বিভ্রান্ত না হয়ে কর্মসূচি সফল করতে হবে:আল্লামা আহমদ শফী

হেফাজতে ইসলামের প্রধান আল্লামা আহমদ শফী বলেছেন, ৫ মে অবরোধ হবেই। বিভ্রান্ত না হয়ে  কর্মসূচি সফল করতে সংগঠনের নেতাকর্মীরদের আহ্বান জানান তিনি। প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনের পর শুক্রবার রাতে এক বিবৃতিতে তিনি এ আহ্বান জানান।

হেফাজতের অবরোধ কর্মসূচি স্থগিত করতে আহ্বান জানিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী।

শফী বলেন, “প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফা দাবি সম্পর্কে গ্রহণযোগ্য কোনো মত ও দিক-নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। বরং বিভিন্ন বিষয়ে তার বক্তব্যে স্ববিরোধী ভুল ব্যাখ্যা ও পাশ কাটিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে জাতিকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টাই ছিল বিশেষভাবে লক্ষ্যনীয়। সে কারণেই আমরা আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে হেফাজতে ইসলাম ঘোষিত ৫ মে ঢাকা অবরোধ কর্মসূচি যথারীতি বহাল রাখার প্রত্যয় ঘোষণা করছি। আমরা ধর্মপ্রাণ দেশপ্রেমিক মানুষকে কোনো রকম বিভ্রান্তির শিকার না হয়ে পূর্ণ উদ্যম ও প্রস্তুতি নিয়ে ঢাকা অবরোধ কর্মসূচিতে অংশ নেয়ার আহবান জানাচ্ছি।”

তিনি বলেন, “আমরা সাভারের মর্মান্তিক ঘটনায় উদ্ধার কাজ ও অসহায়দের পাশে দাঁড়ানোর ব্যাপারে সর্বাত্মক অংশগ্রহণ করেছি। মানবিক বিবেচনায় আমাদের এই তৎপরতা সবসময় অব্যাহত থাকবে। সুতরাং সাভার ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত লাশবাহী গাড়ি, অ্যাম্বুলেন্স, উদ্ধার তৎপরতায় নিয়োজিত সর্বপ্রকার যানবাহন, দেশী বিদেশী পরিদর্শকদের গাড়িসহ এ জাতীয় সবরকম যানবাহন অবরোধের আওতামুক্ত থাকবে।”

আল্লামা শফী বলেন, “প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে ঢাকা অবরোধ কর্মসূচি স্থগিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি সাভার ট্রাজেডি সংশ্লিষ্ট মানবিক বিবেচনাসহ হেফাজতে ইসলাম ঘোষিত ১৩ দফার বিষয়ে কিছু ব্যাখ্যা ও বক্তব্য তুলে ধরেছেন। এ ব্যাপারে আমাদের বক্তব্য পরিস্কার। তার বক্তব্যে ১৩ দফা মেনে নেয়ার কোনো রকম সিদ্ধান্ত ও নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি। বরং এসব দাবির বিষয়ে কিছু বিভ্রান্তিকর কথাই উঠে এসেছে। এতে ঢাকা অবরোধ কর্মসূচি স্থগিতের মতো কোনো রকম উপাদান নেই বলেই প্রতীয়মান হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে স্ব-বিরোধিতার বহু নজির ফুটে উঠেছে।”

তিনি বলেন, “সরকারের পক্ষ থেকে বারবার ‘সংবিধানবিরোধী’ ও ‘সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য’ বলার পরও তিনি বিভিন্ন দফার পয়েন্ট উল্লেখ করে সেসব দফার পক্ষে প্রচলিত আইনে কী কী ধারা-উপধারা রয়েছে তাও উল্লেখ করেছেন। একই সঙ্গে ভুল ও অসত্য ব্যাখ্যার আশ্রয় নিয়ে দফাগুলোর অযৌক্তিকতা তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন।”
তিনি অভিযোগ করেন, প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে সংবিধানে ‘আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ পুণঃস্থাপনের বিষয়টি পাশ কাটিয়ে ‘রাষ্ট্র ধর্ম’ ও ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ উল্লেখ থাকার কথা বললেও ওই মৌলিক গুরুত্বপূর্ণ বাক্যটি পুনঃস্থাপন নিয়ে কোনো প্রতিশ্র“তি ব্যক্ত করেননি। বরং ওই ঈমানি বাক্যটি পুনঃস্থাপনের বিষয়ে তার অনীহা ও অনিচ্ছার কথাই তুলে ধরেছেন।

