ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগপন্থী সম্মিলিত আইনজীবী পরিষদে ভাঙন - খবর তরঙ্গ
শিরোনাম :

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগপন্থী সম্মিলিত আইনজীবী পরিষদে ভাঙন



(খবর তরঙ্গ ডটকম)

ঢাকা, ২৪ নভেম্বর (খবর তরঙ্গ ডটকম)- ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগপন্থী আইনজীবীদের সংগঠন ‘সম্মিলিত আইনজীবী সমন্বয় পরিষদ’ অভ্যন্তরীণ বিরোধের জের ধরে অবশেষে ঘোষণা দিয়ে পৃথক হলো । শনিবার সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গনে এবং অপরপক্ষের নেতারা সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির হলে সভা করে এই ভাঙনের নেতৃত্ব দেন।

শনিবার দুই ভাগে বিভক্ত পরিষদের মধ্যে আব্দুল বাসেত মজুমদারের নেতৃত্বে পক্ষটি আলাদা সভা করে কমিটির নতুন আহ্বায়কের নাম ঘোষণা করে শিগগিরই পূর্ণ কমিটি গঠনের ঘোষণা দিয়েছে।

এম আমীর-উল ইসলাম নেতৃত্বাধীন অন্য পক্ষ সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটি গঠন করে পাঁচ মাসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

এতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের নেতারাও জড়িয়ে পড়েছেন। তারা দুপক্ষের অনুষ্ঠানেই সংহতি জানিয়ে বক্তৃতা করেছেন।

সকালে বঙ্গবন্ধু আইনজীবী পরিষদের ব্যানারে বাসেত মজুমদারের অনুসারিরা ‘বঙ্গবন্ধুর আদর্শ, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ও অসাম্প্রায়িক বাংলাদেশ’ শীর্ষক আলোচনা সভা করে আইনজীবী সমিতি ভবন প্রাঙ্গনে।

এই সভায় সভাপতিত্ব করেন অ্যাডভোকেট আব্দুল বাসেত মজুমদার। আর এই অনুষ্ঠান উদ্বোধন করে বক্তৃতা দেন সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী।

তিনি বলেন, ‘স্বাধীনতাবিরোধীদের অপতৎপরতা রুখতে প্রগতিশীল সব সংগঠন ও শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।’

সাজেদা চৌধুরী আরো বলেন, ‘প্রগতিশীল শক্তি ঐক্যবদ্ধ থাকলে স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না। তারা পরাস্ত হবেই, হবে।’

নবগঠিত কমিটির আহ্বায়ক বাসেত মজুমদার বলেন, ‘শিগগিরই সম্মেলন করে পুর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হবে।’

এই সভা থেকে বক্তারা সম্মিলিত আইনজীবী সমন্বয় পরিষদের বর্তমান কমিটির কড়া সমালোচনা করেন। তারা বর্তমান কমিটির নেতাদের বাদ দিয়ে নতুন কমিটি গঠনের দাবি জানালে সভা থেকে আব্দুল বাসেত মজুমদারকে পরিষদের নতুন আহ্বায়ক হিসেবে ঘোষণা দেয়া হয়।

সুপ্রিম কোর্ট বারের সাবেক সম্পাদক শ ম রেজাউল করিমের পরিচালনায় দিনব্যাপী এ সভায় সাজেদা চৌধুরী ছাড়াও আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য অ্যাডভোকেট ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন, অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, এম এ কুদ্দুস, আবু সাঈদ সাগর, শেখ সিরাজুল ইসলাম, মোহাম্মদ ইস্রাফিল, এস এম মুনির, বশির আহমেদ, আলতাব উদ্দিন আহমেদ, শেখ আখতারুল ইসলাম প্রমুখ বক্তৃতা করেন।

এরপর বিকেলে বাসেত মজুমদারকে আহ্বায়ক করে নতুন ওই কমিটির ঘোষণা দেয়া হয়।

সভায় বাসেত মজুমদার বলেন, ‘কতিপয় দুর্বৃত্তের হাতে সমন্বয় পরিষদ বন্দি হয়ে পড়েছে। এ পরিষদকে মুক্ত করতে হবে।’

