পুলিশ বাহিনীতে কনস্টেবল নিয়োগে তদবির বাণিজ্য ও দলীয়করণের অভিযোগ - খবর তরঙ্গ
শিরোনাম :

পুলিশ বাহিনীতে কনস্টেবল নিয়োগে তদবির বাণিজ্য ও দলীয়করণের অভিযোগ



ঢাকা, (খবর তরঙ্গ ডটকম)

মহাজোট সরকারের শেষ সময়ে পুলিশ বাহিনীতে কনস্টেবল নিয়োগে তদবির বাণিজ্য ও দলীয়করণের অভিযোগ ওঠেছে। অথচ পুলিশ সদর দফতরের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে প্রার্থীদের আর্থিক দেলনদেনে জড়িত ও প্রতারিত না হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। এছাড়া নিয়োগ প্রক্রিয়ায় তদবির করলে তা প্রার্থীর চরম অযোগ্যতা হিসেবে গণ্য করার কথা বলা হয়েছে। এরপরও নিয়োগে মোটা অংকের টাকার ছড়াছড়ি ও নজিরবিহীন তদবির বাণিজ্যের খবর পাওয়া গেছে। ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে মাত্র এক মাসের ব্যবধানে  গোপালগঞ্জ অঞ্চলের পাঁচ শতাধিক প্রার্থী অভিনব কায়দায জমি কিনে বাসিন্দা হয়ে চাকরি নেয়ার চেষ্টা করছেন। পুলিশ কনস্টেবল নিযোগে রাষ্ট্রপতির কার্যালয় থেকে শুরু করে প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রীবর্গ, সংসদ সদস্য, জেলা পরিষদ প্রশাসক, পুলিশ সদর দফতর, সরকারের প্রভাবশালী বিভিন্ন মহল ও  সরকারি দলের নেতা-পাতি নেতাসহ সবাই তদবিরে নেমেছে বলে জানা গেছে।

পুলিশ সদর দফতরের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে জননিরাপত্তা বিধান ও সেবার মহান ব্রত নিয়ে বাংলাদেশ পুলিশে সাড়ে তিন হাজার ট্রেইনি রিক্রুট পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়। এরমধ্যে দুই হাজার ৯৭৫ জন পুরুষ ও ৫২৫ জন মহিলা পুলিশ। ১ জানুয়ারি ২০১৩ থেকে ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত দেশের ৬৪টি জেলা পুলিশ লাইন্স মাঠ থেকে সরাসরি পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগ দেয়া হবে। জেলার জনসংখ্যা অনুযায়ী লোকবলের সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই নিয়োগ নিয়ে চলছে জেলা পুলিশ সুপারদের কার্যালয়ে তদবির বাণিজ্য। শর্ত ভঙ্গ করে হলেও কনস্টেবল নিয়োগের রাজনৈতিক তদবিরে পুলিশ সুপাররা (এসপি) অতিষ্ট এবং দিশেহারা। এসপিরা গুরুত্বপূর্ণ ফোন ছাড়া এখন কোনো ফোনই ধরছেন না। অনেক এসপি তদবিরের চাপে অতিষ্ট হয়ে ফোন বন্ধ করে অফিসেও যাচ্ছেন না।

বিভিন্ন পুলিশ সুপার কার্যালয়ের সূত্র জানায়, জেলার মন্ত্রী, মন্ত্রী মর্যাদার কর্মকর্তা, সংসদ সদস্য, জেলা পরিষদ প্রশাসক, সরকারি দলের কেন্দ্রীয় নেতারা কনস্টেবল পদে নিয়োগের জন্য এলাকাভিত্তিক তালিকা দিচ্ছেন। জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের আধা সরকারি পত্রে নিয়োগের জন্য তালিকা দিয়ে এমপিরা পুলিশ সুপারদের নির্দেশ দিচ্ছেন। এসপিদের ফ্যাক্সেও পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে ডিও লেটারে তালিকা। দলীয় কর্মী পরিচয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকা তো আছেই। এছাড়াও তদবিরের তালিকায় রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীর  কার্যালয়সহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগের মন্ত্রী ও কর্মকর্তারাও পাঠাচ্ছেন তালিকা। সংসদ সদস্যরা নিজ এলাকার নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির কোটার চেয়ে বেশি নিয়োগের তালিকা ধরিয়ে দিয়ে এসপিদের চাপ দিচ্ছেন। এতে তারা এসপিদের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে পড়ছেন। এমপিরা উপরের নির্দেশ মোতাবেক এলাকার কোটা অনুযায়ী নির্দিষ্টসংখ্যক নিয়োগ আদায় করতে উঠে পড়ে লেগেছেন।

পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগে তদবিরের তালিকায় অনুসন্ধানে জানা যায়, সরকারি দলের সংসদ সদস্যদের পাশাপাশি জেলা পরিষদ প্রশাসক, জেলা ও থানা সভাপতি-সম্পাদকসহ পাতি নেতারাও তদবিরে এগিয়ে আছেন। চাকরির প্রত্যাশায় প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের প্রার্থীরা ধর্ণা দিচ্ছেন এমপি-মন্ত্রীর চেলা চামুন্ডা ও নেতাদের বাসায়। নিয়োগের নিশ্চয়তা দিয়ে তারাই ঘুষের দরদাম হাঁকাচ্ছেন। পুলিশ নিয়োগে সর্বোচ্চ ঘুষের রেটে এগিয়ে আছে ঢাকা, টাঙ্গাইল ও ময়মনসিংহ জেলা। শেরপুর, জামালপুর, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ঢাকা, খুলনা, রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের জেলাগুলোতেও চলছে নিয়োগের তদবিরের মচ্ছব।

