নিরাপদে কমপক্ষে ১০০ বছর পথচলার কথা থাকলেও মাত্র ২১ বছরের মাথায় মেঘনা সেতু এখন প্রচণ্ড ঝুঁকিপূর্ণ - খবর তরঙ্গ
শিরোনাম :

নিরাপদে কমপক্ষে ১০০ বছর পথচলার কথা থাকলেও মাত্র ২১ বছরের মাথায় মেঘনা সেতু এখন প্রচণ্ড ঝুঁকিপূর্ণ



কুমিল্লা, (খবর তরঙ্গ ডটকম)
নিরাপদে কমপক্ষে ১০০ বছর পথচলার কথা থাকলেও মাত্র ২১ বছরের মাথায় মেঘনা সেতু এখন প্রচণ্ড ঝুঁকিপূর্ণ । ১২টি খুঁটিতে দাঁড়িয়ে থাকা সেতুটির তিনটি খুঁটিই ঝুলে আছে দীর্ঘদিন। মেঘনা সেতুর ভয়াভহ সে চিত্র পানির ৪০ ফুট নিচ থেকে দেখাও যেন একটি বিপজ্জনক বিষয়। পানির ৪০ ফুট গভীরে পানি প্রতিরোধক ক্যামেরায় উঠে আসে ক্ষতিগ্রস্ত খুঁটির ভয়াবহ ছবি। নিমজ্জিত ১২টি খুঁটির নয়টি সমানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। বিশেষ করে ঢাকা-চট্টগ্রাম অভিমুখে ৭, ৮ ও ৯নং খুঁটির পুরো গাজুড়ে অসংখ্য ছোট-বড় ছিদ্র। টর্চের আলোতে এপাশ থেকে ওপাশ দেখতে বেশি বেগ পেতে হয় না। সেতুর উপরিভাগের কম্পনে খুঁটির গায়ের প্লাস্টার মাঝে মাঝে খসে পড়ছে পানির তলে। তার ওপর খুঁটি ভিত্তির চারপাশে ২০ থেকে ২৫ মিটার মাটি সরে রীতিমতো অলৌকিকভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছে সেতুটি।
পানির নিচে সার্চ লাইটের নিখুঁত পর্যবেক্ষণে বেড়িয়ে আসে আরো কিছু চিত্র। অতিরিক্ত ওজনবাহী ট্রলার চলাচলে প্রপেলারে (নিমজ্জিত ফ্যান) আঘাতপ্রাপ্ত হয় সেতুর খুঁটিগুলো। গত ২১ বছরে আঘাতের কারণে ক্ষতবিক্ষত হয়েছে পানির নিচের খুঁটিগুলো। ৭নং খুঁটির সঙ্গে কিছু মাটি থাকলেও ৮ ও ৯নং খুঁটি একেবারেই ঝুলন্ত অবস্থায় রয়েছে। খুঁটি ভিত্তির নিচে জমানো পাথর নেই বললেই চলে।
১৯৯১ সালে উদ্বোধন-পরবর্তী মাত্র ১৩ বছর না যেতেই ২০০৩ সাল থেকে ব্যাপকভাবে কম্পন অনুভূত হতে থাকে সেতুটির উপরিভাগে। এখন সেতু পাড়ি দিতে সব যাত্রী থাকেন আতঙ্কে। কাঁপুনির বিষয়টি যদিও সবার জানা তবে পানির নিচের এমন ভয়াবহ খবর কেউ জানেন না।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে প্রতিদিন প্রায় ১২ হাজার যাত্রীবাহী গাড়িসহ অন্য যানবাহন চলাচল করে। বিশেষ করে ৪০ থেকে ৫০ টনের ঊর্ধ্বে ভারী যানবাহনের সংখ্যা অনেক। ট্রাক ড্রাইভারদের ভারী যানবাহন চলাচল নিয়ে কথা বলতে গেলে তারাও জানান, এ সেতু যেকোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে। কিন্তু বিকল্প পথ না থাকায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাদের সেতু পার হতে হয়।
৫০ বছরে কোনো ধরনের বড় সংস্কার ছাড়াই ৯০৩ মিটার মেঘনা সেতু সচল থাকবে জানিয়েছিল জাপানের ‘নিক্কন কোই’ কোম্পানি।
১৯৯১ সালে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তরের ২১ বছর পার না হতেই পারাপার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে মেঘনা সেতু। প্রতিবছর সংস্কারের কথা উল্লেখ ছিল সেতু হস্তান্তরের সময়। পরবর্তীতে পানির নিচে তো নয়ই. পানির উপরেও কোনো সংস্কার করেনি সেতু কর্তৃপক্ষ। অথচ সেতু সংস্কারের বরাদ্দকৃত টাকার ব্যয় কোথায় হয়েছিল তারও কোনো হিসাব নেই কর্তৃপক্ষের কাছে।