তিনি বার কাউন্সিলের নির্বাচনে সরকার সমর্থক আইনজীবীদের পরাজয়ের জন্য আমীর-উল ইসলামের অনুসারিদের দায়ী করে বলেন, ‘প্রথম প্যানেল না রেখে তিনবার প্যানেল পরিবর্তনের কারণেই আইনজীবী সমন্বয় পরিষদের ভরাডুবি হয়।’

তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘আমরা বার কাউন্সিলের নির্বাচনের জন্য প্রচারণায় ব্যস্ত। অথচ হঠাৎ শুনি নির্বাচন বন্ধে রিট করা হয়েছে। কিন্তু কেন রিট, তার জবাব আজও মেলেনি।’

এ সময় বাসেত মজুমদার ২৪ নভেম্বরকে সম্মিলিত আইনজীবী সমন্বয় পরিষদের বন্দি মুক্তি দিবস হিসেবে ঘোষণা করেন।

এ সভায় আইনজীবী সমন্বয় পরিষদের বর্তমান নেতৃত্বের কড়া সমালোচনা করে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, ‘একটি রাজনৈতিক দল (বিএনপি) তাদের নেতাকে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর সমনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠায় ব্যস্ত ছিল; সর্বোচ্চ আদালত ত্রয়োদশ সংশোধনীর মতো রায় দিয়েছে। ওই রায় নিয়ে তারা অশ্রাব্য ভাষায় গালাগালি করেছে। তখন আমাদের তো সমন্বয় পরিষদ ছিল। তারা কি করেছে?’

তিনি বলেন, ‘এ ঘটনায় আইনজীবীদের মধ্য থেকে কোন প্রতিবাদ না দেখে বাধ্য হয়ে আমি একদিন টিভিতে গিয়ে রায় নিয়ে বিস্তারিত বক্তব্য তুলে ধরি। এই রায় সম্পর্কে এখন সকল সংশয় দূর হয়েছে।’

মাহবুবে আলম প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘কিন্তু সমন্বয় পরিষদের নেতারা কেন নিশ্চুপ, নিরব ভূমিকা পালন করেছেন, তা আমার এখনো বোধগম্য নয়। এমনকি আমাদের দলের সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠা অনেক আইনজীবী মিথ্যাচারের আশ্রয় নেয়াদের সাথে সুর মিলিয়েছেন। এটা দুঃখজনক।’

‘জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে কথা বলবেন না, তাহলে সমন্বয় পরিষদের দরকার কি?- এমনও প্রশ্ন করেন মাহবুবে আলম।

তিনি বলেন, ‘নেতৃত্ব বদল হবে এমন সংগঠন আমরা চাই। পকেট মার্কা সংগঠন জনগণের কোন কাজে আসবে না।’

অ্যাটর্নি জেনারেল আরো বলেন, ‘সবচেয়ে বড় কষ্ট পেয়েছি সমন্বয় পরিষদের সদস্য সচিব সুব্রত চৌধুরীর আচরণে। তাকে আইনজীবী সমিতির সম্পাদক করতে চেয়ে আমি অনেকের শত্রু  বনে গেছি। অথচ তিনি নতুন একটি সংগঠনের বার্তাবরণে লাল পাঞ্জাবি পরে খালেদা জিয়ার পাশে বসেছেন।’

তিনি বলেন, ‘পরিষদ একজনের পারপাস সার্ভ করুক আমরা আর তা চায় না। নেতৃত্বের বদল জরুরি হয়ে পড়েছে। একটি মুখ বারবার দেখতে ভালো লাগে না।’

এছাড়া সকালেই অপরপক্ষ প্রতিনিধি সমাবেশ করে। সকাল সাড়ে ১০টায় শুরু হওয়া এই প্রতিনিধি সমাবেশের সভামঞ্চে আয়োজক সংগঠন হিসেবে ‘বঙ্গবন্ধু আইনজীবী পরিষদের’ নাম লেখা ছিল। তবে বক্তারা তাদের বক্তব্যে এটাকে সম্মিলিত আইনজীবী সমন্বয় পরিষদ বলে দাবি করেন।

