নয়া দিগন্ত কার্যালয়ে আগুন দিল সরকারী দল

দৈনিক নয়া দিগন্ত কার্যালয়ে হামলা ও অগ্নিসংযোগ করেছে সরকারি দলের নেতা-কর্মীরা ঢাকার মতিঝিল এলাকায়  । গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একটি দল পত্রিকাটির কার্যালয়ের ভেতরে অবস্থান নিয়ে তল্লাশি চালাচ্ছে। এ পর্যন্ত পত্রিকাটির একজন কর্মীকে আটক করে নিয়ে গেছে পুলিশ। খবর পেয়ে সাংবাদিক নেতারা ছুঁটে গেলে পত্রিকা অফিসটিতে ঢুকতে পুলিশ তাদের বাধা দেয়। পত্রিকাটির ভবন ঘিরে রেখেছে দুই শতাধিক পুলিশ। মঙ্গলবার দুপুর পৌনে ২টার দিকে আগুন দেয়ার ঘটনা ঘটে। আগুনে পত্রিকাটির একটি গাড়ি ও ১০ টন কাগজ পুড়ে গেছে। নয়া দিগন্তের কর্মীদের চেষ্টায় গোডাউনের আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে।

দুপুর সোয়া ৩টার দিকে নয়াদিগন্ত কার্যালয় থেকে পত্রিকাটির প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোশাররফ হোসেন আটক করে নিয়ে গেছে ডিবি পুলিশ।

এরপর পত্রিকাটির কার্যালয়ে পৌনে ৪টার দিকে এডিসি মেহেদি হাসানের নেতৃত্বে ২০ জনের একটি ডিবি পুলিশের দল নয়া দিগন্তের প্রতিটি তলায় তল্লাশি শুরু করেছে। একই সঙ্গে দুই শতাধিক পুলিশ নয়াদিগন্ত কার্যালয় ঘিরে রেখেছে।

খবর পেয়ে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি আব্দুশ শহীদ ও সাধারণ সম্পাদক বাকের হোসাইন ছুঁটে গেলে তাদের নয়া দিগন্ত কার্যালয়ে ঢুকতে দেয়নি পুলিশ। তাদের গেইটের বাইরে বসিয়ে রাখা হয়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, দুপুর দেড়টায় নয়াদিগন্ত কার্যালয়ের উল্টো দিকে নটরডেম কলেজের সামনে দলীয় শীর্ষ নেতাদের কারামুক্তির দাবিতে জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্র শিবিরের নেতা-কর্মীরা বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করে।

পুলিশ মুহুর্মুহু গুলিবর্ষণ এবং গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে জামায়াত-শিবির নেতা-কর্মীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়ার চেষ্টা করে। জবাবে বিক্ষোভকারীরা ইটপাটকেল ও ককটেল বিস্ফোরণ ঘটালে উভয়পক্ষে তুমুল সংঘর্ষ শুরু হয়।

এই সংঘর্ষের কিছুক্ষণ পরে মতিঝিলের বিভিন্ন ব্যাংক-বীমায় কর্মরত আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও শ্রমিক লীগ ও মতিঝিল থানা ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা হকিস্টিক, রামদা ও লাঠিসোঠা সজ্জিত একটি মিছিল নিয়ে নটরডেম কার্যালয়ের সামনে আসে।

মিছিল থেকে ২০-২৫ জনের একটি দল প্রধান সড়ক থেকে ইনার সার্কুলার রোডে নয়া দিগন্ত কার্যালেয় সামনে চলে আসে। সেখানে তারা ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগান দিয়ে নয়া দিগন্তের একটি গাড়িতে এবং কার্যালয়ের নিচতলায় অবস্থিত প্রেস ও কাগজের গোডাউনেও আগুন দেয়। এ সময় পুরো নয়া দিগন্ত কার্যালয়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

নয়াদিগন্তের নিরাপত্তাকর্মীরা পত্রিকাটির নিজস্ব ফায়ার সার্ভিস সিস্টেমের মাধ্যমে প্রেস ও গোডাউনের আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।

আগুন দিয়ে সরকারি দলের লোকজন জয়বাংলা স্লোগান দিয়ে চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরে মতিঝিল বিভাগের শতাধিক পুলিশ এসে নয়াদিগন্ত কার্যালয় ঘিরে ফেলে। তারা ইনার সার্কুলার রোডটিও বন্ধ করে দেয়।

নয়া দিগন্তের নির্বাহী সম্পাদক সালাউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর  জানান, ‘দুপুর পৌনে ২টার দিকে আমি তিন তলায় কাজ করছিলাম। নিচতলা থেকে একজন নিরাপত্তারক্ষী দৌঁড়ে এসে জানান ১৫-২০ জনের একটি দল নয়াদিগন্ত কার্যালয়ে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করছে।’

বাবর আরো জানান, ‘দ্রুত নিচে নেমে এসে দেখি প্রেসে ও কাগজের গোডাউনে আগুন জ্বলছে। ভবনের বাইরে একটি গাড়ি জ্বলছে।’

আগুন দেয়ার এই ঘটনায় নয়াদিগন্তের একটি নতুন কেনা নোয়াহ ব্রান্ডের গাড়ি, প্রেস ও ১০ টন কাগজ পুড়ে গেছে বলে নিশ্চিত করেন বাবর।

নয়া দিগন্তের ওপর এই হামলা গোটা সংবাদমাধ্যমের ওপর হামলা জানিয়ে বাবর বলেন, স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের শত্রুরাই নয়াদিগন্তের ওপর হামলা চালিয়েছে।

প্রসঙ্গত, গত পাঁচ নভেম্বর জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লাকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। সরকার সমর্থকরা ট্রাইব্যুনালের এই রায় প্রত্যাখ্যান করে মোল্লা ফাঁসির দাবিতে শাহবাগে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করে।

টানান বিক্ষোভের চতুর্থী দিনে গত শুক্রবার শাহবাগে সরকারদলীয় ছাত্র নেতা, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষাবিদ, সংস্কৃতিকর্মী ও সুশীল সমাজের সদস্যরা দৈনিক নয়াদিগন্ত ও দৈনিক আমার দেশসহ ভিন্নমতের গণমাধ্যম, চিকিত্সা ও শিক্ষাসেবা প্রতিষ্ঠান নিষিদ্ধ করার দাবি জানায়।

তারা সমাবেশস্থলে উপস্থিত ভিন্নমতের সাংবাদিকদেরও দায়িত্ব পালনে বাধা দেন। এরপর গত শনি, রবি ও সোমবার নয়াদিগন্ত, আমার দেশ ও দিগন্ত টেলিভিশনের ওপর সারা দেশেই আক্রমণ শুরু করে। এই ধারাবাহিকতায় মঙ্গলবার নয়াদিগন্ত কার্যালয়ে সরকার সমর্থকরা আগুন দেয় ও পত্রিকাটির কর্মীদের আটক করল।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।