ত্বকীর বাবা রফিউর রাব্বিকে পুলিশের সমানেই গুলি করে হত্যার চেষ্টা

সম্প্রতি খুন হওয়া মেধাবী স্কুলছাত্র তানভীর মুহাম্মদ ত্বকীর বাবা রফিউর রাব্বিকে পুলিশের সমানেই গুলি করে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। এ সময় পুলিশ, সাংস্কৃতিককর্মী ও পারভেজের অনুসারীদের মধ্যে ত্রিমুখী সংঘর্ষে অর্ধশতাধিক লোক আহত হয়েছে। এ ঘটনায় একজন গুলিবিদ্ধ এবং আট পুলিশ সদস্য আহত হয়। আহতদের স্থানীয় বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হয়।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, রবিবার বিকেলে শহরের চাষাঢ়া শহীদ মিনারে সাংস্কৃতিক জোটের একটি প্রতিবাদ সভায় ত্বকী হত্যাকাণ্ডের ৩নং অভিযুক্ত যুবলীগ ক্যাডার জেলা যুবলীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক জহিরুল ইসলাম পারভেজ ওরফে ক্যাঙ্গারু পারভেজ তার ৩/৪ সহযোগীকে নিয়ে এ হত্যা চেষ্টা চালায়। তবে পারভেজ রফিউর রাব্বিকে গুলি করার আগেই সাংস্কৃতিক জোটের নেতাকর্মী এবং শহীদ মিনারে অবস্থানরত সাধারণ মানুষ পারভেজকে পিস্তলসহ আটক করে গণপিটুনি দেয়।

পরে পুলিশ পারভেজকে অস্ত্রসহ উদ্ধার করে নিয়ে গিয়ে তার পক্ষ হয়ে শহীদ মিনারের ভেতরে ঢুকে সদর মডেল থানার ওসি এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) আশরাফুজ্জামানের সামনেই সাংস্কৃতিক জোটের নেতাকর্মীদের ওপর নির্বিচার গুলিবর্ষণ ও লাঠিচার্জ করে।

এ সময় পারভেজের অনুসারীরা সাংস্কৃতিক জোটের নেতাকর্মীদের দিকে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করলে ত্রিমুখী সংঘর্ষ হয়।

পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে অর্ধশত রাউন্ড শটগানের গুলি ছোঁড়ে। সংঘর্ষে সাংস্কৃতিক জোটের একজন গুলিবিদ্ধ, সাংবাদিক ও আট পুলিশসহ অর্ধশতাধিক আহত হয়। আহতদের নারায়ণগঞ্জ ২০০ শয্যা হাসপাতালসহ বিভিন্ন স্থানে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।

ঘটনার পর ত্বকীর বাবা রফিউর রাব্বি সাংস্কৃতিক জোটের নেতাকর্মীদের নিয়ে প্রেসক্লাবে তাৎক্ষণিক সংবাদ সম্মেলন করে ঘটনা তুলে ধরেন।

কিন্তু পুলিশ পারভেজের কাছে কোনো অস্ত্র পায়নি বলে সাংবাদিকদের জানালেও ঘটনার একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছে, পুলিশ অস্ত্রসহই পারভেজকে উদ্ধার করে নিয়ে যায়।

ঘটনার খবর পেয়ে পুলিশ সুপার সৈয়দ নূরুল ইসলামসহ ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে আসে।

ক্যাঙ্গারু পারভেজের বিরুদ্ধে ঘটনার ২৪ ঘণ্টা আগে শনিবার সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক জোটের এক কর্মীকে অপহরণ চেষ্টার অভিযোগে সংগঠনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক যৌথভাবে নারায়ণগঞ্জ সদর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করে।

প্রেসক্লাবে রফিউর রাব্বি সাংবাদিকদের বলেন, শুক্রবার রাতে অজ্ঞাত ব্যক্তিদের হাতে সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি অ্যাডভোকেট প্রদীপ ঘোষ বাবুর চেম্বার তছনছ এবং একই দিন সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক কর্মী শুভ্রদেবকে ক্যাঙ্গারু পারভেজ কর্তৃক অপহরণ চেষ্টার ঘটনায় আট বিকেলে সাংস্কৃতিক জোট শহীদ মিনারে প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করে।

প্রতিবাদ সমাবেশে গণসংহতি আন্দোলনের সমন্বয়ক তরিকুল সুজন বক্তব্য দেয়ার সময় ক্যাঙ্গারু পারভেজ তার সহযোগীদের নিয়ে শহীদ মিনারে এসে বলতে থাকে, দেখ ক্যাঙ্গারু পারভেজ এসেছে, পারলে কিছু কর।

