‘পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে গেলে ক্ষমতা নিতে পারে সেনাবাহিনী’

॥ইনস্টিটিউট অব কমনওয়েলথ স্টাডিজের প্রতিবেদন ঃ ‘পলিটিক্যাল ইসলাম অ্যান্ড ইলেকশনস ইন বাংলাদেশ’॥

ডেস্ক রিপোর্ট ঃ রাজনৈতিক সংঘাতের কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে দেশের স্বার্থে সেনাবাহিনী ক্ষমতা নিতে পারে; যদিও আপাতদৃষ্টিতে তাদের ক্ষমতা নেওয়ার কোনো আগ্রহ নেই। তবে দেশে চরম অস্থিতিশীলতার পরিপ্রেক্ষিতে জাতিসংঘ বাংলাদেশ থেকে শান্তিরক্ষী নেওয়ার ব্যাপারে নেতিবাচক কোনো সিদ্ধান্ত নিলে তা সেনাবাহিনীর মধ্যে যথেষ্ট অনুঘটক হিসেবে কাজ করতে পারে। গত জুনে লন্ডনে প্রকাশিত ‘পলিটিক্যাল ইসলাম অ্যান্ড ইলেকশনস ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে। ইনস্টিটিউট অব কমনওয়েলথ স্টাডিজের ভিজিটিং রিসার্চ ফেলো ফ্রান্সেস হ্যারিসন ১৬৬ পৃষ্ঠার ওই প্রতিবেদন তৈরি করেছেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী নির্বাচনের মধ্য দিয়েই বাংলাদেশে নতুন প্রজন্মের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরপ্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। এখনো এ দেশে চল্লিশ ও ষাটের দশকের প্রজন্ম রাষ্ট্রক্ষমতায় আছে। তারা শিগগিরই অবসর নিতে পারে। প্রতিবেদনে বাংলাদেশে ইসলামপন্থী বিভিন্ন দল, জোট ও জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে আদর্শগত ও রাজনৈতিক বিরোধ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বিশেষ দৃষ্টি দেওয়া হয়েছে জামায়াতে ইসলামীর ওপর।

ফ্রান্সেস হ্যারিসন তাঁর প্রতিবেদনে বলেছেন, বিএনপিতে নতুন প্রজন্মের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। খালেদা জিয়া ধীরে ধীরে তাঁর ছেলে তারেক রহমানকে ক্ষমতা দিচ্ছেন। তবে শেখ হাসিনার কোনো আত্মীয় তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারী হচ্ছেন কি না, তা আওয়ামী লীগে এখনো স্পষ্ট নয়। তাঁর স্বজনদের অনেকেই দ্বৈত নাগরিক। তাঁদেরই কেউ শেখ হাসিনার উত্তরাধিকারী হতে পারেন।

প্রতিবেদন বলা হয়, নির্বাচনের আগে ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশি ও ইসলামপন্থীদের মধ্যে আদর্শগত বিরোধ এরই মধ্যে রাজপথে স্পষ্ট হয়ে পড়েছে।

প্রতিবেদনে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক জীবনে জামায়াতের প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে। পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলে জামায়াতের কর্মকা- বিস্তার ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর সাম্প্রতিক হামলায় সম্পৃক্ততার অভিযোগও খতিয়ে দেখা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, পরবর্তী ছয় মাসে দেশের পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য প্রধানত ছয়টি খাত থাকবে। এগুলো হলো নির্বাচনকালীন প্রশাসন, যুদ্ধাপরাধের রায় কার্যকর, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা বিশেষ করে প্রান্তিক আসনগুলোতে সহিংসতা, রাজনৈতিক পুনর্মিলন (জোট গঠন), পরস্পরবিরোধী ইসলামী শক্তিগুলোর সম্ভাব্য ঐক্য এবং যুক্তরাজ্যে অবস্থানকারী খালেদাপুত্রের (তারেক রহমান) বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকেই বিশ্বাস করেন, সবার অংশগ্রহণে নির্বাচন অনুষ্ঠানে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘ বাংলাদেশের রাজনৈতিক শক্তিগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে কৌশলগত সহযোগিতা পাওয়া ভারতকে এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে প্রভাবশালী বলে মনে করা হয়। আওয়ামী লীগের পেছনে এখনো ভারতের সমর্থন আছে বলে মনে করা হয়।

সামরিক বাহিনী : বেশির ভাগই মনে করে, পরিস্থিতি ভয়াবহ না হলে এবং রাজপথে সংঘাতের কারণে নিরাপত্তা পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে না গেলে বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর ক্ষমতায় আসার কোনো আগ্রহ নেই।

