ডিজেল ও কেরোসিনের দাম বাড়ানোর ফলে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতিকে উস্কে দিতে পারে: সিপিডি - খবর তরঙ্গ
শিরোনাম :

ডিজেল ও কেরোসিনের দাম বাড়ানোর ফলে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতিকে উস্কে দিতে পারে: সিপিডি



ঢাকা, (খবর তরঙ্গ ডটকম)

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে সরকার সামান্য অর্থ সাশ্রয় করলেও কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তা ব্যাহত হবে বলে মনে করে । বাংলাদেশের অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকের বিশ্লেষণ করে তারা জানায়, বিভিন্ন ঝুঁকির কারণে সরকারের ষষ্ঠ-পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার লক্ষ্য অর্জন অনেক ক্ষেত্রেই সম্ভব হবে না। সিপিডির বিশ্লেষণে, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ফলে সরকারের সাশ্রয় হবে শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ। এর ফলে আমদানি-রপ্তানি কমবে, পোশাক উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হবে, প্রভাব পড়বে কর্মসংস্থানে যা সার্বিক অর্থেই মানুষের জীবনযাত্রায় বাড়তি চাপ বয়ে আনবে।
শনিবার রাজধানীর ধানমন্ডিরতে সিপিডি কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিমত তুলে ধরেন সংস্থাটির কর্মকর্তারা।
২০১২-১৩ অর্থ বছরের প্রথম ছয় মাসের অর্থনৈতিক সূচক পর্যালোচনা তুলে ধরতেই এ সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করা হয়। এতে মূল পর্যালোচনা তুলে ধরেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান। এ সময় গবেষণা বিভাগের অন্যান্য কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।

সংবাদ সম্মেলনে মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ডিজেল ও কেরোসিনের দাম বাড়ানোর ফলে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতিকে উস্কে দিতে পারে এবং স্থির আয়ের মানুষের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। সিপিডির বিশ্লেষণে দেখা যায়, পাঁচ মাসে রাজস্ব আয় প্রায় ১৫ ভাগ বাড়লেও প্রায় ১৯ ভাগের লক্ষ্য পূরণ করতে হলে শেষ সাত মাসে তা ২১ ভাগ বাড়াতে হবে। সরকারের ব্যাংক ঋণ বাড়বে। তবে খাদ্যপণ্যের দাম কমলেও খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি বাড়বে। এতে দেখা যায়, পাঁচ মাসে রপ্তানি বেড়েছে মাত্র ৪ ভাগ। এখন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হলে পরের সাত মাসে রপ্তানি বাড়াতে হবে ২১ ভাগের কাছাকাছি।

এদিকে, আমদানি খরচ কমলেও মূলধনী যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানি কমে যাওয়ায় বিনিয়োগ ও শিল্প খাতের জন্য তা ইতিবাচক নয় বলেও উল্লেখ করা হয় সংবাদ সম্মেলনে। এদিকে, ব্যক্তিখাতে সূচকের প্রবণতা নিম্নমুখী উল্লেখ করে সিপিডির ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বর্তমানে জিডিপি ৬ দশমিক ৭ থেকে ৬ দশমিক ৩ এ নেমে এসেছে। এ বছর দ্বিতীয়বারের মতো আবারো আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

তিনি বলেন, যোগ্যতা ও স্বচ্ছতার ভিত্তিতে নয় বরং রাজনৈতিক বিবেচনায় ফের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে পরিচালক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনে মূলত রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে এসব পরিচালক নিয়োগ পাচ্ছেন।

‘তবে এটি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় করছে নাকি অর্থ মন্ত্রণালয় করছে, তা পরিষ্কার নয়। ফলে অযোগ্য, যাদের কোনো পেশাগত স্বীকৃতি নেই তারাও পরিচালক নিয়োগ পেয়ে যাচ্ছেন।’- যোগ করেন দেপ্রিয়।

রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সাথে আমলাতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত পরিচালক নিয়োগের পেছনে কলকাঠি নাড়ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

দেবপ্রিয় প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর পরিচালক নিয়োগের ক্ষমতা কার? কেন্দ্রীয় ব্যাংকের, না অর্থমন্ত্রণালয়ের আর্থিক বিভাগের? নাকি তাদের ওপরে প্রধানমন্ত্রীর মন্ত্রণালয়ের?’