ওই সময় জেলা কৃষক লীগের সভাপতি রোকন উদ্দিন শহীদ মিনারের বেদী থেকে নেমে এসে পারভেজকে সেখান থেকে চলে যেতে বলেন। তখন পারভেজ রোকন উদ্দিনের সঙ্গে তর্কে লিপ্ত হয় এবং এক পর্যায়ে প্যান্টের পকেট থেকে পিস্তল বের করে শহীদ মিনারের বেদীতে থাকা রফিউর রাব্বি দিকে তাক করে।

এ সময় শহীদ মিনারের পশ্চিম পাশের কোনায় এসআই কালাম এবং এএসআই শহীদুলসহ বেশ কয়েকজন কনস্টেবল কর্তব্যরত ছিলেন। কিন্তু পারভেজের কর্মকাণ্ডের সময় পুলিশ নিরব ছিল।

পারভেজ পিস্তল বের করলে ওই সময় সাংস্কৃতিক জোটের নেতাকর্মী এবং সমাবেশে উপস্থিত সাধারণ জনগণ পারভেজকে ধরে ফেলে এবং গণপিটুনি দেয়। তখন পুলিশ দ্রুত এসে পারভেজকে উদ্ধার করে অস্ত্রসহ আটক করে নিয়ে যায়।

এ সময় পুলিশ তাকে লাঠিপেটা করে শহীদ মিনার থেকে বাইরে নিয়ে আসে। পারভেজকে নিয়ে বের হওয়ার পর পারভেজ জনতাকে লক্ষ্য করে গুলি করার ভঙ্গী করে। রাস্তার ওপরে নেচে বোঝানোর চেষ্টা করে পুলিশ তার সাথেই আছে।

সাংস্কৃতিক জোটের নেতাকর্মীদের অভিযোগ অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আশরাফুজ্জামান ও সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মঞ্জুর কাদেরের নেতৃত্বে অপর একটি দল শহীদ মিনারের ভেতরে প্রবেশ করে নির্বিচারে সাংস্কৃতিক জোটের নেতাকর্মীদের গুলিবর্ষণ এবং লাঠিচার্জ শুরু করে।  পুলিশের গুলি এবং লাঠিচার্জে সাংস্কৃতিক জোটের নেতা কর্মীরা হতভম্ব হয়ে পড়ে।

একপর্যায়ে গুলিবর্ষণ এবং লাঠিচার্জে জেলা সিপিবির সাবেক সভাপতি দুলাল সাহা, যুগ্ম সম্পাদক রবীন্দ্র দাস, সাংস্কৃতিক সংগঠন সমগীতের অমল আকাশ, গণসংগতি আন্দোলনের সমন্বয়ক তরিকুল সুজন ও অঞ্জন দাস, সাংস্কৃতিক জোটের সহ-সভাপতি ফাহমিদা আজাদ, সাংস্কৃতিক কর্মী শ্যামল দাস, স্থানীয় একটি অনলাইন পত্রিকার সাংবাদিক বিশ্বজিৎ দাসসহ অর্ধশতাধিক আহত হন। আহতদের মধ্যে বেশ কয়েকজন নারী সাংস্কৃতিক কর্মীও রয়েছেন।

এদিকে, ক্যাঙ্গারু পারভেজকে অস্ত্রসহ আটককারী এসআই কালাম সাংবাদিকদের বলেন, তাকে আটকের সময় তার কাছ থেকে কোনো অস্ত্র উদ্ধার হয়নি।

সদর মডেল থানার ওসি মঞ্জুর কাদের জানান, পারভেজকে উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়ার সময় পেছন থেকে কেউ কেউ ইটপাটকেল নিক্ষেপ করায় বেশ কয়েকজন পুলিশ আহত হয়। আহতদের মধ্যে একজন গুলিবিদ্ধ বলেও তিনি দাবি করেন। পুলিশ আত্মরক্ষার্থে ৪৬ রাউন্ড শটগানের গুলি ছোঁড়ে।

তিনি বলেন, ‘পারভেজের কাছ থেকে আমরা কোনো অস্ত্র পাইনি। পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় সাংস্কৃতিক কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা হবে বলে তিনি জানান।

পুলিশ সুপার সৈয়দ নূরুল ইসলাম বলেন, পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে পারভেজ নামে একজনকে গ্রেপ্তার করেছে। পরিস্থিতি এখন স্বাভাবিক রয়েছে। তবে শহীদ মিনারে কী ঘটেছিল তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।