হেফাজতে ইসলামের সমাবেশকে কেন্দ্র করে ‘গণহত্যার’ আন্তর্জাতিক তদন্ত দাবি বিএনপির

শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশকে কেন্দ্র করে রোববার রাতের ঘটনায় নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবি জানিয়েছে বিএনপি। মঙ্গলবার রাতে দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যরা এক বিবৃতিতে এ দাবি জানান। পাশাপাশি দল-মতনির্বিশেষে বাংলাদেশের জনগণকে এই ঘটনার প্রতিবাদ ও ন্যায়বিচার দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে সোচ্চার হওয়ারও আহ্বান জানান তারা।

বিবৃতিতে বলা হয়, ‘শেখ হাসিনার সরকার গত ৫ মে রবিবার মধ্যরাতের পর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতের শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারী লাখ লাখ নিরস্ত্র জনসাধারণের ওপর ভয়াবহতম যে পৈশাচিক হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে, তাতে দেশবাসী ও সচেতন বিশ্ববিবেকের সঙ্গে আমরাও স্তম্ভিভ এবং গভীরভাবে বেদনাহত।’

‘নিজের দেশের মানুষের ওপর কোনো সভ্য সরকার এমন জঘণ্য বর্বর হত্যাযজ্ঞ চালাতে পারে, তা আমাদের কাছে কল্পনাতীত। এই নৃশংস মারণযজ্ঞের প্রতিবাদ জানাবার ও শোক প্রকাশের ভাষা আমাদের নেই’ জানায় বিএনপি।

বিবৃতিতে বলা হয়, ‘আমরা জেনে স্তম্ভিত হয়েছি, মধ্যরাতের এই নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে আধাসামরিক বাহিনীকে রণসজ্জায় সজ্জিত করে অভিযানে নামানো হয়। আর্মার্ড পারসোনেল ক্যারিয়ার (এপিসি) সহ যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহৃত ভয়ঙ্কর সব মারণাস্ত্র ও সাজ-সরঞ্জাম নিরস্ত্র জনগণের সমাবেশ ভাঙতে ব্যবহার করা হয়।’

‘অথচ দেশবাসী জানেন, বিডিআর বিদ্রোহের সময় পিলখানায় আটক সেনা কর্মকর্তা ও তাদের পরিবারের সদস্যদের রক্ষার জন্য শতমুখী করুণ ফরিয়াদ সত্ত্বেও এই সরকার এ ধরনের কোনো অভিযান পরিচালনার অনুমতি দেয়নি’ অভিযোগ বিএনপির।

বিরোধী দল অভিযোগ করে, সরকারি দলের সশস্ত্র লোকজন হেফাজতের সমাবেশে যোগ দিতে আসা নিরস্ত্র কর্মী সমর্থকদের শান্তিপূর্ণ মিছিলে সশস্ত্র হামলা চালায়। উদ্যত আগ্নেয়াস্ত্র হাতে তাদের হামলার চিত্র বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে ইতোমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে।

‘সরকারি দলের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা পল্টন মোড় ও বায়তুল মোকাররম এলাকায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, দোকান-পাট, বাণিজ্য কেন্দ্র, ফুটপাথের বইয়ের দোকান ও যানবাহনে বেপরোয়া হামলা, ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট চালায়। তারা বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ এমনকি পবিত্র কোরআন শরিফেও অগ্নিসংযোগ করে’ অভিযোগ বিএনপির।

দলটির দাবি, বিভিন্ন বেসরকারি টিভি চ্যানেলে সরাসরি সম্প্রচারিত ভিডিও ফুটেজে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনের পদ-পদবীধারী বেশ কয়েকজনকে এসব সন্ত্রাসী তৎপরতায় নেতৃত্ব দিতে দেখা গেছে।

বিবৃতিতে বলা হয়, সরকার হেফাজত নেতাকর্মীদের নিশ্চিহ্ন করার পরিকল্পনার বাস্তবায়ন ঘটায়। এই লক্ষ্যে সন্ধ্যা থেকেই পুরো এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দিয়ে দলীয় সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের আশপাশে জড়ো করা হয়।

‘মধ্যরাতের পর শাপলা চত্বর ও আশেপাশে অবস্থানরত হেফাজতের নেতাকর্মীরা যখন ঘুমে এবং কেউ কেউ জিকির আসকারে নিমগ্ন সেই সময় তাদের ওপর নেমে আসে পৈশাচিক হত্যাযজ্ঞ’ এতে যোগ করা হয়।

বিএনপির দাবি, ঘুমন্ত ও ইবাদতরত মানুষগুলোকেই মধ্যরাতের পর বেপরোয়া গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এই গণহত্যায় আইন-শৃঙ্খলা ও আধা সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সরকারি দলের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরাও সরাসরি অংশ নিয়েছে।