সভায় বিতরণ করা অনুষ্ঠান সূচি এবং সভাস্থলের বাইরের বিভিন্ন জায়গায় টানানো ব্যানারেও সম্মিলিত আইনজীবী সমন্বয় পরিষদের নাম লেখা রয়েছে।

ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলামের সভাপতিত্বে এই প্রতিনিধি সমাবেশে ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন অংশ নেন। তিনি বাসেত মজুমদারকে আহ্বায়ক করে নতুন কমিটি ঘোষণাকে দুঃখজনক অভিহিত করেন।

ক্ষোভ প্রকাশ করে সাহারা বলেন, ‘জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা কয়েকদিন আগে আমার বাসায় বৈঠক করে সমঝোতায় পৌঁছান। সে সময় বাসেত মজুমদার ও লায়েকুজ্জামান মোল্লা সম্মতি দিয়েছিলেন। অথচ আজকে হঠাৎ করে তারাই কেন এমন সিদ্ধান্ত নিলেন তা আমার বোধগম্য নয়।’

তিনি বলেন, ‘আমরা আইনজীবীরা সব সময় ঐক্যবদ্ধ থাকতে চেয়েছি এবং থেকেছিও। কিন্তু এরপরও বাসেত মজুমদারের নেতৃত্বে আরেকটি সমন্বয় পরিষদের প্যানেল ঘোষণা করা হয়েছে। একটি কমিটি থাকার পরও আরেকটি কমিটি ঘোষণা- এটা ঠিক হয়নি।’

তিনি আরো বলেন, ‘সমন্বয় পরিষদ গঠন করার সময় অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম। বর্তমানে তিনি এই পরিষদের আহ্বায়ক।’

সাহারা খাতুন বলেন, ‘আগামী সম্মেলনে তাকে আহ্বায়ক রাখার কথা ছিল। বার কাউন্সিল, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি বিভিন্ন বার সমিতির নির্বাচনে আমাদের বিভক্তির কারণে হেরেছি। এই বিভক্তি নিরসনের দায়িত্ব ছিল জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদের।’

নতুন কমিটি গঠনের সমালোচনা করে সভায় ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষ শক্তির মধ্যে এই দ্বিধা-বিভক্তি আমাদের জন্য অনেক বড় ক্ষতি। আমি বিশ্বাস করি, আমরা এই বিভক্তি-দ্বন্দ্ব থেকে বেরিয়ে আসতে পারব। আমার প্রাণের স্পন্দন এই সংগঠন।’

তিনি বলেন, ‘কিন্তু আজ যে ঘটনাটি ঘটে গেল, এর চেয়ে লজ্জাজনক আমার জীবনে আর আসেনি। আমি খুবই ভারাক্রান্ত। যেখানে আমি সমন্বয় আহ্বায়ক হিসেবে একটি সভায় সভাপতিত্ব করছি, সেখানে আরেকটি কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে।’

পরে আমীর-উল ইসলাম সাহারা খাতুনকে আহ্বায়ক এবং সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সম্পাদক মো. মোমতাজ উদ্দিন মেহেদিকে সদস্য সচিব করে ১০১ সদস্যের সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটি গঠন করেন।

সভা থেকে জানানো হয়, আগামী পাঁচ মাসের মধ্যে মহাসম্মেলন করে নতুন করে কমিটি গঠন করা হবে। বার সম্পাদক মমতাজ উদ্দিন মেহেদী এই অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন।

তবে শনিবার পাল্টাপাল্টি অনুষ্ঠান থেকে থেকে উভয় কমিটির নেতারা সম্মিলিত আইনজীবী সমন্বয় পরিষদ ভাঙনে পরস্পরকে দায়ী করেছেন।


পূর্বের সংবাদ
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০