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনকে বাংলাদেশের কাছে আকর্ষণীয় উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাতিসংঘ যদি ওই মিশন বন্ধের ব্যাপারে কোনো হুমকি দেয় তাহলে সেনাবাহিনীকে উদ্যোগী হতে যথেষ্ট অনুঘটক হিসেবে কাজ করতে পারে বলে মনে করা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাধারণ জনগোষ্ঠীর চেয়ে ইসলামপন্থীদের ব্যাপারে সামরিক বাহিনী বেশি সহানুভূতিশীল বলে অনেকে যুক্তি দেখিয়েছে। তাদের মতে, সামরিক বাহিনীর মধ্যে হিন্দু ও ভারতবিরোধী মনোভাব প্রবল।

অন্যরা বলেছে, ১৯৭৫ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত যেসব ইসলামপন্থী সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছেন, তাঁদের অনেকেই এখন অবসর নিচ্ছেন। সেনাবাহিনীতে জামায়াতের মতো দলের প্রভাব এখন নেই বললেই চলে। তবে কোনো সন্দেহ নেই যে প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের ব্যর্থতার কারণে তরুণ ও মাঝারি পর্যায়ের কর্মকর্তাদের একটি অংশের মধ্যে হতাশা প্রবল।

নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা : ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের মতে, নির্বাচন কমিশন স্বাধীনভাবে কাজ করলেও নির্বাচনকালীন রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ যেই হোক না কেন তার ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। নির্বাচন কমিশন একা নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে পারে না। নির্বাচন কমিশনের পুলিশ ও জনপ্রশাসনের প্রয়োজন হয়। এ দুটির ওপর রাজনৈতিক প্রভাব চরম।

সাবেক এক জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মচারী বলেন, আইনগতভাবে নির্বাচন কমিশনের অসীম ক্ষমতা। কিন্তু বাস্তবে তা খুবই সীমিত। তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের (জাতীয়) জন্য দেশের ৮০ হাজার গ্রামজুড়ে কমপক্ষে পাঁচ লাখ সরকারি কর্মী নিয়োগ করতে হয়। তবে তাদের বাদ দেওয়ার কোনো ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের নেই।’

সাবেক ওই জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তার মতে, নির্বাচনের ৪০ শতাংশ কাজ করে নির্বাচন কমিশন। বাকি ৬০ শতাংশের ৩০ শতাংশ রিটার্নিং অফিসার ও তাঁর সহকারীরা এবং বাকি ৩০ শতাংশ কাজ আইনশৃক্সখলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলো করে থাকে। সরকার রিটার্নিং অফিসার ও তাঁর সহকারী এবং আইনশৃক্সখলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে।

তিনি মনে করেন, সরকার অরাজনৈতিক হলেও তার সহযোগিতা ছাড়া নির্বাচন কমিশন এককভাবে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করতে পারবে না।

বিএনপি : অনেকে বলেছে, খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমানের প্রভাব বিএনপিতে বিশেষ করে দলটির তুলনামূলক কট্টর তরুণ সদস্যদের মধ্যে বাড়ছে। দলের অনেকেই আশা করছে, তারেক রহমানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা প্রত্যাহার করা হলে তিনি দেশে ফিরতে পারেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, গত মে মাসে ঢাকায় হেফাজতে ইসলামের কর্মসূচির সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহালের দাবিতে খালেদা জিয়ার ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেওয়ার সমালোচনা রয়েছে। এমনকি তাঁর জোটের শরিকরাও বলে, সেটি ছিল দ্বিধাগ্রস্ত দাবি।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জামায়াতের সঙ্গে জোট গড়া নিয়েও বিএনপির অনেকের মনে প্রশ্ন আছে। ১৯৯৫ সালে বিএনপি অনুধাবন করেছিল যে আওয়ামী লীগবিরোধী দলগুলোর সঙ্গে নির্বাচনী জোট হলে গুরুত্বপূর্ণ আসনগুলোতে তাদের ভোট বিএনপি ও জামায়াতের পক্ষে আসবে।

হেফাজতের ভোট : বিএনপির বিশ্লেষকরা মনে করেন, চট্টগ্রাম ও সিলেটের কয়েকটি আসনে হেফাজতে ইসলামের ২০ থেকে ৩০ হাজার ভোট রয়েছে। একজন শিক্ষাবিদের মতে, হেফাজতের ভোট ব্যাংক মোট ভোটের ৪ থেকে ৫ শতাংশ। মনে করা হয়, শুধু মাদ্রাসাছাত্র ও তাদের পরিবারের সদস্যরাই নয়, দেওবন্দি মাদ্রাসায় প্রশিক্ষণ পাওয়া গ্রামের ইমামরাও গত মে মাসে ঢাকায় হেফাজতের বিক্ষোভ ‘সহিংসভাবে ছত্রভঙ্গ’ করার প্রতিবাদে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ভোট দিতে পারেন। এর সঙ্গে হেফাজতের ১৩ দফাকে সমর্থন করার কোনো সম্পর্ক নেই। তবে এটি বয়স্ক ধর্মীয় ব্যক্তিদের প্রতি সম্মান জানানো আবেগের বহিঃপ্রকাশ। এর সঙ্গে ইসলামী রাষ্ট্র গড়ার কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

