রাজধানী থেকে অপহরণের পর অবিশ্বাস্য ভাবে ফিরে এলেন কুমিল্লার আ.লীগ নেতা

রাজধানীর লালমাটিয়া থেকে অপহৃত কুমিল্লার তিতাস উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা পারভেজ হোসেন সরকারকে উদ্ধার করেছে পুলিশ। অপহরণের ১১ ঘণ্টা পর শুক্রবার রাত ১১টার দিকে রাজধানীর পূর্বাচল (৩০০ ফিট রোড) থেকে তিনি তার পরিবারকে ফোন দেন। পরবর্তীতে তার পরিবার ও পুলিশ তাকে উদ্ধার করে।

 

পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) বিপ্লব কুমার সরকার বিষয়টি নিশ্চিত করে  জানান, তাকে কে বা কারা ৩০০ ফিট রোডে ফেলে গেছে. রাত ১১টার দিকে পারভেজ নিজেই তার পরিবারের সদস্যদের ফোনে জানান, তিনি ভালো আছেন। পরে পুলিশ ও তার আত্মীয়রা তাকে উদ্ধার করে।

ডিসি আরও জানান, অপহরণ এবং উদ্ধারের বিষয় নিয়ে এখনও তাকে জিজ্ঞেস করতে পারিনি। তাকে পুলিশ হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের প্রক্রিয়া চলছে। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে বিস্তারিত জানা যাবে।

এর আগে শুক্রবার দুপুরে মসজিদ থেকে জুমার নামাজ আদায় করে বের হওয়ার পর বাসার সামনে থেকেই তাকে গাড়িতে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে কারা কেন তাকে অপহরণ করেছিল সে ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। অপহরণকারীদের হাতে ওয়াকিটকি ও আগ্নেয়াস্ত্র ছিল। স্বজনদের ধারণা, রাজনৈতিক বিরোধের জের ধরে তাকে অপহরণ করা হতে পারে।

মোহাম্মদপুর থানার ওসি জামাল উদ্দিন মীর বলেন, অপহৃত পারভেজ হোসেনকে পাওয়া গেছে বলে স্বজনরা পুলিশকে জানিয়েছেন। কী কারণে তাকে অপহরণ করা হয়, কারা এতে জড়িত তা তদন্তে বেরিয়ে আসবে। ঘটনার সময়ের একটি সিসিটিভি ফুটেজ পাওয়া গেছে। তা অস্পষ্ট থাকায় অপহরণকারীদের চেনা যায়নি।

অপহূতের খালাতো ভাই ফাহাদ ভূঁইয়া জানান, কুমিল্লা উত্তর আওয়ামী লীগের সদস্য পারভেজ হোসেন আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুমিল্লা-২ (তিতাস-হোমনা) আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশী। ঢাকার লালমাটিয়ার সি-ব্লকের ২৭ নম্বর সড়কের ৩০ নম্বর বাসায় তিনি পরিবার নিয়ে থাকেন।

শুক্রবার দুপুরে তিনি জুমার নামাজ পড়তে স্থানীয় মিনার মসজিদে যান। দুপুর পৌনে ২টার দিকে তিনি হেঁটে বাসার সামনে এলে তাকে জোর করে কালো রঙের একটি জিপে তুলে নেওয়া হয়। ওই গাড়িটি অন্তত দুই ঘণ্টা আগে থেকেই এলাকায় ঘোরাফেরা করছিল।

বাসার নিরাপত্তাকর্মী ওমর আলী সাংবাদিকদের জানান, পারভেজ হোসেন বাসার গেটের সামনে আসার পরপরই প্যান্ট ও গেঞ্জি পরা এক ব্যক্তি এসে তার সঙ্গে করমর্দন করেন। লম্বা চুলের আরেকজন পেছন থেকে এসে পারভেজের মুখ চেপে ধরেন। তখনই কালো রঙের জিপটি সামনে চলে আসে এবং তাকে জোর করে গাড়িতে তুলে নেওয়া হয়।

