জেলরক্ষীর মাধ্যমে বিবৃতি পাঠিয়েছিলেন বালী: বিবিসি

ভারতের দমদম কারাগারে আটক আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াত নেতা মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর সাক্ষী সুখরঞ্জন বালীর মামলার নথিতে ‘অপহরণের’ কথা উল্লেখ নেই।

বিবিসি বাংলার অনলাইন ভার্সনে বলা হয়, বাংলাদেশের একটি যুদ্ধাপরাধ মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী সুখরঞ্জন বালী ভারতে ধরা পড়ার পর ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনীকে বলেছিলেন, তিনি তার ভাই পরিতোষ বালির সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য সেখানে গেছেন।

সুখরঞ্জন বালীর বিরুদ্ধে থানায় দায়ের করা অভিযোগ এবং মামলার রায় সংক্রান্ত আদালতের নথিপত্র বিবিসি বাংলার হাতে এসেছে।

এতে দেখা যাচ্ছে, তিনি ভারতে অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগ স্বেচ্ছায় স্বীকার করে নিয়েছেন।

সুখরঞ্জন বালি পশ্চিমবঙ্গের এক কারাগারে আছেন, এ খবর প্রথম প্রকাশ করে ঢাকার পত্রিকা ‘দ্য নিউ এজ’।

সেই খবরের সূত্র ধরে অনুসন্ধান করে খবরের সত্যতা প্রমাণিত হয়, তবে মি. বালী কীভাবে ভারতে আসলেন, বা ভারতীয় কর্তৃপক্ষ তার সম্পর্কে কতটুকু ওয়াকিবহাল, সেগুলো অস্পষ্ট রয়ে যায়।

সুখরঞ্জন বালী বাংলাদেশে জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসেন সাঈদীর যুদ্ধাপরাধের মামলায় অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী ছিলেন। তিনি গত বছরের ৫ নভেম্বর ঢাকায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল চত্বর থেকে ‘নিখোঁজ’ হয়ে যান।

জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসেন সাঈদীর আইনজীবীরা তখন অভিযোগ করেছিলেন, তাকে সরকারের নিরাপত্তা বাহিনীর লোকজন অপহরণ করে নিয়ে গেছে। তবে রাষ্ট্রপক্ষ তখন এই অভিযোগ অস্বীকার করেছিল।

বৃহস্পতিবার ঢাকার ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য নিউ এজ’-এর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, তাদের হয়ে একজন ভারতীয় নাগরিক কারাগারে সুখরঞ্জন বালীর বক্তব্য নেন, যেখানে মি. বালি বলেন যে তাকে বাংলাদেশ পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ অপহরণ করে, এবং পরবর্তীতে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিএসএফের কাছে তুলে দেয়।

তবে পশ্চিমবঙ্গের বশিরহাটের স্বরূপনগর থানায় সুখরঞ্জন বালীর বিরুদ্ধে যে এফআইআর (ফার্স্ট ইনফরমেশন রিপোর্ট) দাখিল করা হয়, তার কোথাও এমন কথা উল্লেখ নেই যে তাকে কেউ অপহরণ করেছিলেন বা বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষ তাকে ভারতের হাতে তুলে দিয়েছে।

‘অবৈধ অনুপ্রবেশ’
পশ্চিমবঙ্গের উত্তর-চব্বিশ পরগণা জেলার স্বরূপনগর থানায় সুখরঞ্জন বালীর বিরুদ্ধে অভিযোগপত্রটি দাখিল করেন বিএসএফ-এর ১৫২ নম্বর ব্যাটালিয়নের এ কোম্পানির অধিনায়ক বি পি সিং।

এতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশি নাগরিক সুখরঞ্জন বালী আমুদিয়া সীমান্ত চৌকির কাছে সন্দেহজনকভাবে ঘুরছিলেন। তখন বিএসএফ তাকে চ্যালেঞ্জ করলে তিনি পালানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু পরে ধরা পড়ে যান।

জিজ্ঞাসাবাদের জবাবে সুখরঞ্জন বালী বিএসএফের কাছে স্বীকার করেন, তিনি বনগাঁয় তার বড় ভাই পরিতোষ বালীর বাড়ি যাওয়ার উদ্দেশে বাংলাদেশ থেকে এসেছেন।

এই মামলায় আদালত সুখরঞ্জন বালীকে ভারতের বিদেশি আইনের ১৪ এ এবং ১৪ সি ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে ১০৫ দিনের কারাবাস ও ৫০০ টাকা জরিমানা করে।

