মিয়ানমার সীমান্ত জুড়ে অতিরিক্ত সৈন্য সমাবেশ: সতর্ক বিজিবি ২দিন পর বিজিবি সদস্যের লাশ ফেরত

বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের নাই্যংছড়ির পাইনছড়ি ৫২ নম্বর পিলার এলাকায় মিয়ানমার সীমান্তরী বাহিনীর গুলিতে নিহত বিজিবির নায়েব সুবেদার মিজানুর রহমানের লাশ গতকাল শনিবার বিকাল ৫টা ৪৫ মিনিটে ফেরত দিয়েছে মিয়ানমার। সদ্য স্থাপিত পাইনছড়ি বিওপির নায়েব সুবেদার মিজানুর রহমান (৪৬) কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার মোহনপুর ইউনিয়নের ভেলা নগর গ্রামের শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল হাফিজের ছেলে। নিহত বিজিবির নায়েব সুবেদারকে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় ঢাকাস্থ মিয়ানমার রাষ্ট্রদূত ইউ মিন এল উইনকে দু’দফা বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তলব করায় চাপের মূখে মিয়ানমার ওই বিজিবি কর্মকর্তার লাশ ফেরত দিতে বাধ্য হয়েছে বলে ধারনা করা হচ্ছে। কিন্তু মিয়ানমার বাহিনী তাদের অভ্যন্তরে ৩১ হতে ৫৪ সীমান্ত পিলার এলাকা জুড়ে বিজিপির পাশাপাশি অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করেছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে। যার ফলে উভয় দেশের সীমান্ত এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। এদিকে পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে বিজিবিও কঠোর অবস্থানে থেকে সীমান্ত এলাকায় টহল জোরদার করেছে।

 
বিজিবি ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত বুধবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে একদল বিজিবি নিয়মিত টহলের উদ্দেশ্যে সদ্য স্থাপিত পাইনছড়ি বিওপি ক্যাম্প থেকে বের হয়ে দোছড়ি ও তেছড়ি খালের সংযোগস্থলে পৌছঁলে ওপার থেকে মিয়ানমারের সীমান্তরী বাহিনী (বিজিপি) তাদের ল্য করে ব্যাপক গুলি বর্ষন শুরু করে। এ সময় বিজিবি সদস্যরা দিক-বেদিক ছুটাছুটি করে পালিয়ে গেলেও দায়িত্বরত নায়েক সুবেদার মিজানুর রহমান গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলে মারা যান।

 
জুমাবার বিজিবি সদস্যরা লাশ ফেরত আনার জন্য পাইনছড়ি এলাকায় পৌছঁলে মিয়ানমার সীমান্তরী বাহিনী (বিজিপি) দুপুর আড়াইটা থেকে থেমে  ৫টা পর্যন্ত বিজিবিকে ল্য করে অতর্কিত ভাবে ফের গুলি বর্ষণ শুরু করে। এ সময় বিজিবিও পাল্টা গুলি ছুড়ে। যার ফলে সীমান্তের পরিস্থিতি আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠে। বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের এহেন পরিস্থিতিতে স্থানীয় লোকজনের মাঝে বিরাজ করছে চরম উদ্বেগ-উৎকন্ঠা ও অজানা আতংক। অনেকেই গ্রাম ছেড়ে অন্যত্রে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে শুরু করেছে বলে গ্রামবাসী সূত্রে জানা গেছে।
নাই্যংছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবু সাফায়াৎ মুহাম্মদ সাঈদুল ইসলাম জানান, শনিবার পাইনছড়ি সীমান্ত এলাকা দিয়ে নিখোঁজ বিজিবির নায়েক সুবেদার মিজানুর রহমানের লাশ বিজিবির হাতে ফেরত দিয়েছে মিয়ানমার। একই কথা জানিয়েছেন দৌছড়ি ইউপি চেয়ারম্যান রশিদ আহমদ। তিনি বলেন, পুলিশ, বিজিবি ও স্থানীয় লোকজন লাশ ফেরত আনার জন্য ঘটনাস্থল পাইনছড়ি এলাকায় গেলে দীর্ঘ সময় কালপেন করে মিয়ানমার সীমান্তরী বাহিনী (বিজিপি) নিহত মিজানুর রহমানের লাশ বিজিবির হাতে তুলে দেয়।
গতকাল শনিবার সীমান্তের বালুখালী, ঘুমধুম, তুমব্র“ ভাজাবনিয়া, বাইশফাঁড়ি ঘুরে বিজিবি ও স্থানীয় গ্রামবাসীর সাথে কথা বলে এবং নির্ভরযোগ্য বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, ৩১ নং পিলার থেকে ৫৪ নং পিলার পাইনছড়ি এলাকা পর্যন্ত মিয়ানমার সীমান্তের অভ্যন্তরে সীমান্তরী বাহিনী (বিজিপি)’র পাশাপাশি অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করা হয়েছে এবং নিরাপদ স্থানে লোকজনকে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এলাকার বিভিন্ন স্থানে বাংকার খননের মাধ্যমে তারা রণসজ্জার প্রস্তুতি নিয়ে ১নং সেক্টর নাফফুরা, ২নং সেক্টর তুমব্র“ও ৩নং সেক্টর ফকিরাবাজার পর্যন্ত ৫ ব্যাটালিয়ন সেনা সদস্য মোতায়েন করেছে।