‘১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালো রাতে ঘুমন্ত মানুষের ওপর যে পৈশাচিক গণহত্যা এই অঞ্চলে পাকিস্তানের মৃত্যু ঘটিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়কে অনিবার্য করে তুলেছিল ৫ মে কালো রাতের গণহত্যা কেবল তার সঙ্গেই তুলনীয়’ বলে বিএনপি।

বিরোধী দলের দাবি, ‘এই বর্বরতা উপনিবেশিক ভারতের কুখ্যাত জালিয়ানওয়ালা বাগের হত্যাকাণ্ডকেও হার মানিয়েছে। মানবতার ইতিহাসে ক্ষমাহীন এই জঘণ্য হত্যাযজ্ঞ কলঙ্কের এক নতুন অধ্যায় হয়ে থাকবে। এর জন্য আওয়ামী লীগকে কেবল ইতিহাসের কাঠগড়ায় নয়, আইনের কাঠগড়াতেও এক সময় দাঁড়াতে হবে।’

বিবৃতিতে বলা হয়, ‘আমরা মনে করি, এই হত্যযজ্ঞ সম্পূর্ণভাবে ঠান্ডা মাথায় সুপরিকল্পিতভাবে ঘটানো হয়েছে। আওয়ামী সশস্ত্র ক্যাডারদের পূর্ব থেকে মোতায়েন করা, তাদের পরিকল্পিত তাণ্ডব, হেফাজতের ওপর এর দোষ চাপানো, বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করা, অভিযানের আগে ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার সাংবাদিকদের ঘটনাস্থাল থেকে বিতাড়িত করা থেকে তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।’

বিএনপি অভিযোগ করে, পৈশাচিক ঘটনাবলী সম্পর্কে সরকারের তরফ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বিবরণ বা প্রেসনোট দেয়া হয়নি। হতাহতের কোনো সঠিক পরিসংখ্যানও দেশবাসীকে জানানো হয়নি।

বিবৃতিতে বলা হয়য়, ‘বিদেশি গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন সূত্রে আড়াই থেকে তিন হাজার লোককে হত্যা এবং দশ হাজারের অধিক মানুষ আহত হবার কথা জানা যাচ্ছে। বিভিন্ন আলোকচিত্র ও ভিডিও ফুটেজে অভিযানে বেপরোয়া গুলিবর্ষণ, অসংখ্য লাশের ছড়াছড়ি, মৃতদেহের ওপর দিয়ে ভারি যানবাহন চালিয়ে দেয়া এবং ট্রাক ভর্তি লাশ সরিয়ে নেয়ার নৃশংস দৃশ্যাবলী দেখে দেশবাসীর সঙ্গে আমরাও শিউরে উঠেছি।’

বিএনপি অভিযোগ করে, ‘হত্যাযজ্ঞের পরপর সরকার বিনা নোটিশে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী ও অজ্ঞাত পরিচয় সশস্ত্র ব্যক্তিদের পাঠিয়ে জোর করে এবং ভাঙচুর চালিয়ে ইসলামিক টেলিভিশন ও দিগন্ত টিভি’র সম্প্রচার তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করে দিয়ে এমন আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি করেছে যা উপেক্ষা করে কোনো সংবাদ মাধ্যম হত্যাযজ্ঞের কোনো বিবরণ প্রকাশের সাহস পাচ্ছে না। একই রাতে বিশিষ্ট কলামিষ্ট প্রবীণ সাংবাদিক শফিক রেহমানের বাসায়ও সশস্ত্র হামলা চালানো হয়।’

‘এখন ত্রাস নিয়ন্ত্রিত দেশীয় গণমাধ্যমে কেবল সরকারি ভাষ্য ও পাবলিসিটি ম্যাটেরিয়াল প্রচারিত হচ্ছে। আমরা বিশ্বাস করি, এর মাধ্যমে শতাব্দির জঘন্যতম গণহত্যাকে আড়াল করা যাবে না’ বিবৃতিতে বলা হয়।

বিরোধী দল জানায়, ‘হেফাজতে ইসলাম আলেম, মাদরাসা শিক্ষক ও ছাত্রদের সমন্বয়ে গঠিত একটি অরাজনৈতিক সংগঠন। তাদের কিছু কিছু দাবির প্রতি আমাদের সমর্থন থাকলেও অনেক দাবির সঙ্গে আমাদের দ্বিমতও রয়েছে।’

বিবৃতিতে গণহত্যার বিষয়ে নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক তদন্তের আহবান জানায় বিএনপি। একইসাথে দল-মত নির্বিশেষে বাংলাদেশের জনগণকে প্রতিবাদ ও ন্যায়বিচার দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে সোচ্চার হওয়ার আহবান জানায় দলটি।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।