এক বছরে যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রার বিপরীতে বাংলাদেশের টাকার মান বেড়েছে প্রায় ৫ শতাংশ

ঢাকা, ডিসেম্বর ১৬ (খবর তরঙ্গ ডটকম)- ডলারের দর ধরে রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজারে সক্রিয় হওয়ার পরও গত এক বছরে যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রার বিপরীতে বাংলাদেশের টাকার মান বেড়েছে প্রায় ৫ শতাংশ। গত সপ্তাহের শেষ দিন বৃহস্পতিবার আন্তঃব্যাংক মুদ্রা বাজারে প্রতি ডলারের বিনিময়ে পাওয়া গেছে ৮০ টাকা ৫০ পয়সা। গত দশ দিনে প্রায় প্রতি দিনই ডলারের দর ১০ থেকে ১৫ পয়সা করে কমেছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে ডলারের বিনিময় হার বাড়তে বাড়তে ৮৪ টাকা ৫০ পয়সায় পৌঁছায়, যা এ যাবতকালের সর্বোচ্চ।

অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রবাসী আয় ও বিদেশি ঋণ-সহায়তা বাড়ার পাশাপাশি আমদানি ব্যয় কমে আসায় বাজারে ডলারের সরবরাহ বেড়েছে। আর এ কারণেই টাকার বিপরীতে দর হারাচ্ছে ডলার।

ডলারের এই দরপতনে যাতে প্রবাসী আয় বা রপ্তানি আয়ে নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে, সেজন্য বেশ কিছুদিন আগে থেকেই উদ্যোগী হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। গত সপ্তাহে বাংলাদেশ ব্যাংক বাজার থেকে কিনে নিয়েছে ১২০ মিলিয়ন ডলার।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ হাসান জামান বলেন, “রেমিটেন্স, রপ্তানি আয় ও বিদেশি সহায়তা বাড়ার পাশাপাশি আমদানি চাহিদা কমেছে। এ কারণে সম্প্রতি বাজারে ডলারের সরবরাহ বাড়ায় দর কমছে।”

কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুদ্রা বাজারে হস্তক্ষেপ করছে না বলে দাবি করলেও ব্যাপক দরপতন এড়াতে বাজার থেকে ডলার কেনা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

আর টাকার বিপরীতে ডলারের মান কমে আসা সার্বিকভাবে মুল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য ইতিবাচক বলে তিনি মন্তব্য করেন।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণা পরিচালক জায়েদ বখত বলেন, ডলারের দর বেশি পড়ে গেলে রেমিটেন্স ও রপ্তানি আয় কমে যাবে। সে কারণেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার থেকে ডলার কিনছে।

“ডলারের দর ধরে রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এভাবে বাজারে হস্তক্ষেপ করছে বলা যায়।”

ডলারের বিনিময়ে তুলনামূলকভাবে বেশি টাকা পাওয়া গেছে বলে গত কিছুদিন ধরে প্রবাসীরা বেশি অর্থ দেশে পাঠাচ্ছেন বলেও মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ।

তার মতে, রপ্তানি আয়েও এটি ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে।

এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আবার ১২ বিলিয়ন (১২ শ’ কোটি) ডলার ছাড়িয়ে গেছে। বৃহস্পতিবার রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ১২ দশমিক ১০ বিলিয়ন ডলার। এর আগে গত ১৮ অক্টোবর প্রথমবারের মতো রিজার্ভ ১২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছিল। তবে নভেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) আমদানি বিল পরিশোধের পর রিজার্ভ আবার কিছুটা নিচে নেমে আসে।

গত এক মাসে তা আবার বেড়ে ১২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেক্স রিজার্ভ অ্যান্ড ট্রেজারি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের মহা ব্যবস্থাপক কাজী সাইদুর রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “মূলত প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্স প্রবাহ বাড়ায় রিজার্ভ বেশ কিছুদিন ধরে সন্তোষজনক অবস্থায় রয়েছে। এছাড়া বিদেশি সাহায্য বৃদ্ধি এবং আমদানি ব্যয় কমার কারণেও রিজার্ভ বেড়েছে।”

বর্তমানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে যে ডলারের সঞ্চয় আছে, তা দিয়ে প্রায় পাঁচ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব বলে জানান তিনি।

সাইদুর রহমান বলেন, জানুয়ারি মাসে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বর্ধিত ঋণ সুবিধার দ্বিতীয় কিস্তির ১৪ কোটি ১০ লাখ ডলার পাওয়া গেলে রিজার্ভ আরো বাড়বে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০১২-১৩ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) ৬১২ কোটি দেশে পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। যা গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ২৪ শতাংশ বেশি।

চলতি ডিসেম্বর মাসের প্রথম সাত দিনে রেমিটেন্স এসেছে ৩০ কোটি ডলার। কোরবানির ঈদ ও দুর্গাপূজাকে সামনে রেখে প্রবাসীরা বেশি টাকা পাঠানোয় অক্টোবর মাসে ১৪৫ কোটি ডলারের রেকর্ড পরিমাণ রেমিটেন্স দেশে আসে। এর আগে এক মাসে এতো বেশি রেমিটেন্স কখনো আসেনি।

আর অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) নিট বিদেশি সাহায্যের পরিমাণ ১৭৫ শতাংশ বেড়েছে বলে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) জানিয়েছে।

অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বর সময়ে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় রপ্তানি আয় বেড়েছে ৪ দশমিক ৩৬ শতাংশ। আর জুলাই-অক্টোবর সময়ে আমদানি ব্যয় কমেছে ৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ। গত বছরের একই সময়ে আমদানি ব্যয় বেড়েছিল ২৩ দশমিক ১৩ শতাংশ।

জায়েদ বখত বলেন, “সার্বিকভাবে আমদানি ব্যয় কমা ভাল। তবে শিল্প স্থাপনের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন যে মূলধনী যন্ত্রপাতি, তার আমদানি কমলে অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।”

আর তেমনটি ঘটলে চলতি অর্থবছরে সরকারের প্রত্যাশা অনুযায়ী ৭ দশমিক ২ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন নাও হতে পারে বলে সতর্ক করে দেন এই গবেষক।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।