সর্বোচ্চ ১০টি নির্বাচনী এলাকার (আসন) সীমানা পুনর্নির্ধারণ করতে যাচ্ছে ইসি - খবর তরঙ্গ
শিরোনাম :

সর্বোচ্চ ১০টি নির্বাচনী এলাকার (আসন) সীমানা পুনর্নির্ধারণ করতে যাচ্ছে ইসি



ঢাকা, (খবর তরঙ্গ ডটকম)

সংসদীয় আসনের সীমানা পুননির্ধারণ ইস্যুতে পক্ষে-বিপক্ষে চাপের মুখে শেষ পর্যন্ত সরকারি দলের দাবি মেনে নিয়ে কৌশলী সিদ্ধান্তের আভাস দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সর্বোচ্চ ১০টি নির্বাচনী এলাকার (আসন) সীমানা পুনর্নির্ধারণ করতে যাচ্ছে বলে বুধবার জানিয়েছে ইসি।
কমিশন সচিবালয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমেদ এক ব্রিফিংয়ে জানান, সংসদীয় আসনের সীমানা পুননির্ধারণের ব্যাপারে প্রায় সাড়ে চার হাজার আবেদন জমা পড়েছে। এসব আবেদন কমিশন খতিয়ে দেখবে। কোনো আসনে খুব বেশি আবেদন জমা পড়লে বিবেচনা করা হবে।

তিনি জানান, ‌খুব দ্রুত সীমানা পুনর্নির্ধারণ হয়ে যাবে। কমিশন সূত্রে জানা গেছে, আগামী ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যেই এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হবে।

ব্রিফিংয়ে নির্বাচন কমিশনার মো. শাহনেওয়াজ জানিয়েছেন, সর্বোচ্চ ১০টি আসনের সীমানা পুনর্বিন্যাস করা হতে পারে।

প্রসঙ্গত, প্রত্যেক আদমশুমারির প্রতিবেদন প্রকাশের পরে সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণের আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু সরকারি দল আওয়ামী লীগ ইসির কাছে দাবি জানিয়েছে বিদ্যমান সংসদীয় আসনের সীমানা যেন পরিবর্তন না করা হয়।

গত ৫ ডিসেম্বর সংসদ উপনেতা ও আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের ১২ সদস্যের প্রতিনিধি নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে এক সংলাপে বিদ্যমান সংসদীয় আসনের সীমানা অপরিবর্তিত রাখার কথা বলে।

সংলাপে সাজেদা চৌধুরী বলেন, মাত্র চার বছর আগে যে সীমানা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা এত শিগগিরই পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই। ২০০৮ সালে কমিশন নির্ধারিত সীমানা অপরিবর্তিত রেখে আগামী জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান করা যেতে পারে। নির্বাচনী এলাকার সীমানা ২০১৮ সালে পরিবর্তন করা যেতে পারে বলে তিনি কমিশনকে মতামত দেন।

সংবিধানের ১১৯ অনুচ্ছেদ মোতাবেক নির্বাচন কমিশনের চারটি সাংবিধানিক দায়িত্বের অন্যতম হল সংসদ নির্বাচনের জন্য নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ করা।

এই অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে ‘‌রাষ্ট্রপতি পদের ও সংসদের নির্বাচনের জন্য ভোটার তালিকা প্রস্তুতকরণের তত্ত্বাবধান, নির্দেশ ও নিয়ন্ত্রণ এবং অনুরূপ নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের ওপর ন্যস্ত থাকবে এবং নির্বাচন কমিশন এই সংবিধান ও আইনানুযায়ী (ক) রাষ্ট্রপতি পদের নির্বাচন অনুষ্ঠান করবেন, (খ) সংসদ সদস্যদের নির্বাচন অনুষ্ঠান করবেন, (গ) সংসদে নির্বাচনের জন্য নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ করবেন ও (ঘ) রাষ্ট্রপতির পদের এবং সংসদের নির্বাচনের জন্য ভোটার তালিকা প্রস্তুত করবেন।’

