পশ্চিমা বিশ্বের রাষ্ট্রগুলো সরকারের প্রতি অসন্তুষ্ট হওয়ায় নজর ভারত চীন ও রাশিয়ার দিকে

৫ জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আমেরিকা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোসহ পশ্চিমা বিশ্বের রাষ্ট্রগুলো আওয়ামী লীগ সরকারের প্রতি অসন্তুষ্ট হওয়ায় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার আশায় সরকার সম্পর্কোন্নয়নের জন্য এখন নয়া দিল্লি, বেইজিং ও মস্কোর মুখাপেক্ষী হয়েছে।

একদলীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে হাসিনার সরকারের সমর্থনে কণ্ঠ জোরালো করেছিল এই তিন দেশ। কিন্তু সব দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের আহ্বান জানিয়েছিল পশ্চিমা বিশ্ব।

পরে এই তিন দেশ বাংলাদেশের নতুন সরকারকে স্বাগত জানানো এবং দেশটির সঙ্গে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশের জন্য আরো অনেক দেশকে অনুরোধও জানায়।

কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, ২০০৯ সালে ক্ষমতা গ্রহণ করার পর থেকেই হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার দুই দফার মেয়াদে এই তিন দেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখায় দেশগুলো বাংলাদেশের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছে।

৫ জানুয়ারির নির্বাচনের কঠোর সমালোচনা করলেও এশিয়ার পরাশক্তি জাপান আবারো বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো নির্মাণ ও বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে। আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই টোকিও, বেইজিং এবং নয়া দিল্লির বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা ঢাকায় সফর করবেন।

ঢাকায় অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাসে কর্মরত একজন কূটনৈতিক বলেন, “নয়া দিল্লিতে নতুন সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করার পরপরই বেশ কিছু বড় ধরনের কাজ একসঙ্গে করবে ভারত ও বাংলাদেশ।”

ভারতীয় রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদকে ভারত সফরের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদও এই আমন্ত্রণ সাদরে গ্রহণ করেছেন। কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা শেষে তার ভারত সফরের বিষয়টি চূড়ান্ত করা হবে।

এদিকে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চারদিনের এক সফরে শনিবার টোকিওর উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেছেন। দেশে ফিরবেন ২৯ মে। এরপর আগামী ৬ জুন তিনি বেইজিং সফরে যাবেন।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, “আন্তর্জাতিক বিশ্বে বাংলাদেশের সুনাম অক্ষুণ্ন রাখা এবং বাংলাদেশের সমর্থনে বিদেশী ক্ষমতার পাশে থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যেই প্রধানমন্ত্রী বিদেশ সফর করছেন।

এছাড়াও আগামী ১৬-১৮ জুন কম্বোডিয়ান প্রধানমন্ত্রী হুন সেন ছাড়াও বেশ কয়েকজন ভিভিআইপি ঢাকা সফরে আসবেন। মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, অন্য দেশের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাদের ঢাকা আসা নিশ্চিত এবং দেশের শীর্ষ কর্মকর্তারাও  বিভিন্ন দেশে যাতায়াতের মাধ্যমে সুসম্পর্ক বজায় রাখার কাজ করতে পারেন সে লক্ষ্যে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা কাজ করে যাচ্ছেন।

ক্রিমিয়াকে নিজ রাষ্ট্রের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করার ব্যাপারে রাশিয়ার বিষয়ে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ রেজুল্যুশনে স্বাক্ষর করা থেকে বাংলাদেশ বিরত থেকেছিল। রেজুল্যুশনটি শেষ পর্যন্ত রাশিয়ার পক্ষেই গিয়েছে। ফলে সব মিলিয়ে বাংলাদেশের বিষয়ে রাশিয়া এখন অতি উৎসাহী।

জাপানে সফরের জন্য হাসিনাকে আমন্ত্রণ জানাতে গত ২১ মার্চ টোকিও থেকে ঢাকায় এসেছিলেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফুমিও কিশিদা। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরে ঢাকা সফর করেছেন এমন কোনো পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে তিনিই প্রথম।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, মহেশখালীর মাতারবাড়ি দ্বীপে কয়লাচালিত বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপনসহ বাংলাদেশের পাঁচটি বড় ধরনের প্রকল্পের জন্য সরকারি উন্নয়ন সহযোগিতার (ওডিএ) অংশ হিসেবে বাংলাদেশকে ১.১৮ বিলিয়ন ডলার দেবে জাপান।

কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০০৬ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে জাপানি প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৬১টি থেকে ১৭৬-এ এসে দাঁড়িয়েছে।

হাসিনাকে চীনে সফরের জন্য আমন্ত্রণ জানাতে গত ২৯ মার্চ বেইজিং থেকে ঢাকায় পা রাখেন চীনের ইউন্নানের প্রাদেশিক গভর্নর লি জিহেং।

এদিকে, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে সরকার হিসেবে আওয়ামী লীগের পুনঃনির্বাচিত হওয়ার পর আমেরিকা বা ২৮ সদস্য দেশ বিশিষ্ট ইউরোপিয় ইউনিয়নের কোনো দেশ- কেউই হাসিনাকে স্বাগত জানায়নি। এই দেশগুলোর সঙ্গে এখনো পর্যন্ত বড় ধরনের কোনো দ্বি-পাক্ষিক সাক্ষাত হয়নি। শুধু কাজের ক্ষেত্র হিসেবে যতটুকু সম্পর্ক রাখা প্রয়োজন, ততটুকু সৌজন্যবোধই বাংলাদেশের সঙ্গে রক্ষা করে চলেছে আমেরিকা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো।

সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেয়ার সময় বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর রাষ্ট্রদূতরা বারবার বলেছেন- ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের ঠিক পরেই তাদের নিজ নিজ দেশের সরকার বাংলাদেশের জনগণের প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটায় এমন একটি স্বচ্ছ, গ্রহণযোগ্য এবং সব দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ নির্বাচন করতে সব দলের মধ্যে জরুরি সংলাপের প্রতি যে গুরুত্বারোপ করেছিল, সেই অবস্থানেই এখনো অনড় আছে তারা।

এদিকে, সরকারের অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে- বাণিজ্য ও বিনিয়োগ খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরে ঢাকা ও টোকও বেশ কয়েকটি চুক্তি স্বাক্ষর করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

টোকিও থেকে ফিরে আবার ছয় দিনের এক সফরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চীনে যাবেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়াংয়ের আমন্ত্রণে। সেখানে তিনি প্রথমে অংশ নেবেন ইউন্নান প্রদেশের কুনমিঙে অনুষ্ঠিতব্য দ্বিতীয় চীন-দক্ষিণ এশিয়া প্রদর্শনীতে। কুনমিং থেকে তিনি চীনা প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়াংয়ের সঙ্গে একটি আনুষ্ঠানিক বৈঠকের উদ্দেশ্যে রাজধানী বেইজিংয়ে যাবেন।

হাসিনার সফরকে সামনে রেখে বাংলাদেশকে একশ’ মিলিয়ন ইউয়ানের (চীনের মুদ্রা) একটি বড় অংকের সহযোগিতা প্রদানের ঘোষণা দিয়েছে চীন। বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা বাহিনীর উন্নয়নের জন্য এই সহায়তা দেবে চীন। এই বড় অংকের অর্থের মাধ্যমে চীনের কাছ থেকেই স্বল্প দূরত্বে ছোঁড়ার মতো সারফেস-টু-এয়ার ক্ষেপণাস্ত্র কিনবে বাংলাদেশ। এটি বাংলাদেশের বিমানবাহিনীকে আরো শক্তিশালী করবে।

দুই দেশের মধ্যে সামরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এর আগে ২১ সদস্য বিশিষ্ট প্রতিরক্ষা বিষয়ক একটি প্রতিনিধি দলকে বাংলাদেশে পাঠিয়েছিল চীন। চীনের কেন্দ্রীয় সামরিক কমিশনের ভাইস চেয়ারম্যান জেনারেল জু কুইলিয়াঙের নেতৃত্বে ওই প্রতিনিধি দলটি ১১ থেকে ১৩ মে দু’দিনের ঢাকা সফরে চারটি দ্বি-পাক্ষিক প্রতিরক্ষা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিল।

পাশাপাশি, বাংলাদেশের নেতাদের সঙ্গে আলোচনার জন্য চীনের ন্যাশনাল পিপলস্‌ কংগ্রেসের স্থায়ী কমিটির ভাইস চেয়ারপারসন ইয়ান জুনকিকে তিন দিনের এক সফরে ঢাকায় পাঠিয়েছিল চীন।    সূত্র: ডেইলি স্টার।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।