কুমিল্লায় পরকীয়ার জেরে হত্যা! ৯ মাস পর কবর থেকে লাশ উত্তোলন

কুমিল্লায় দাফনের নয় মাস পর ময়নাতদন্তের জন্য কবর থেকে খলিলুর রহমান নামের এক ব্যবসায়ী যুবকের লাশ উত্তোলন করা হয়েছে। আদালতের আদেশে গতকাল রোববার সন্ধ্যায় কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার কালির বাজার ইউনিয়নের ধনুয়াইশ গ্রামের কবরস্থান থেকে ওই লাশ উত্তোলন করা হয়। খলিলুর রহমান ধনুয়াইশ গ্রামের মৃত নুরুল ইসলামের ছেলে।সে স্থানীয় কালিরবাজারে স্টুডিও ও স্টীলের ব্যবসা করত। তার স্ত্রীসহ সিয়াম হোসেন নামে পাঁচ বছরের একটি পুত্র সন্তান রয়েছে। গত বছরের ৪ সেপ্টেম্বর পরকীয় প্রেমিকা রুনা আক্তারের নানার বাড়ি বরুড়া উপজেলার আমতলী খটকপুর খলিলের রহস্যজনক মৃত্যু ঘটে। মৃত্যুর প্রায় দেড় মাস পর পরিকল্পিত খুনের খুনের অভিযোগ এনে রুনা আক্তার সহ ১০ জনকে আসামী করে নিহতের মা মাফিয়া বেগম কুমিল্লার আদালতে মামলা করেন।

 

বিজ্ঞ আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে প্রথমে কোতয়ালী মডেল থানাকে তদন্তের নির্দেশ দেয়। এতে বাদী পক্ষ না রাজি দিলে মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্য পুলিশ ব্যুরো ইনভেস্ট্রিগেশন (পিবিআই) কে তদন্তের দায়িত্ব দেন। পিবিআই এর কর্মকর্তারা নিহতের পরিবার-প্রতিবেশী,পরকীয়া প্রেমিকার পরিবার,ঘটনাস্থল নানার বাড়ির লোকজনকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ ও মোবাইল ফোনের কললিস্ট ও ম্যাসেজ থেকে গুরুত্বপূর্ন তথ্য পান।আদালতের আদেশে লাশ উত্তোলন কালে কুমিল্লা জেলা প্রশাসকের নিবার্হী ম্যাজেস্ট্রেট এ কে এম ফয়সাল, পুলিশ ব্যুরো ইনভেস্ট্রিগেশন (পিবিআই) কুমিল্লা’র ইন্সপেক্টর মো. আলাউদ্দিন চৌধুরী, কুমিল্লা কালির বাজার ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আলহাজ্ব মো. সিকান্দার আলী সহ এলাকার গন্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ও বিপুল সংখ্যক উৎসুক জনতা উপস্থিত ছিলেন। দীর্ঘ সময় পর উত্তোলন করা লাশটি অনেকটা কংকালে রূপ নেয়। সুরতহাল রির্পোট তৈরী করে লাশটি কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগে ময়নাতদন্তের জন্য নেওয়া হয়।

 

মামলা ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মৃত খলিলুর রহমান কুমিল্লা সদরের কালিরবাজারে নিপা স্টুডিওসহ পাঁচটি দোকানের মালিক ছিলেন। ব্যবসায়ীক ক্ষেত্রে পাশ্ববর্তী উজিরপুর গ্রামের আলমগীর হোসেনের সাথে তার সম্পর্ক সৃষ্টি হয়। এক পর্যায়ে আলমগীর হোসেনের পরিবারের সকল সদস্যদের সাথেও খলিলুর রহমানের সাথে সম্পর্ক তৈরি হয়।সম্পর্কের একপর্যায়ে খলিল আলগীরের মেয়ে রুনা আক্তারের (১৯) সাথে পরকিয়া প্রেমে জড়িয়ে পড়ে। খলিলুর রহমানের স্ত্রী ও ছেলে থাকা শর্তেও পরকিয়ায় জড়িত হওয়ায় পর আলমগীর, তার স্ত্রী শাহিদা বেগম চাপ দেয় রুনা আক্তারকে বিবাহ করার জন্য। এক পর্যায়ে ২০১৭ সালের ৪ সেপ্টেম্বর রাতে কালিরবাজারে নিপা স্টুডিও থেকে রুনা আক্তার ও তার মা শাহিদা বেগম ফুসলাইয়া কোরবানীর ঈদের দাওয়াতের কথা বলে পাশ্ববর্তী বরুড়া উপজেলার আমতলী খটকপুর গ্রামে রুনার নানার বাড়িতে নিয়ে যায়।

 