 
কক্সবাজার ১৭ বিজিবির অধিনায়ক লেঃ কর্ণেল খন্দকার সাইফুল আলম বলেন, নিহত বিজিবি মিজানুর রহমানের লাশ ফেরত দিয়েছে মিয়ানমার। বেশি দূর্গম এলাকা হওয়ায় লাশ সদর এলাকায় পৌছঁতে রাত ৮টা নাগাদ পর্যন্ত হতে পারে। তিনি বলেন, সীমান্ত এলাকার উত্তেজনাকর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আমার নিয়ন্ত্রনাধীন ১৮ হতে ৪০ নং সীমান্ত পিলার পর্যন্ত এবং যে কোন পরিস্থিতি মোকাবেলা করার জন্য সতর্ক রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, মিয়ানমার আগে থেকেই তাদের সীমান্তের অভ্যন্তরে সেনা বাহিনী মোতায়েন করেছে। নাই্যংছড়ি ৩১ বিজিবির অধিনায়ক লেঃ কর্ণেল শফিকুর রহমান বলেন, সন্ধ্যায় মিয়ানমার বিজিপি নিহত নায়েব সুবেদারের লাশ ফেরত দিয়েছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, শনিবার গোলোযোগপূর্ণ ওই সীমান্তে ফের উত্তেজনা দেখা দেয় এবং বিকেল চারটার দিকে দুই দেশের সীমান্তরী বাহিনীর মধ্যে পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। তবে লাশ ফেরতের পরও সীমান্তে উত্তেজনা বিরাজ করছে। দোছড়ি সীমান্ত এলাকার চাকঢালা থেকে লেমুছড়ি হয়ে বাইশারি পর্যন্ত সীমান্তের এপারে বিপুল সংখ্যক বিজিবি সদস্যকে সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে। এঘটনায় গত ২দিন ধরে সীমান্তবর্তী প্রায় ১০ হাজার মানুষ চরম আতঙ্কে দিনাতিপাত করছে। অনেকেই ঘরবাড়ি ছেড়ে পাশ্ববর্তী নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিয়েছে। আতঙ্কের কারণে ঘর থেকে বের হতে না পারায় অনেকেই অনাহারে দিনযাপন করছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
এদিকে মিয়ানমার বাহিনীর এমন উদ্যত্বপূর্ণ আচরণের তীব্র নিন্দা জানিয়ে বান্দরবান জেলা জামায়াতের আমীর আব্দুস সালাম আজাদ বলেন, আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে সরকারের দুর্বল অবস্থান নিশ্চিত হয়েই মিয়ানমার বাহিনী বাংলাদেশের সাথে এমন আক্রমনাত্মক আচরণ করছে। দেশের সার্বভৌমত্ব রায় সেনাবাহিনী ও বিজিবিকে সার্বিক সহযোগীতা দিতে স্থানীয় জনসাধারণের প্রতিও আহ্বান জানান তিনি।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।