চার বছরে ব্যাংকগুলো থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা লোপাট - খবর তরঙ্গ
শিরোনাম :

চার বছরে ব্যাংকগুলো থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা লোপাট



নিউজ ডেক্স, (খবর তরঙ্গ ডটকম)

কয়েকটি চক্র দেশের বিভিন্ন এলাকায় রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে শিল্প-কারখানা  ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ার অজুহাতে নামকরা ব্যাংকগুলোকে দেউলিয়া করার মিশনে নেমেছে। গত চার বছরে এভাবে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন ব্যাংক থেকে লোপাট হয়েছে ১৫ হাজার কোটি টাকা। বিষয়টির অনুসন্ধান চালাচ্ছে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) বেশ কয়টি দল। ইতিমধ্যে দুদকের অনুসন্ধানী দল রাষ্ট্রায়াত্ত সোনালী, রূপালী, অগ্রণী, জনতা ও কৃষি ব্যাংকেই প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার কোটি টাকা লোপাটের ঘটনা উদঘাটনে সক্ষম হয়েছে। দুদকের অনুসন্ধানে বেসরকারি ব্যাংক আইএফআইসি, প্রাইম, বেসিক ও মার্কেন্টাইল ব্যাংক লিমিটেডে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা লুটপাটের ঘটনা নিশ্চিত হয়েছে দুদক।