সেখানে খলিলুর রহমানকে বিয়ের জন্য জোর করলে খলিল অস্বীকার করলে তাকে রাতে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে। পরদিন ৫ সেপ্টেম্বর সকালে খলিলের পরিবারকে জানানো হয় খলিল স্ট্রোক করেছে। তাকে কুমিল্লা টাওয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। খবর পেয়ে খলিলের পরিবারের লোকজন কুমিল্লা টাওয়ার হাসপাতালে গিয়ে খলিলের মৃত দেহ দেখতে পান। রুনার পরিবারের লোকজন লাশ রেখে পালিয়ে যান। পরে সরল বিশ্বাস করে হাসপাতাল থেকে মরদেহ এনে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করে।পরবর্তীতে খলিলের পরিবার খোঁজ নিয়ে জানতে পারে পাশ্ববর্তী উজিরপুর গ্রামের আলমগীর হোসেনের মেয়ে রুনা আক্তারের সাথে তার পরকিয়ার সম্পর্ক ছিল। মেয়ের সাথে পরকিয়ার সুবাদে আলমগীর হোসেন বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে খলিলুর রহমান থেকে প্রচুর টাকা ধার দেয়। খলিলের টাকা দিয়ে তার মৃত্যুর কিছুদিন আগে আলমগীর বিদেশে পাড়ি দেন । ধার নেওয়া টাকা ফেরত চাওয়া ও মেয়েকে বিয়ে না করায় তাকে পরিকল্পিত ভাবে হত্যা করা হয় বলে খলিলের পরিবারের অভিযোগ।

 

ঘটনার প্রায় দেড় মাস পর গত বছরের ২৫ অক্টোবর খলিলুর রহমানের মা মাফিয়া বেগম বাদি হয়ে রুনা আক্তারকে প্রধান আসামী করে তার মা শাহিদা বেগম, বাবা আলমগীর হোসেন, মামা ও খালুসহ ১০ জনের নাম উল্লেখ করে কুমিল্লা আদালতে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।বিজ্ঞ আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে প্রথমে কোতয়ালী মডেল থানাকে তদন্তের নির্দেশ দেয়। কোতয়ালী মডেল থানার ওসি (তদন্ত ) মো. সালাউদ্দিনের আদালতে দাখিলকৃত তদন্ত প্রতিবেদনে বাদী পক্ষ নারাজি দিলে পরে আদালত হত্যা মামলাটি পুলিশ ব্যুরো ইনভেস্ট্রিগেশন (পিবিআই) কে তদন্তের দায়িত্ব দেন। মামলার তদন্তের স্বার্থে ময়নাতদন্তের জন্য রোববার আদালতের নির্দেশে মৃত খলিলুর রহমানের মরদেহের কঙ্কাল করব থেকে উত্তোলন করে।

 

মামলার বাদি খলিলের মা মাফিয়া বেগম ও খলিলের স্ত্রী খাদিজা কান্না জড়িত কন্ঠে অভিযোগ করে বলেন, পরকিয়ার জের ও ধার দেওয়া টাকা ফেরত চাওয়ায় খলিলুর রহমানকে পরিকল্পিত ভাবে হত্যা করা হয়েছে। সঠিক তদন্তের মাধ্যমে হত্যাকারীদের বিচার চান মা ও স্ত্রী সহ খলিলের পরিবার।কালির বাজার ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আলহাজ্ব মো. সেকান্দার আলী বলেন, ব্যবসায়ী খলিলুর রহমান একটি ভালো ছেলে ছিলেন, যারাই খলিলকে হত্যা করেছে আমি চাই সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে তাদেরকে বিচারের আওতায় আনা হোক।

 

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশ ব্যুরো ইনভেস্ট্রিগেশন (পিবিআই) কুমিল্লা’র ইন্সপেক্টর মো. আলাউদ্দিন চৌধুরী বলেন, আদালত পিবিআইকে মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব দিয়েছে। আমরা দীর্ঘদিন তদন্ত করে ঘটনার বিভিন্ন ধরনের ক্লু পেয়েছি। যেহেতু মৃত্যুর পর মরদেহটির কোন ময়নাতদন্ত হয়নি। সেহেতু মামলার তদন্তের স্বার্থে আদালতের কাছে আবেদন করলে আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী ময়নাতদন্তের জন্য লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। কবর থেকে উদ্ধারকৃত কঙ্কালগুলো ময়নাতদন্ত শেষে সোমবার পূণরায় দাফন করা হবে। ময়নাতদন্তের রির্পোট পেলে কিভাবে মৃত্যু হয়েছে নিশ্চিত হওয়া যাবে ও ঘটনার রহস্য উম্মোচিত হবে।