১০ জুন ২০১২ এমন পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনী দায়িত্ব নেয়। এমন একটি সময়ে দায়িত্ব নিয়ে সেনাবাহিনীও কিছুটা বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছে। সেনাবাহিনীর সদস্যরা সেতুর দু’পাশে ভারী যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণ করছে। সেই সঙ্গে উপরিভাগের কম্পনের মাত্রা পরিমাপ চলছে। পানির নিচে ভয়াবহ ক্ষতিগ্রস্ত খুঁটিগুলোর মেরামত কবে হবে তা কারো জানা নেই।
২০১০ সালের মে-জুন মাসে সড়ক ও জনপথ বিভাগ একটি জরিপ পরিচালনা করে সেতুর ওপরে ও নিচে। সেতুর তলদেশে খুঁটি ক্ষয়ে যাওয়ার খবর তারা জানত। ভয়াবহ এমন খবর জেনেও পুরো দুটি বছর চুপচাপ কাটিয়ে দিয়েছে সেতু কর্তৃপক্ষ। সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী আবুল হোসেন পুরো বিষয়টি একেবারে চেপে গিয়েছিলেন। সেতুর উপরিভাগ মেরামতের কথা বলে একটি থোক বরাদ্দ হলেও সেতুর নিচে ক্ষতিগ্রস্তের কথা আড়ালেই থেকে যায় ।
ওপরের ছবিগুলো ২০১২ সালের জানুয়ারিতে বেসরকারিভাবে পানির ৪০ ফুট নিচে গিয়ে তুলে আনা ছবি। আর সরকারিভাবে ৪০ ফুট নিচে তিনটি খুঁটি ক্ষয়ে যাওয়ার চিত্রের সঙ্গে একেবারে মিলে যায় সড়ক ও জনপথ বিভাগের তোলা ছবিগুলো।
মেঘনার নিচে সড়ক ও জনপথ বিভাগের পরিচালিত জরিপে অংশ নেয় স্কুবা ডাইভার আতিক রহমান। তিনি প্রথম পানির নিচের  সেতুর ভগ্নদশার চিত্র তুলে আনেন। এরপর রিপোর্ট করেন, ‘দ্রুত সেতু মেরামত না করলে যেকোনো সময় বড় একটি দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে।’
জরিপ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান তাদের অনুসন্ধানে আরো জানায়, ‘সেতুর খুঁটির যে দুরবস্থা সেক্ষত্রে তিনটি খুঁটির (৭, ৮ ও ৯) পুরোটি পরিবর্তন করতে হবে।’
সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ সব জেনেশুনে মেরামতে কেন জরুরি উদ্যোগ গ্র্রহণ করেনি, তা অজানা। ২০১৩ সালের জুনে এই প্রতিবেদনের পানির ৪০ ফুট নিচের সেতুর ক্ষতিগ্রস্ত খুঁটির সচিত্র প্রতিবেদন প্রচার হওয়ার পর কর্তৃপক্ষের টনক নড়ে। উদ্যোগ নেয়া হয় সংস্কার কাজ।
গত জুন-জুলাইয়ে মেঘনা নদীতে পানির স্রোতের চাপে খুঁটির নিচে নামতে না পারার অজুহাতে ২০১২ সাল পার হয়ে যায়। সাময়িক মেরামত চলে সেতুর উপরিভাগ। কোনোভাবে জোড়াতালি দিয়ে সেতুর কাঁপুনি বন্ধ হলেও এখনো ঝুলে রয়েছে তলদেশের তিনটি খুঁটি। অন্যদিকে পেশাদার ডুবুরিরা বলেন, স্রোত কোনো বিষয় ছিল না।
প্রকৌশলী ড. আজাদুর রহমান বলেন ভিন্নকথা, ২১ বছর না যেতেই সেতু তো ক্ষতিগ্রস্ত হবে; কারণ সেতু তৈরি হয় ঠিকই কিন্তু সেতু যে প্রায়ই সংস্কার করতে হয় তা সেতু কর্তৃপক্ষ বেমালুম ভুলে যায়। শুধু তাই নয় সেতু তৈরির সময় মাথায় রাথা হয়নি ভূমিকম্প প্রতিরোধক কোনো ব্যবস্থা। তাই এবার সেতু মেরামতের সঙ্গে ভূমিকম্পের কাজটিও করা হবে। বর্তমানে এই প্রকৌশলী মেঘনা সেতুর সংস্কারের পরামর্শক হিসেবে কাজ করছেন।
বর্তমানে তিনটি পিয়ার মেরামতের জন্য যা খরচ হবে, তা দিয়ে এ সেতুর অর্ধেক সমান আরো একটি সেতু নির্মাণ করা সম্ভব। শুধু উপরের নয় সেতুর তলদেশের মেরামত এই শীত মৌসুমে সম্পন্ন করা উচিত বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তারপরও বড় দুর্ঘটনা এড়াতে ও ঢাকা-চট্টগ্রাম যোগাযোগব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে দ্রুত একটি সিদ্ধান্তে আসতে হবে।

জেলা এর অন্যান্য খবরসমূহ
বাংলাদেশ এর অন্যান্য খবরসমূহ
পূর্বের সংবাদ