আল্লামা শফী বলেন, “মনে রাখা দরকার,, ‘রাষ্ট্রধর্ম’ ও ‘বিসমিল্লাহর’ সম্পর্ক আমলের সঙ্গে। আর ‘আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাস’-এর সম্পর্ক বিশ্বাস ও আক্বীদার সঙ্গে। ওই বিশ্বাস ও আস্থা বাদ দিলে মুমিনের কোনো আমলেরই কোনো গ্রহণযোগ্যতা থাকে না। ইসলাম অবমাননা ও কটূক্তি বিষয়ে প্রচলিত ‘ধর্ম অবমাননা আইন’ ‘স্পেশাল পাওয়ার এক্ট’ এবং ‘তথ্য প্রযুক্তি আইনের’ ধারায় বর্ণিত শাস্তির কথা তুলে ধরলেও সর্বোচ্চ শাস্তির আইন প্রণয়ন বিষয়ে কোনো কথা বলেননি। তিনি এজন্য তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে কমিটি করার আশ্বাসবাণী শোনালেও সেই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীর বক্তব্যে ‘৪২ বছরে ইসলাম অবমাননার কোন ঘটনাই ঘটেনি’ এ জাতীয় বক্তব্য বারবার গণমাধ্যমে আসছে। এ জাতীয় উদ্যোগের বাস্তবতা নিয়ে কোনোভাবেই সন্দেহমুক্ত থাকা যায় না।”

তিনি বলেন, “একই সঙ্গে এরই মধ্যে গ্রেফতারকৃত চারজন ইসলাম বিদ্বেষী ব্লগারের বিরুদ্ধেও বিদ্যমান আইনে কঠোর কোনো ধারায় মামলা করা হয়নি এবং তাদের দৃষ্টিকটূ আদর-আপ্যায়ন রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে আলেম উলামা, ইমাম, খতিব ও মাদরাসার ছাত্রদের হয়রানি, হুমকির বিষয়টির সম্পর্কে অজ্ঞতা প্রকাশ করা হলেও বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। আন্দোলনরত প্রায় ১০ জন আলেমকে হত্যা করা হয়েছে। বহু আলেম খতিবকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে, বহু মাদরাসা বাধ্যতামূলক বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ঢাকাসহ দেশজুড়ে আলেম ও আন্দোলনরত ধর্মপ্রাণ মানুষকে হয়রানি করা হয়েছে এবং এখনো করা হচ্ছে। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দায়েরের ভিত্তিতে ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দিলেও সত্য এটাই যে, এসবের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসনের পাশাপাশি সরকার দলীয় এমপি, নেতা ও সংগঠনভুক্ত কর্মীরাই ঘটনাগুলো ঘটিয়ে চলেছে।”

তিনি বলেন, “তিনি ভাস্কর্য ও মূর্তির মাঝে ব্যবধা তৈরি করে যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন, তার সঙ্গে ইসলামের অবস্থান ও নীতির কোনো সম্পর্ক নেই। তাই এটা একটি বিভ্রান্তকর বক্তব্য। তিনি কোনো কোনো আরব দেশের উদাহরণ টেনে বলেছেন, ইসলাম ভাস্কর্যকে উৎকর্ষ দান করেছে।  এটাও ইসলামের শিল্পনীতি সম্পর্কে একটি ভুল ব্যাখ্যা।”

আল্লামা শফী বলেন, “তিনি নারীনীতি, নারী-অধিকার, অশ্লীলতা, ব্যভিচার ইত্যাদি বিষয়ে ইসলামী অনুশাসনের ব্যাপক প্রশংসা করেছেন। আবার নারীনীতির ইসলামের সঙ্গে সংঘর্ষিক ধারার বিষয়ে সম্পূর্ণ পাশ কাটিয়ে গেছেন। হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের ১৩ দফার কোনো একটি দাবিও মানা হয়নি এবং মানার কোনো প্রতিশ্র“তিও ব্যাক্ত করেননি। অতএব হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের অবরোধ ও আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।”

এ বিষয়ে শনিবার সকাল ১১টায় সংবাদসম্মেলনে হেফাজতের অবস্থান তুলে ধরা হবে বলে জানান আল্লামা শফী।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।