প্রতিবেদনে বলা হয়, অনেক বাংলাদেশিই ব্লগারদের সম্পর্কে জানে না। তবে তারা শুনেছে, মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে ব্লগে অসম্মান করা হয়েছে।

জামায়াত মনে করে, মসজিদের ইমাম ও মুয়াজ্জিনরা ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে অন্যায় আচরণের কথা ছড়িয়ে দিয়েছেন। এ দেশের মসজিদগুলোর ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের ৭০ শতাংশেরই বেশি কওমি মাদ্রাসায় লেখাপড়া করেছেন। হেফাজতকে মতিঝিল থেকে হটিয়ে দেওয়ার খবর কেবল মসজিদের মাধ্যমেই নয়, সামাজিক গণমাধ্যম ও মোবাইল ফোনের মাধ্যমেও ছড়িয়েছে। মোবাইল ফোনে ইন্টারনেটের চেয়েও বেশি ব্লুটুথ ও এমএমএসের (মাল্টিমিডিয়া মেসেজিং সার্ভিস) মাধ্যমে হেফাজতের বিরুদ্ধে আইনশৃক্সখলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের ছবি ছড়িয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, কওমি মাদ্রাসার ঠিক কতজন নির্বাচনে অংশ নেন, তা স্পষ্ট নয়। জামায়াতের বিশ্লেষকরা মনে করেন, হেফাজত শীর্ষ নেতৃত্বের অনুগত একটি সংগঠন। নির্বাচনে বিশেষ কোনো দলের প্রার্থীদের ভোট দিতে হলে হেফাজতের কর্মীদের প্রতি শাহ আল্লামা শফীর নির্দেশনা প্রয়োজন।

সম্প্রতি জামায়াত সূত্রগুলো জানিয়েছে, কওমি মাদ্রাসাছাত্রদের প্রথমবারের মতো জামায়াতপন্থী পত্রিকা নয়া দিগন্ত পড়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এর আগে হিজাব ছাড়া নারীদের ছবি প্রকাশের কারণে ওই পত্রিকা পড়া কওমি মাদ্রাসাছাত্রদের জন্য নিষেধ ছিল।

প্রতিবেদনে বলা হয়, মসজিদের ইমামরা দৃশ্যত স্থানীয় জামায়াতকর্মীদের সহায়তায় ব্লগারদের বিরুদ্ধে লিফলেট বিতরণ শুরু করেছে। সাংবাদিকরা সন্দেহ করেন, গণমাধ্যমের সঙ্গে হেফাজতের যোগাযোগে বিশেষ করে ই-মেইলে ইংরেজি ভাষায় সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠানোর ক্ষেত্রে জামায়াত সহযোগিতা করছে।

যুদ্ধাপরাধ বিচারের প্রভাব : প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকার নির্বাচনের আগে দু-একটি মৃত্যুদ- কার্যকর করবে কি না, তা এখনো অজানা। আপিল প্রক্রিয়া এখনো বাকি রয়েছে। তবে আপিল বিবেচনার কয়েকটি আবেদন বর্তমান সরকারের মেয়াদেই নিষ্পত্তি হতে পারে। অনেকে মনে করে, রায় কার্যকরের ফলে সরকারের প্রতি জনসমর্থন বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের সমর্থন অনেক বাড়বে।

তবে জামায়াতের কর্মীদের মতে, সরকার যদি মৃত্যুদ- কার্যকরের পরিকল্পনা বাদ দেয় তাহলে সহিংসতা অনেক কমে যাবে। আবার অনেকে মনে করে, এখন জামায়াত ও আওয়ামী লীগের মধ্যে সমঝোতা সম্ভব। কারণ বিরোধী দলকে সরকারের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করানো প্রয়োজন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের মোট ভোটারের ১২ থেকে ১৪ শতাংশ সুধীসমাজের বলে অনেকে মনে করে। এই গোষ্ঠীর ভোটে আওয়ামী লীগ ভালো ফল পেতে পারে।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, পাঁচ হাজার বা তারও বেশি মানবাধিকার, নারী ও পেশাজীবী সংগঠন গ্রাম পর্যায়ে কাজ করে। ওই সংগঠনগুলো গণতন্ত্র, প্রগতিশীলতা ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ধারণ করলেও আওয়ামীপন্থী নয়। শাসনব্যবস্থা নিয়ে তাদের নিজস্ব মতামত থাকলেও ইসলামপন্থীদের হুমকি মোকাবিলায় তারা আওয়ামী লীগের পক্ষে ভোট দিতে পারে।

পাঠকদের সুবিধার জন্য মূল প্রতিবেদনটির লিংক নিচে দেওয়া হলো –

http://commonwealth.sas.ac.uk/research/islamic-parties-and-elections-bangladesh


সম্পাদনা: শামীম ইবনে মাজহার,নিউজরুম এডিটর

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।