জেল থেকে বের হলে কাউকে ছাড়বো না: পুলিশকে রানার হুমকি

রিমান্ডের আসামি রানা প্লাজার মালিক সোহেল রানা পুলিশ সদস্যদেরকেও হুমকি দিচ্ছেন। বলছেন, একদিন না একদিন জেল থেকে বের হবো। সেদিন কাউকে ছাড়বো না। যাদের কারণে মায়ের লাশ দেখতে পারলাম না তাদেরকে দেখে নেবো। পুলিশের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা এ তথ্য জানিয়ে বলেন, রানা বলেছে- পলাতক থাকা অবস্থায় মা মারা গেছেন। তাকে দেখতে যাওয়ার ইচ্ছা ছিল। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের ভয়ে যেতে পারিনি। আদালত চত্বরে দাঁড়িয়েও গতকাল সে এসব কথা উচ্চারণ করেছে বলে দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যরা জানিয়েছেন। আদালত রানা এবং আটক পাঁচ গার্মেন্ট মালিকের মূল স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তরের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারির নির্দেশ দিয়েছেন। ওদিকে ১৫ দিনের রিমান্ডের দ্বিতীয় দিনে পুলিশকে রানা অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। পুলিশ জানায়, জিজ্ঞাসাবাদে রানা জানায়, এক বন্ধুকে পৌরসভার চিফ ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়ে গার্মেন্ট মালিকদের সামনে তার মতামত নেয়া হয়। আর প্রকৌশলীবেশী ওই বন্ধুর কারণেই ঘটে ইতিহাসের নৃশংসতম ট্র্যাজেডি। পুলিশ জানায়, রানার বিষয়ে গার্মেন্ট মালিকদের কাছ থেকে অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। আজ-কালের মধ্যে রানা ও গার্মেন্ট মালিকদের মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। সূত্র জানায়, কেবল রানা প্লাজার গার্মেন্ট কারখানাগুলোই নয়- সাভারের অন্য গার্মেন্ট কারখানাগুলোর ওপরও নিয়ন্ত্রণ ছিল রানার। জোর করে টাকা না দিয়েই কারখানার ঝুট নিয়ে যেতেন। নানা ধরনের হয়রানি করতেন কারখানা মালিকদের। নাম মাত্র মূল্য দিয়ে কাটা কাপড় নিয়ে যেতেন। ১ লাখ টাকার কাপড়ের দাম দিতেন ২০ হাজার টাকা। ঈদ, পূজাসহ বিভিন্ন উৎসবে বিনামূল্যে  তৈরী পোশাক নিয়ে যেতেন। হঠাৎ ফোন করেই বলতেন- আমার ১০০ পিস টি-শার্ট বা ১৫শ’ পিস গেঞ্জি লাগবে। তার ভয়ে পোশাক শিল্পের মালিকরা তটস্থ থাকতেন। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে রানা স্বীকার করেন- ভবনে ফাটল দেখা দেয়ার পর রাজ্জাক নামের এক বন্ধুকে ভবনে ডেকে আনি। তারপর রাজ্জাককে গার্মেন্ট মালিকদের সঙ্গে পৌরসভার চিফ ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিই। রাজ্জাক আমার শিখিয়ে দেয়া কথাগুলো গার্মেন্ট মালিকদের বলে। গার্মেন্ট মালিকদের রাজ্জাক জানায়, আমি ভালভাবে ভবনটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছি। কেবল পিলারে সামান্য ফাটল ধরেছে। দেয়ালে আংশিক প্লাস্টার খুলে গেছে। রাজমিস্ত্রি দিয়ে আস্তর করিয়ে নিলে ১০০ বছরে ভবনের কিছু হবে না। রাজ্জাকের ওই আশ্বাসেই গার্মেন্ট মালিকরা কর্মীদেরকে কাজ করাতে বাধ্য করেন। পুলিশের ঢাকা জেলার অতিরিক্ত সুপার বলেন, গার্মেন্ট মালিক ও রানার বক্তব্যের মধ্যে বেশ কিছু বিষয়ে পরস্পর বিরোধিতা পাওয়া যাচ্ছে। এসব বিষয় যাচাই করতেই তাদের মুখোমুখি করা হচ্ছে। আশা করছি, শিগগিরই অনেক বিষয় পরিষ্কার হওয়া যাবে। এদিকে রানাকে ফরিদপুরে আশ্রয় দেয়া এবং পালিয়ে যেতে সহায়তার অভিযোগে আবুল হাসান (৪৩) নামের একজনকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। র‌্যাব ১-এর সদস্যরা গতকাল সকাল ১১টার দিকে মালিবাগের একটি বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে বলে জানা গেছে। অন্যদিকে রানার পিতা আবদুল খালেককে ১৩ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। সোমবার দুপুরে মগবাজার এলাকা থেকে গ্রেপ্তারের পর গতকাল তাকে আদালতে হাজির করে ২ মামলায় ২০ দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়। শুনানি শেষে আদালত তাকে এক মামলায় ৭ দিন এবং অন্য মামলায় ৬ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে। আদালতে তার পক্ষে কোন আইনজীবী না লড়ায় খালেক নিজেই কথা বলেন। এর আগে গত কয়েকদিনে ভবন ধসের ঘটনায় রানা ছাড়াও গার্মেন্ট মালিক, পৌরসভার প্রকৌশলী, রানার পিতা এবং রানার সহকারীসহ বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা। এদের বেশির ভাগই বিভিন্ন মেয়াদে রিমান্ডে আছেন। মহানগর গোয়েন্দা কার্যালয়ে জেলা ডিবি পুলিশের হেফাজতে রিমান্ড চলছে।