সীমানা পুনর্নির্ধারণের এই কাজটি ইসি করে সীমানা পুনর্নির্ধারণ অধ্যাদেশ, ১৯৭৬ মোতাবেক। এই আইনের ৮(১)(এ) উপধারা মোতাবেক প্রতিটি আদমশুমারির পর পরবর্তী নির্বাচনের আগে সীমানা পুনর্নির্ধারণের কাজটি অবশ্যই সম্পন্ন করতে হবে। ২০১১ সালের আদম শুমারির চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ায় এখন ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে সীমানা পুনর্নির্ধারণের বাধ্যবাকতা রয়েছে ইসির।

এছাড়া সীমানা পুনর্নির্ধারণে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের রয়েছে সাংবিধানিক সুরক্ষা। যার ফলে কমিশনের সিদ্ধান্তকে আদালতেও চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ নেই।

সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১২৫(ক)-মোতাবেক, ‘এই সংবিধানের ১২৪ অনুচ্ছেদের অধীন প্রণীত বা প্রণীত বলিয়া বিবেচিত নির্বাচনী এলাকার সীমা নির্ধারণ, কিংবা অনুরূপ নির্বাচনী এলাকার জন্য আসন-বণ্টন সম্পর্কিত যে কোনো আইনের বৈধতা সম্পর্কে আদালতে প্রশ্ন উত্থাপন করা যাইবে না।’

একইভাবে সীমানা পুনর্নিধারণ অধ্যাদেশ, ১৯৭৬ এর ধারা ৭ (সাত) এ সীমানা পুনর্নির্ধারণে নির্বাচন কমিশনের কোনো কর্মকাণ্ডকে আদালতে চ্যালেঞ্জের অযোগ্য করা হয়েছে।

২০০৮ এর ২৯ এপ্রিল সিইসি ড. শামসুল হুদার নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন ১৩৩টি নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণ করলে ঢাকা-২ নবাবগঞ্জ আসনের সাবেক বিএনপি সাংসদ আবদুল মান্নান হাইকোর্টে বিভাগে একটি রিট আবেদন দায়ের করেন।

এই আবেদনের প্রেক্ষিতে বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও ফরিদ আহমদের যুগ্ম বেঞ্চে ১৩৩টি আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণের ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তকে কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না- তা জানতে চেয়ে নির্বাচন কমিশন ও সরকারের প্রতি রুল জারি করেন।

কিন্তু আপিল বিভাগে রিট আবেদনটি খারিজ হয়ে যায় এবং নির্বাচন কমিশনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ সংক্রান্ত সিদ্ধান্তই বহাল থাকে।

প্রসঙ্গত, ২০০৭ সালের শেষের দিকে প্রকাশিত ২০০১ সালের আদমশুমারির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে হুদা কমিশনের সীমানা পুনর্নির্ধারণের সিদ্ধান্তের কারণে কোনো জেলায় আসন সংখ্যা বেড়েছিল আবার কোথাও কমে গিয়েছিল। এমনটি করতে গিয়ে দীর্ঘদিনের  প্রশাসনিক অখণ্ডতা ও নির্বাচনী ঐতিহ্যও ওলট-পালট হয়ে গিয়েছিল।

এনিয়ে তখন ব্যাপক বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। ১২৫ আসনে ৬৮টি উপজেলা একাধিক নির্বাচনী এলাকায় বিভক্ত হয়ে পড়ে। এর মধ্যে ৩০-৩৫টি এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণের কারণে ব্যাপক জনঅসন্তোষ তৈরি হয়েছিল।

পাশাপাশি দেখা গেছে, সীমানা পুনর্নির্ধারণে হুদা কমিশনের নেয়া সিদ্ধান্তের কারণে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী সব পক্ষ সমান সুযোগ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়েছিল। বিশেষ করে সীমানা পুনর্নির্ধারিত আসনগুলোতে বিএনপি-জামায়াতের নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।


পূর্বের সংবাদ