গাড়ির ভেতর আরও দু’জন বসে ছিলেন। ওই গাড়ির নম্বর ছিল ঢাকা মেট্রো ঘ ১৪-২৫৭৭। তবে নম্বরটি সঠিক নয় বলে যাচাইয়ের পর জানায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। অপহরণের সময় ওমর আলী ঠেকাতে গিয়েছিলেন, তবে অস্ত্রের মুখে তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়।

পারভেজ সরকারের স্ত্রী তাহমিনা পারভেজ জানান, রাজনৈতিক বিরোধের জেরে তার স্বামীকে অপহরণ করা হয়েছে। কুমিল্লার আওয়ামী লীগ নেতা সোহেল শিকদার এ ঘটনায় জড়িত বলে তার ধারণা। কারণ প্রায় দেড় বছর আগে কুমিল্লার বাতাকান্দি বাজারে তার লোকজন পারভেজের ওপর হামলা চালিয়েছিল। তখন তার গাড়ি লক্ষ্য করে ছয়টি গুলিও চালানো হয়েছিল। গাড়িতে গুলি লাগলেও প্রাণে বেঁচে যান পারভেজ।

ওই ঘটনার পর তিনি আর এলাকায় যাননি। মাঝে ওমরাহ করেছেন। স্থানীয় রাজনীতি থেকেও নিজেকে অনেকটা গুটিয়ে নিয়েছেন। তবে তিনি সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। অপহরণের পর থেকে পারভেজের মোবাইল ফোনটিও বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। তার একটি বৈধ পিস্তল রয়েছে। অপহরণের সময় সেটি সঙ্গে ছিল কি-না তাহমিনা তা নিশ্চিত নন। অপহরণের পর কেউ মুক্তিপণ দাবি করেনি বলেও জানান তিনি।

তাহমিনার অভিযোগ, সোহেল শিকদার মাদক ব্যবসা ও সন্ত্রাসী কার্যকলাপের সঙ্গে যুক্ত। তার অপকর্মে বাধা দেওয়ার কারণেই চক্ষুশূল হন পারভেজ। এ কারণেই তার ওপর হামলা চালানো হয়েছিল। কিছুদিন আগে সোহেল প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছিলেন, পারভেজকে হত্যা করবেন।

তাহমিনার অভিযোগ প্রসঙ্গে সোহেল শিকদার নিজেকে নির্দোষ দাবি করে বলেন, পারভেজ হোসেন বিভিন্ন ডেভেলপার কোম্পানির জমি দখল করে দেওয়ার কাজ করেন। এ কারণে তার অনেক শত্রু রয়েছে। তারাই কেউ এ ঘটনায় জড়িত থাকতে পারে। যেহেতু সিসিটিভি ফুটেজ পাওয়া গেছে, তাই সহজেই শনাক্ত করা যাবে কারা অপহরণ করেছে। পারভেজ সন্ত্রাসী ইমন বাহিনীর সদস্য বলেও দাবি করেন সোহেল।

সিসিটিভির ফুটেজে দেখা যায়, পারভেজ বাসার সামনে গেলে সেখানে আগে থেকে অপেক্ষায় থাকা এক ব্যক্তি করমর্দনের উদ্দেশ্যে হাত বাড়িয়ে দেন। এরপর পারভেজকে অনুসরণ করে আসা দ্বিতীয় ব্যক্তি গিয়ে তার মুখ চেপে ধরেন। এরপর তাকে জোর করে গাড়িতে তুলে নেওয়া হয়। তখন মুসল্লিসহ আশপাশের লোকজন ঘটনাস্থলে ভিড় জমান। অপহরণের মূল প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় মাত্র ৩০ সেকেন্ডে।

এদিকে অপহরণকারীদের হাতে ওয়াকিটকি ও আগ্নেয়াস্ত্র থাকায় তারা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য কি-না তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন কেউ কেউ। তবে পুলিশ সে বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারেনি। র‌্যাব-পুলিশ জানিয়েছে, তারা পারভেজ হোসেনকে আটক বা গ্রেফতার করেনি।