তিনি আরো বলেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ভেতরে বাংলাদেশে এখন অর্থনৈতিক নীতিমালার ক্ষেত্রে একটি সামগ্রিক সমঝোতার সৃষ্টি হয়েছে। সবাই বলে- বিনিয়োগ দরকার, ৭ থেকে ৮ শতাংশে প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হবে। সকলেই বলে- আর্থ সামাজিক উন্নয়নের জন্য মানবসম্পদের উন্নয়ন করতে হবে, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে উন্নয়ন ঘটাতে হবে। যদি এত ঐক্যমত্য থাকে তাহলে আমরা কেন অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ঐক্যমত্যে পৌঁছাতে পারবো না।

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের পরিচালক নিয়োগের ক্ষমতা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে দেওয়ার পাশাপাশি এ ব্যাপারে মোট তিন দফা সুপারিশও তুলে ধরেন ড. দেবপ্রিয় ভট্টচার্য।

তার মতে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের পরিচালক নিয়োগের ক্ষমতা পুরোপুরি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে থাকতে হবে। সেই সাথে যারা নিয়োগ পাবেন তাদের যোগ্যতার জন্য একটি পরিষ্কার মাপকাঠি থাকতে হবে। সবশেষ তিনি পরিচালক নিয়োগে একটি প্রাথমিক কমিটি গঠনের প্রয়োজনীয়তার পক্ষে নিজের মনোভাব তুলে ধরেন।

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে সিপিডি ফেলো বলেন, সর্বশেষ পরিচালক নিয়োগে কিছুটা পরিবর্তন দেখা গেছে। তবে এটি টেকসই নয়। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের পরিচালক নিয়োগে নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো খবরদারি নেই। কিন্তু এটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আওতায় নিয়ে আসা উচিত।

তিনি আরো বলেন, বর্তমান বিধি মোতাবেক যে কেউ, যে কোনো সময় পরিচালক হিসেবে নিয়োগ পেতে পারেন। এভাবে পেশাজীবীদের আড়ালে রাজনীতিকরা এখানে ঢুকে গেছেন। যার ফলে হলমার্কের মতো ঘটনা ঘটেছে। তবে হলমার্ক থেকে শিক্ষা নিয়ে সরকার হয়তো এ সংস্কৃতি থেকে কিছুটা সরে এসেছে। কিন্তু মনোনয়ন প্রক্রিয়া আগের মতোই রয়ে গেছে। ফলে এটি টেকসই কোনো পরিবর্তন নয়।

সংবাদ সম্মেলনে পদ্মা সেতু প্রসঙ্গে ড. দেবপ্রিয় বলেন, ‘আমরা সব সময় বলেছি বিকল্প অর্থায়নের চেয়ে বিশ্ব ব্যাংকের সাথে সমঝোতা করে তার অর্থায়ন নিয়ে আসতে হবে। সরকার অথবা এর বাইরের বিভিন্ন মহলের আলোচনার ফলে আমরা কিছুটা আশার আলো দেখছিলাম।’

তিনি বলেন, ‘আমরা চেয়েছিলাম, দুর্নীতির তদন্ত ও অর্থায়ন এক সাথে চলুক। সরকারও তাই বলেছিল। কিন্তু বিশ্ব ব্যাংক তাতে রাজি হয়নি। তারা চেয়েছে তদন্তের সন্তোষজনক পর্যায় এবং বিশ্বাসযোগ্য অগ্রগতি।’

দেবপ্রিয় আরো বলেন, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কথায় সরকারের বক্তব্যের প্রতিফলন দেখা গেছে। তাদের মধ্যে একটা সমঝোতা হয়েছে বলে আমার মনে হয়। এর ফলে ঋণপ্রাপ্তি ক্ষীণ হয়ে গেছে। তবে উন্নতির জন্য আরো অপেক্ষা করতে হবে।


পূর্বের সংবাদ