দুদক সূত্রে জানা গেছে, ২০১২ সালের মে মাস থেকে বিভিন্ন ব্যাংকের বিরুদ্ধে এ ধরনের দুই শতাধিক অভিযোগ দুদকে জমা পড়ে। এরমধ্যে এ পর্যন্ত অর্ধশতাধিক অভিযোগের অনুসন্ধান শুরু হয়েছে।
সোনালী ব্যাংকর বিভিন্ন শাখা থেকেই প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা, রূপালী ব্যাংকের বিভিন্ন শাখায় দেড় হাজার কোটি টাকা, জনতা ব্যাংকের কয়েকটি শাখায় এক হাজার ৯০ কোটি টাকা, কৃষি ব্যাংকের ছয়টি শাখায় ৬২১ কোটি, অগ্রণী ব্যাংকের কয়েকটি শাখায় প্রায় ২৫০ কোটি টাকা ঋণের নামে লুটপাট হয়েছে।
এছাড়া, আইএফআইসি ব্যাংকে ৩৫০ কোটি, প্রাইমে ১০০ কোটি ও মার্কেন্টাইল ব্যাংকে ৪০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সোনালী ব্যাংক
হলমার্ক গ্রুপসহ কয়েকটি ভুয়া প্রতিষ্ঠানর সোনালী ব্যাংকের বিভিন্ন শাখা থেকে প্রায় চার হাজার কোটি টাকা লোপাটের ঘটনায় হলমার্ক গ্রুপ ও ব্যাংকটির কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুই দফায় ৩৭টি মামলাও দায়ের করেছে দুদক। সরাসরি হলমার্ক গ্রুপ জালিয়াতির মাধ্যমে সোনালী ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছে চার হাজার কোটি টাকা।
রূপালী ব্যাংক
গত ১৬ সেপ্টেম্বর দুদক ১৫ কোটি টাকা ঋণ জালিয়াতির মাধ্যমে আত্মসাতের অভিযোগে রূপালী ব্যাংকের দিলকুশা শাখার মহাব্যবস্থাপক এস এম আতিকুর রহমান, একই শাখার জ্যেষ্ঠ প্রিন্সিপাল অফিসার মো. আবদুস সামাদ সরকার ও গুলশান শাখার উপ-মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ আলী এবং এভারেস্ট অ্যান্ড টেকনোলজি লিমিটেডের চেয়ারম্যান আবু বোরহান সিদ্দিক চৌধুরী ও এ ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ এইচ এম বাহাউদ্দিনের বিরুদ্ধে মতিঝিল থানায় মামলা করে।
জনতা ব্যাংক
জনতা ব্যাংকের রমনা করপোরেট ও লোকাল অফিস থেকে তানভীর চৌধুরীর নাম ব্যবহার করে মেসার্স চৌধুরী নিটওয়্যারস লিমিটেড এবং মেসার্স চৌধুরী টাওয়েলের নামে ঋণ দেখিয়ে ৩৫০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ অনুসন্ধান করছে দুদকের সহকারী পরিচালক মাহমুদ হাসানের নেতৃত্বে চার সদস্যের একটি দল।
কৃষি ব্যাংক
কৃষি ব্যাংকের কুষ্টিয়া শাখা থেকে ভূয়া ঋণপত্রের মাধ্যমে ১৭৪ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ওই শাখার ম্যানেজার  গুলজার হোসেন বরখাস্ত হয়েছেন। ২০০৯ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত সুরেখা এন্টারপ্রাইজ, আলম এন্টারপ্রাইজ, ব্রাদার্স অ্যাসোসিয়েট, শাহনাজ ট্রেডিং এবং এমআর করপোরেশনের নামে এলসি খুলে ওই পরিমাণ ঋণ দেয়া হয়।
অগ্রণী ব্যাংক
অগ্রণী ব্যাংকের বিভিন্ন শাখায় জাল প্রতিরক্ষা সঞ্চয়পত্র নিয়ে ঋণ দেয়ার অভিযোগ রয়েছে। ব্যাংকে অজ্ঞাত ব্যক্তিদের জমা রাখা জাল প্রতিরক্ষা সঞ্চয়পত্রর বিনিময়ে প্রায় ২৫ কোটি টাকা ঋণ দেয়া হয়েছে। ব্যাংকের যে সব কর্মকর্তা প্রতিরক্ষা সঞ্চয়পত্র গ্রহণ ও ঋণ দেয়ার সঙ্গে যুক্ত, তাদের শনাক্ত করতে মাঠে নেমেছে দুদকের অনুসন্ধানী দল।
মার্কেন্টাইল ব্যাংক
প্রায় ২০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ পাওয়া গেছে ব্যাংকটির পরিচালক এসএম আহসানের বিরুদ্ধে। দুদকের উপ-পরিচালক আবু সাঈদ আহমেদ ইতিমধ্যে অনুসন্ধান শুরু করেছেন।
গত বছর ব্যাংকের পরিচালনা বোর্ডের সিদ্ধান্ত ছাড়াই ক্ষমতার অপব্যবহার করে এসএম আহসান চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ শাখা থেকে মেসার্স তিতাস এগ্রো কেমিকেল ইন্ডাস্ট্রির নামে ৯ কোটি ৫৫ লাখ টাকা  এবং মাদাম বিবির হাট শাখা থেকে রিজেন্ট করপোরেশন নামে  ৯ কোটি ৮৪ লাখ টাকা তুলে নিয়ে আত্মসাত করেন।
প্রাইম ব্যাংক
প্রাইম ব্যাংকের দিলকুশার ইসলামী ব্যাংকিং শাখাসহ কয়েকটি শাখায় ৩৭টি সঞ্চয়ী ও চলতি হিসাবে অর্থ স্থানান্তরের মাধ্যমে প্রায় শতকোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। ব্যাংকের এ শাখাগুলোতে শত শত ভুয়া বিনিয়োগ (ঋণ) হিসাব খুলে বিভিন্ন জিএল (জেনারেল) হিসাব থেকে সরাসরি ডিপোজিট হিসাবে অর্থ স্থানান্তর, আবার কখনও  লেনদেনহীন বিনিয়োগ হিসাবে বিভিন্ন ভুয়া সঞ্চয়ী বা চলতি হিসাবে স্থানান্তরের মাধ্যমে এ টাকা আত্মসাত করা হয়েছে। দিলকুশার ইসলামী ব্যাংকিং শাখায় মেসার্স নিউ এস কে এন্টারপ্রাইজের একটি চলতি হিসাবের মাধ্যমে প্রায় ৬২ কোটি টাকা আত্মসাত করা হয়।
আইএফআইসি ব্যাংক
ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড কমার্স (আইএফআইসি) ব্যাংকের মতিঝিল, ধানমন্ডি, গুলশান, নয়াপল্টন শাখা এবং চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ ও চকবাজার শাখায় সাড়ে ৩০০ কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতির অভিযোগ অনুসন্ধান করছে দুদক। এছাড়া গত ১ নভেম্বর মামলা করেছে দুদক আরো প্রায় দেড় কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে বাংলাদেশ ড্রেজিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ দু’জনের বিরুদ্ধে।
বেসিক ব্যাংক
বেসিক ব্যাংক লিমিটেডে ঋণ জালিয়াতির মাধ্যমে প্রায় ৯৫৬ কোটি টাকার আত্মসাতের অভিযোগ অনুসন্ধান করছেন দুদকের সিনিয়র উপ-পরিচালক মীর জয়নুল আবেদীন শিবলীর নেতৃত্বে চার সদস্যের একটি দল। অপর তিন সদস্য হলেন- সহকারী পরিচালক মাহবুবুর রহমান, আশিকুর রহমান ও উপ সহকারী পরিচালক নাসির উদ্দিন খান।
ওরিয়েন্টারল ব্যাংক
অপরদিকে সাবেক ওরিয়েন্টারল বর্তমানে আইসিবি ইসলামী ব্যাংকের সাত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ঋণ জালিয়াতির মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুদক ৩৪টি মামলা করে।
গত ৮ জানুয়ারি আদালতে প্রায় আট কোটি  টাকা আত্মাসের ঘটনায় আটটি মামলার চার্জশিট দাখিল করেছে দুদক। ওই সাত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনায় পাঁচটি মামলার চার্জশিট অনুমোদন করেছে দুদক।

পূর্বের সংবাদ