তিস্তা চুক্তির মতো সীমান্ত চুক্তির চুক্তির ভবিষ্যতও বিশ বাঁও জলে: আনন্দবাজার

ভারত-বাংলাদেশ স্থলসীমান্ত চুক্তি সংক্রান্ত সংবিধান সংশোধনী বিল পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরোধিতার কারণে রাজ্যসভায় পেশ হয়নি । ফলে তিস্তা চুক্তির মতো এই চুক্তির ভবিষ্যতও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গেল।

মঙ্গলবার কলকাতার শীর্ষ বাংলা দৈনিক আনন্দবাজারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, তিস্তা চুক্তির মতো এই চুক্তির ভবিষ্যতও বিশ বাঁও (এক বাঁও= সাড়ে তিন হাত গভীরতা) জলে চলে গেল বলেই সংশ্লিষ্ট মহলের মত।

রাজ্য সরকারের অভিযোগ, তাদের না জানিয়েই সংসদে স্থলসীমান্ত চুক্তি বিলটি পেশ করতে চেয়েছিল কেন্দ্র। সে কথা জানতে পেরে মমতার সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করেন রাজ্যসভায় তৃণমূলের মুখ্য সচেতক ডেরেক ও’ব্রায়েন। মুখ্যমন্ত্রী তাকে বিলটি পেশের বিরোধিতা করার নির্দেশ দেন।

মমতার নির্দেশমতো রাজসভার ওয়েলে নেমে বিল পেশ করার বিরোধিতা করেন ডেরেক, সুখেন্দুশেখর রায়েরা। তাদের সঙ্গে যোগ দেন অসম গণপরিষদও।

এই প্রতিবাদের জেরে একাধিক বার চেষ্টা করেও বিলটি পেশ করতে পারেননি বিদেশমন্ত্রী সলমন খুরশিদ। মুলতুবি করে দিতে হয় অধিবেশনও।

এর পর ফোনে মমতার সঙ্গে কথা বলেন খুরশিদ। মুখ্যমন্ত্রী তাকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় কেন্দ্র এক তরফা এমন কোনও সিদ্ধান্ত নিতে পারে না, যাতে রাজ্যের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হয়। বিলটি আনার আগে কেন্দ্রের উচিত ছিল রাজ্যের সঙ্গে আলোচনা করে নেওয়া।

ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত বিবাদ মেটাতে ১৯৭৪ সালের ১৬ মে ইন্দিরা গান্ধী এবং শেখ মুজিবর রহমানের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। সেই চুক্তিতে দু’দেশের মধ্যে জমি আদানপ্রদান করে সমস্যা মেটানোর কথা বলা হয়েছিল।

কিন্তু এত দিনেও সেই চুক্তি বাস্তবায়িত হয়নি। দীর্ঘ দিনের বকেয়া এই সমস্যা মেটাতেই সংবিধানের ১১৯তম সংশোধনী বিল আনতে চাইছিল কেন্দ্র।

কিন্তু মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ স্থলসীমান্তের বেশির ভাগটাই পশ্চিমবঙ্গে। স্থলসীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়িত হলে পশ্চিমবঙ্গই প্রভাবিত হবে সবচেয়ে বেশি। পশ্চিমবঙ্গকে যতটা জমি দিতে হবে, ততটা জমি বাংলাদেশের কাছ থেকে পাওয়া যাবে না।

বিদেশমন্ত্রীকে তৃণমূল সংসদীয় দলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে এ ব্যাপারে আলোচনা করতে বলেন মমতা। জানিয়ে দেন, তার পর যা সিদ্ধান্ত নেওয়ার নেওয়া হবে।

বিল পেশে বাধা পাওয়ার পরে রাজ্যসভার তৃণমূল সাংসদদের সঙ্গে অবশ্য কয়েক বার কথা বলেছিলেন খুরশিদ।

মমতা-খুরশিদ আলোচনার পর ঠিক হয়, সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, মুকুল রায় ও ডেরেক ও’ব্রায়েন তার সঙ্গে বৈঠকে বসবেন। কবে, কখন এই বৈঠক হবে, তা এখনও ঠিক হয়নি। তবে বিদেশ মন্ত্রকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যত দিন না আলোচনা করে ঐকমত্যে পৌঁছনো যাচ্ছে, তত দিন বিলটি সংসদে আনা হবে না।

প্রসঙ্গত, তিস্তা চুক্তি নিয়েও রাজ্যের সঙ্গে কেন্দ্রের দীর্ঘ টানাপোড়েন চলছে। মমতার আপত্তিতেই বাংলাদেশে গিয়েও এই চুক্তিতে সই করতে পারেননি প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহ। কলকাতায় এসে তার সঙ্গে দেখা করে অনুরোধ জানিয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মণিও। কিন্তু বরফ গলেনি।

মমতার বক্তব্য, তিনি বাংলাদেশের বিরোধী নন। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে রাজ্যের স্বার্থ দেখাটা তার কর্তব্য। বাংলাদেশকে তিস্তার বাড়তি জল দিলে উত্তরবঙ্গের একটা বড় অংশের জনজীবন বিপন্ন হবে।

কিন্তু বাংলাদেশে নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, ততই তিস্তা এবং স্থলসীমান্ত চুক্তি নিয়ে দিল্লির উপরে চাপ বাড়াচ্ছে ঢাকা। চেষ্টা চালাচ্ছে সাউথ ব্লকও। তবে বিদেশ মন্ত্রক এটাও জানে যে, সংবিধান সংশোধনী বিল পাশ করাতে হলে সংসদে যে দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন, তা সম্ভবত পাওয়া যাবে না। কারণ, বিজেপি ইতিমধ্যেই এই বিল নিয়ে বেঁকে বসেছে।

তবে মন্ত্রকের একাংশের মতে, বিলটি অন্তত পেশ করা গেলেও বাংলাদেশকে ইতিবাচক বার্তা দেওয়া সম্ভব হতো। দ্বিপাক্ষিক কূটনীতির প্রশ্নে যা অত্যন্ত জরুরি।

কিন্তু মমতার পাল্টা যুক্তি, নিজের রাজ্যকে বিপন্ন করে অন্য দেশকে খুশি করা তার অগ্রাধিকারের মধ্যে পড়ে না।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।