ওদের সম্পত্তি হস্তান্তরে নিষেধাজ্ঞা
সাভারের ধসে পড়া রানা প্লাজার মালিক সোহেল রানা এবং পাঁচ গার্মেন্ট মালিকের সকল স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তরের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারির নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। ঢাকার ডিসি, এসপি ও জেলা রেজিস্ট্রারকে এ আদেশ কার্যকর করতে বলা হয়েছে। তাদের সম্পদ যাতে অন্য কোন নামে হস্তান্তর হতে না পারে সেজন্য দেশের সকল সাব-রেজিস্ট্রারের প্রতি সার্কুলার জারি করতে নিবন্ধন পরিদপ্তরের মহাপরিদর্শককে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ওই পাঁচ জনের ব্যাংক হিসাব থেকে কোন অর্থ অন্যত্র যেন স্থানান্তর না হয় সেজন্য সকল বাণিজ্যিক ব্যাংকের প্রতি সার্কুলার জারি করতে বাংলাদেশ ব্যাংককে নির্দেশ দিয়েছে আদালত। তবে বিজিএমইএ’র তত্ত্বাবধানে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা দেয়ার জন্য অর্থ তোলা যাবে। আদালতের এ আদেশের বিষয়ে এক সপ্তাহের মধ্যে একটি প্রতিবেদন দাখিল করতে আইজেআরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার ও বিচারপতি মুহাম্মদ খুরশীদ আলম সরকারের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ গতকাল এসব আদেশ দেয়। এছাড়া সারা দেশে যেসব গার্মেন্ট কারখানা ঝুঁকিপূর্ণ তা অবিলম্বে বন্ধ করতে শ্রম মন্ত্রণালয়ের প্রধান কারখানা পরিদর্শককে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এদিকে শুনানিতে নিহত প্রত্যেকের পরিবারকে এক কোটি টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেয়ার জন্য প্রস্তাব করেছেন এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। তিনি বলেছেন, ভবন মালিক ও গার্মেন্ট মালিকদের কাছ থেকে ছয় শ’ কোটি টাকা আদায় করে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এর মধ্যে ভবন মালিক দেবে তিন শ’ কোটি টাকা ও গার্মেন্ট মালিকরা দেবে বাকি তিন শ’ কোটি টাকা। এটা আমার ব্যক্তিগত মত। তবে আদালত ওই ঘটনায় সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। আদালত এটর্নি জেনারেলকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আপনার ব্যক্তিগত মতকে সাধুবাদ জানাই। এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে সরকারের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ। সরকার এখানে কি করেছে সেটাই প্রশ্ন। হাইকোর্টের গত ২৫শে এপ্রিলের আদেশে গতকাল সকাল ১০টা ২৫ মিনিটে রানা প্লাজার মালিক সাভার থানা যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক সোহেল রানা এবং পাঁচটি গার্মেন্ট-এর ৪ মালিক বজলুস সামাদ আদনান, মাহমুদুর রহমান তাপস, আনিসুর রহমান ওরফে আনিসুজ্জামান এবং আমিনুল ইসলামকে সংশ্লিষ্ট আদালত কক্ষে হাজির করা হয় কড়া পুলিশ প্রহরায়। এছাড়াও সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কবির হোসেন সরকার, সাভার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, হাবিবুল ইসলাম (প্রধান পরিদর্শক, কারখানা ও শিল্প প্রতিষ্ঠান পরিদপ্তর)সহ সংশ্লিষ্টরা আদালতে হাজির হন। এরপর বিষয়ে আদালতের দেয়া স্বতঃপ্রণোদিত রুলের ওপর শুনানি করেন এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, হাবিবুল ইসলাম ভূঁইয়া, কেএম সাইফুদ্দিন, ব্যারিস্টার সারা হোসেন, ড. ইউনুস আলী আকন্দ, ব্যারিস্টার হাসান এমএস আজিম, ডেপুটি এটর্নি জেনারেল আলামীন সরকার, মোহাম্মদ হোসেন লিপু প্রমুখ। পরে আদালত আদেশ দেয়।