জানা যায়, টাঙ্গাইলে কনস্টেবল নিয়োগে ঘুষের রেট উঠেছে সাত লাখের ওপরে। অন্যান্য স্থানে পুরুষ কনস্টেবল চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা হাঁকা হচ্ছে। আর এই নিয়োগ বাণিজ্যের লেনদেন নিয়ে প্রকাশ্যে এমপি ও সরকারি দলের নেতাদের বাসা ও অফিসে দেন-দরবার হচ্ছে বলে একাধিক প্রার্থী সূত্রে জানা গেছে।

পুলিশে নিয়োগে তদবিরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রীর বাসায় ভিড় করছেন বিপুলসংখ্যক তদবিরকারী। গত তিনদিন ধরে মন্ত্রী ড. মহীউদ্দীনখান আলমগীর অফিস করছেন না। মন্ত্রীর নামে তালিকা পাঠানো হচ্ছে বিভিন্ন জেলা থেকে। এছাড়াও স্থানীয় এমপি মন্ত্রীদের দেয়া তালিকা অনুযায়ী পুলিশ কনস্টেবল পদে নিয়োগের জন্য পুলিশ সুপারদের মৌখিক নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এমপির দেয়া তালিকার বাইরে নিয়োগ দেয়া হলে এসপিদের জেলা থেকে প্রত্যাহার ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে তাদের ভয় দেখানো হচ্ছে। এ কারণে অনেক এসপিই এখন আর নিয়োগ দিতে আগ্রহী হারিয়ে ফেলছে। শারীরিক মাপ ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হলেও তালিকা মোতাবেক নিয়োগের নির্দেশে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন প্রার্থীর অভিভাবক জানান, স্থানীয় এমপির ডিও আনতে চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। সে অনুযায়ী তাদের চাকরি শতভাগ নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছে। পুলিশ কনস্টেবল পদে চাকরি দেয়ার জন্য বেশ কয়েকজন মহিলা ও পুরুষ প্রার্থীদের কাছ থেকে খুবই অমানবিক কায়দায় ঘুষ গ্রহণের তথ্য পাওয়া গেছে।

এ অবস্থায় সাধারণ প্রার্থীরা হতাশ হয়ে পড়েছেন। পুলিশ লাইন মাটে নিয়োগের বাছাই করা হলেও সূত্র জানায় দুই তিনদিন আগেই তদবিরের তালিকানুয়ায়ী নিয়োগ সম্পন্ন করা হয়েছে। শুধু ফরমালিটিস মানা হয়েছে।

এদিকে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ জেলায় অভিনব পন্থায় মোটা অংকের ঘুষ লেনদেনের বিনিময়ে চাকরির খবর পাওয়া যাচ্ছে। ঢাকা জেলার ধামরাই ও আশুলিয়ায় মাত্র এক মাসের ব্যবধানে জমি কিনে নাগরিকত্ব সনদ নিয়ে তিন শতাধিক ব্যক্তি পুলিশে নিয়োগে আবেদন করেছেন। নারায়ণগঞ্জ জেলায়ও একই অবস্থা। ঢাকা জেলার ধামরাই থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) এর তত্ত্বাবধানে ১১২ জন প্রার্থী ও আশুলিয়ার পরিদর্শক তদন্তের তত্বাবধানে ৩৮ জন প্রার্থীর নতুন জায়গা কেনার ব্যবস্থা করেছে বলে জানা গেছে।

ঢাকা জেলার এসপি হিসেবে হাবিবুর রহমান সম্প্রতি যোগদান করেই গোপালগঞ্জের বাসিন্দাদের নিয়োগের এই অভিনব পদ্ধতি আবিষ্কার করেন বলে জানা গেছে। তার সরকারি মোবাইলে মোবাইলে একাধিকবার ফোন করলেও তিনি ধরছেন না। ঢাকা জেলার প্রকৃত বাসিন্দারা বঞ্চিত হচ্ছেন। ঢাকা জেলার একাধিক সংসদ সদস্য এ ব্যাপারে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বরাবর আবেদন করলেও কোনো বিশেষ এলাকার ক্ষমতায় এসপি কাউকে পাত্তা দিচ্ছেন না।

পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগ নিয়ে দুর্নীতি ও নানা ধরনের অভিযোগ প্রসঙ্গে পুলিশের মহা পরিদর্শক হাসান মাহমুদ খন্দকার নতুন বার্তা ডটকমকে জানান, বিধি অনুযায়ী নিয়োগ দিতে এসপিদের বলা হয়েছে। কনস্টেবল নিয়োগে পুলিশ হেডকোয়াটার থেকে কোনো তালিকা দেয়া হয়নি।

স্থানীয় এমপিরা তাদের দেয়া তালিকা অনুযায়ী নিয়োগ দিতে এসপিদের ওপর চাপ প্রয়োগ করছে। তা না হলে এসপিদের জেলা থেকে প্রত্যাহার এবং তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। এ ধরনের অভিযোগ প্রসঙ্গে আইজিপি বলেন, “এ ধরনের অভিযোগ সম্পর্কে আমি ওয়াকিবহাল নই। এমপি সাহেবরা তদবির করতেই পারে তবে আমার মনে হয় না কোনো সংসদ সদস্য এ ধরনের কথা বলতে পারেন।”


পূর্বের সংবাদ