আদালতের রায়ে আরও বলা হয়েছে, আটক থাকা ও বিচার চলাকালীন অবস্থায় যে সময়টা তিনি ইতিমধ্যেই জেলে থেকেছেন, সাজার মেয়াদ থেকে সেই সময়টা বাদ দিয়ে দেওয়া হবে।

এর মানে হলো সুখরঞ্জন বালীর কারাবাসের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। জেলের মেয়াদ শেষে তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়ারও আদেশ দিয়েছে আদালত।

জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসেন সাঈদীর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে সুখরঞ্জন বালী শুরুতে ছিলেন রাষ্ট্রপক্ষের পক্ষের সাক্ষী। কিন্তু পরে তিনি পক্ষ পরিবর্তন করে দেলাওয়ার হোসেন সাঈদীর পক্ষে সাক্ষী হতে রাজী হন বলে বিবাদী পক্ষের আইনজীবিরা জানান।

কারারক্ষীর সহায়তা
অবৈধভাবে ভারতে ঢোকার দায়ে উত্তর চব্বিশ পরগণার স্বরূপনগর এলাকায় ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে ২৩ ডিসেম্বর রাতে একব্যক্তিকে আটক করে বিএসএফ।

বসিরহাট আদালতের নথি ঘেঁটে সেখানকার আইনজীবী মোশারফ হোসেন জানিয়েছেন, বিএসএফ ওই ব্যক্তিকে স্বরূপনগর থানার হাতে তুলে দেয়– মামলা নম্বর ৭১৩, তারিখ ২৫ ডিসেম্বর, ২০১২।

পরের দিন, অর্থাৎ ২৬ ডিসেম্বর তাকে আদালতে পেশ করা হয় অবৈধভাবে ভারতের সীমানা অতিক্রম করার অভিযোগে।

বিদেশি আইনের ১৪ এ এবং ১৪ সি ধারায় অভিযোগ আনা হয়। আর বসিরহাটের দ্বিতীয় অতিরিক্ত ম্যাজিস্ট্রেট ৩ এপ্রিল সাজা ঘোষণা করেন। মাঝের সময়টা তিনি জেল হেফাজতেই ছিলেন।

বাংলাদেশের দৈনিকটিতে বলা হয়েছে, মি. বালী জেলে থাকা অবস্থাতেই একজন লোকের মাধ্যমে তিনি তার ভাষায় অপহৃত হবার ঘটনা নিয়ে এক বিবৃতি দিয়েছিলেন এবং সেটা নিউ এইজ পেয়েছে।

তবে পশ্চিমবঙ্গের কারা বিভাগের প্রধান রনভীর কুমারের বিবিসির সংবাদদাতাকে বলেন, জেলে থাকা কোনও বাংলাদেশি বন্দির সঙ্গে দেখা করে তার বিবৃতি নেওয়া এবং সেই বিবৃতি কোনও বিদেশি কাগজের হাতে পৌঁছিয়ে যাওয়াটা প্রায় অসম্ভব।

মি. কুমার বলেন, বন্দির কোনও আত্মীয়ও যদি আসেন, তাহলে সেই সাক্ষাতপ্রার্থীর পাসপোর্ট–ভিসা পরীক্ষা করে নেওয়া হয়।

আরও একটু খোঁজখবর নিয়ে গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, দমদম জেল কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যেই মি. বালীকে জেরা করেছে এবং মি. বালী জেলের আধিকারিকদের জানিয়েছেন, তিনি নিজেই অর্থের লোভ দেখিয়ে এক জেলরক্ষীকে দিয়ে ওই বিবৃতি বাইরে পাঠিয়েছিলেন।

ওই সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি নাকি ওই জেলরক্ষীকে বলেছিলেন, তার বক্তব্য নিজের দেশে, অর্থাৎ বাংলাদেশে পৌঁছিয়ে দেওয়া দরকার। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে এক চোরাচালানকারীর সঙ্গে দেখা করতে বলেন মি. বালী।

গোয়েন্দা সূত্রগুলো আরও জানিয়েছে, মি. বালীর কথা মতো ওই জেলরক্ষী বিবৃতিটি নিয়ে সীমান্তে যান এবং বলে দেওয়া চোরাচালানকারীর হাতে সেটি তুলে দেন। প্রতিশ্রুতিমতো টাকাও তিনি পেয়ে যান।

ওই জেলরক্ষীর নাম জানা যায়নি, কিন্তু তাঁকে জেল কর্তৃপক্ষ চিহ্নিত করতে পেরেছে আর তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।