আদালতের আদেশে ক্ষতিগ্রস্তদের কাকে কি পরিমাণ ক্ষতিপুরণ দেয়া হবে তা গুরুত্ব বিবেচনা করে নির্ধারণ করার জন্য নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি, ঢাকা জেলার ডিসি, এসপি, বিজিএমইএ, ৫ গার্মেন্টের প্রতিনিধি, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, গৃহায়ন ও গণপূর্ত, শ্রম মন্ত্রণালয়, বুয়েট-এর একজন করে প্রতিনিধি এবং মেডিসিন, মনোবিদ, অর্থনীতিবিদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এ কমিটিকে ক্ষতিগ্রস্তদের একটি তালিকাও জমা দিতে বলা হয়েছে। এ কমিটিকে আদেশ পাওয়ার পর এক মাসের মধ্যে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে। এছাড়া জীবন রক্ষায় সরকার কি কি পদক্ষেপ নিয়েছে তা সরকারের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ওই ঘটনায় রাজউক, বিজিএমইএ ও শিল্প কলকারখানা পরিদর্শকের নেয়া পদক্ষেপের কথা জানাতে বলা হয়েছে। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) আওতায় কত ভবন আছে তার তালিকা পর্যায়ক্রমে আদালতে দাখিল করতে রাজউককে নির্দেশ দিয়েছে আদালত। প্রথম পর্যায়ে গার্মেন্ট ফ্যাক্টরির তালিকা দিতে বলা হয়েছে। দেশের সকল গার্মেন্ট ফ্যাক্টরিতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা, ভবন ব্যবহারযোগ্য কিনা, অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থা আছে কিনা, স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ আছে কিনা তার তালিকাসহ সে বিষয়ে প্রতিবেদন দিতে বিজিএমইএ’কে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। রানা প্লাজায় অবস্থিত ব্র্যাক ব্যাংকের ম্যানেজার ভবন ধসের আগের দিন কি পদক্ষেপ নিয়েছিলেন তা লিখিতভাবে আদালতে দাখিল করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। দুই সপ্তাহের মধ্যে এ প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। এসব আদেশের পাশাপাশি সাভার উপজেলা ইউএনও কবির হোসেনের বক্তব্য নিয়ে ‘ডেকে এনে শত শত প্রাণ হত্যা’- শিরোনামে ২৫শে এপ্রিল প্রকাশিত প্রতিবেদনের বিষয়ে প্রথম আলোর সম্পাদক, প্রকাশক ও তিন প্রতিবেদককে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে। গতকাল শুনানিতে এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, রানা প্লাজায় ধসের ঘটনায় মূল অপরাধী ও গার্মেন্ট মালিকরা গ্রেপ্তার হয়েছে। এ ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে জনপ্রতি এক কোটি টাকা করে। এজন্য ক্ষতিগ্রস্তদের পরিবারকে ৬শ’ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দেয়ার জন্য প্রস্তাব করছি। এই অর্থের অর্ধেক ভবন মালিক এবং বাকি অর্ধেক গার্মেন্ট মালিকদের কাছ থেকে আদায় করতে হবে। এজন্য সময় দরকার। এ প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে তাদের সম্পত্তি বিক্রি করে ক্ষতিপূরণ দেয়ার নির্দেশ দিতে পারেন আদালত। হাইকোর্ট বলেন, তাজরীনের ঘটনায় রুল দিয়েছি ছয় মাস আগে। এখনও রুলের জবাব পাইনি। জবাবে মাহবুবে আলম বলেন, এটা দুঃখজনক। তিনি বলেন, সড়ক দুর্ঘটনায় ১০ লাখ টাকা দেয়ার নজির আছে। এটা এক বছর দুই বছর সময় লাগতে পারে। আদালত এটা চলমান রাখতে পারে। আমি খোলা মনে বলছি, কোন মন্ত্রী বা অফিসারের সঙ্গে কথা হয়নি। পরে আদেশের সময় আদালত বলেন, এটর্নি জেনারেল তার বক্তেব্যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এটা তার মূল্যবান ও গুরুত্বপূর্ণ সাজেশান্স। সূত্র:- মানব জমিন


সম্পাদনা: শামীম ইবনে মাজহার,নিউজরুম এডিটর

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।