচার থামিয়ে দেওয়া বা একে কণ্টকাকীর্ণ করার কোনো চেষ্টা তারা করবে না, বিএনপিকে এই প্রতিশ্রুতি দিতে হবে। তা না হলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়টি ক্ষমতায় রাজনীতির বলিতে পরিণত হতে পারে। জাতি হিসেবে আমাদের জন্য তা নিদারুণ লজ্জার ও গ্লানির বিষয় হবে।
সবচেয়ে ভালো হয় জামায়াত বা জাতীয় পার্টির মতো দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতা করার পরিবর্তে আগামী নির্বাচন বিষয়ে বড় দুটি দল নিজেদের মধ্যে সমঝোতায় আসার চেষ্টা করলে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার বা অরাজনৈতিক প্রধানমন্ত্রীর অধীনে সর্বদলীয় নির্বাচনকালীন সরকার—এই দুটি মডেলকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে আলোচনা শুরুর উদ্যোগ এখনই নেওয়া প্রয়োজন। তা না হলে তাদের হানাহানিতে এ দেশের রাজনীতিতে অশুভ শক্তির বিকাশের আশঙ্কা আরও বাড়তে থাকবে। গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল একটি দেশ গড়ার ক্ষেত্রে এটি ভবিষ্যতে বড় সমস্যা হয়ে দেখা যেতে পারে।
আসিফ নজরুল: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।