আমরা স্বার্থপর, ক্ষমা আমাদের জন্য নয়: মনির আহমেদ - খবর তরঙ্গ
শিরোনাম :

আমরা স্বার্থপর, ক্ষমা আমাদের জন্য নয়: মনির আহমেদ



(খবর তরঙ্গ ডটকম)

দিনটি ছিল শুক্রবার। লাকসাম পাবলিক হল মিলনায়তনে সেদিন তৎকালীন সময়ে নির্বাচিত পৌর চেয়ারম্যান আলহাজ্ব মজির আহমেদ এর শপথ অনুষ্ঠানের তোরজোড় চলছিল। বিকাল ৪টার পর থেকে শপথ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত মেহমানরা আসতে শুরু করলেন। ২০০১ সালের  ১ অক্টোবরে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় আসার মাত্র সাত মাসের মাথায় বিএনপির টিকেটে বিপুল ভোটের ব্যবধানে নির্বাচিত পৌর চেয়ারম্যান মজির আহমেদের ওই শপথ অনুষ্ঠান ছিল ব্যাপক আলোচিত। বিএনপি নেতাকর্মীরা সহ সর্বস্তরের পৌরবাসীর মধ্যেও ছিল ব্যাপক উৎসাহ উদ্দিপনা।


শপথ অনুষ্ঠান শুরুর আগেই পাবলিক হল মিলনায়তনে অনেকের মধ্যে উপস্থিত হন অবিভক্ত বৃহত্তর লাকসাম উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি বর্তমান মনোহরগঞ্জ উপজেলার নাথেরপেটুয়া ইউনিয়নের পরানপুর গ্রাম নিবাসী ইঞ্জিনিয়ার মো. আবু নাছের ভুঁইয়া। এরমধ্যে কুমিল্লা জেলা প্রশাসকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত শপথ অনুষ্ঠান যথারীতি শুরু হয়। শপথ অনুষ্ঠানটি সরকারী প্রোগ্রাম হওয়ায় জেলা প্রশাসক মহোদয়ের নিয়ন্ত্রনেই ছিল অনুষ্ঠানটির সকল কার্য্যক্রম।


সিদ্ধান্ত অনুযায়ী উপস্থিত লাকসামের কয়েকজন সাবেক এমপি প্রয়াত আবদুল আউয়াল, জালাল আহমেদ এবং তৎকালীন লাকসাম উপজেলা বিএনপির সভাপতি সাইফুল ইসলাম হিরুকে মঞ্চে নেয়া হয়। বিএনপি সহ আমন্ত্রিত অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সিনিয়র নেতাদের জন্য মিলনায়তনের সামনের সারিতে বিশেষ আসনের ব্যবস্থা করা ছিল। নাছের ভাই ওই আসনেই বসা ছিলেন।


শপথ অনুষ্ঠানের পূর্বে যখন বক্তৃতাপর্ব শুরু হয় তখন আমি পাবলিক হল মিলনায়তনের পশ্চিম পাশে সর্বউত্তরের গেটে দাঁড়ানো। মিলনায়তন স্থান না পেয়ে পাবলিক হল মাঠে তখন বিএনপি এবং যুবদল, ছাত্রদলের কিছু নেতারা বিচ্ছিন্ন ভাবে ঘোরাঘুুরি করছে।


হঠাৎ নাছের ভাই মিলনায়ত থেকে বিমর্ষ অবস্থায় বেরিয়ে এসে আমাকে বলল, “মনির আমি ঢাকায় চলে যাবো, তুমিও আমার সাথে ঢাকায় চলো” আমি বললাম ভাই, “অনুষ্ঠান এখনো শেষ হয়নি, আপনি পড়ে যান” উনি বললেন, “বাদ দাও অনুষ্ঠান, আমি চলে যাচ্ছি, তুমিও চলো” আমি বললাম,  “ভাই আমারতো ঢাকায় যাওয়ার প্রস্তুতি নেই” নাছের ভাই তখন বললেন, “তাহলে আসো বাদাম খাও” এই কথা বলে মাঠে থাকা এক বাদাম দোকানদারের কাছ থেকে বাদাম নিয়ে নাছের ভাই আমাদের কয়েকজনকে নিয়ে বাদাম খেলেন। এরপর নিজ গাড়ীতে চড়ে ঢাকার উদ্যেশ্যে রওয়ানা হলেন। নাছের ভাই চলে যাওয়ার পর আমিও পাবলিক হল থেকে উত্তর বাজারের দিকে চলে আসি। তখন মাগরিবের নামাজের আগ মুহুর্ত। হঠাৎ কালবৈশাখী ঝড় শুরু হলো। তখন বুঝতে পারিনি যে এই কালবৈশাখী ঝড়ই আমাদের জীবনে একটি অন্ধকার নিয়ে আসছে। নাছের ভাইকে বহনকারী গাড়ী তখন খুব বড়জোর লাকসাম জংশন পার হয়েছে। আমি ঝড়তুফান উপেক্ষা করেই লাকসাম বাইপাস থেকে একটি বিশেষ কাজে নাথেরপেটুয়ায় আমার শশুর বাড়ী চলে যাই। ঝড়ের কারনে ওইরাতে আর ফিরতে পারিনি। তৎকালীন  সময়ে দক্ষিনাঞ্চলে মোবাইল নেটওয়ার্ক অতটা শক্তিশালী না থাকায় রাতে আর কারো সাথে যোগাযোগ করতে পারিনি। রাত আনুমানিক ২ টার দিকে হঠাৎ মাইকের আওয়াজে ঘুম ভেঙ্গে গেল। অপ্রস্তুত এবং অপ্রত্যাশিত ভাবেই মাইকে শুনতে হল, কুমিল্লা-ঢাকা মহাসড়কের চান্দিনায় ঝড়ের কবলে পড়ে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় দক্ষিন কুমিল্লা তথা বৃহত্তর লাকসামের জননন্দিত বিএনপি নেতা ইঞ্জি: নাছেরের মৃত্যু সংবাদের অনাকাঙ্খিত বচন গুলো।


মাইকের আওয়াজে ভেসে আসা কথাগুলো প্রথমে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না, পরে ঘর থেকে বের হয়ে ভালভাবে কানপেতে শুনলাম, আগে যা শুনেছি অবিশ্বাস্য হলেও তাই সত্যি। শরীরটা কাঁপতে শুরু করলো। ওই রাতে আর ঘুমাতে পারিনি, ভোর বেলায় চলে গেলাম পরানপুরে..গিয়ে দেখি বর্ষীয়ান এক রাজনীতিবীদের ধুমরে মুচরে যাওয়া নিথর দেহ পড়ে আছে শেষ বিদায়ের খাটিয়ায়। খাটিয়ার আশপাশে তখন দলীয় নেতাকর্মী এবং নিকটাত্মীয়দের বুকপাটা আর্তনাথ। সে আর্তনাথে সামিল না হয়ে পারলামনা আমি নিজেও। এর সাথেই শেষ হল বৃহত্তর লাকসামে বিএনপির রাজনীতির ইতিহাসে সর্বাধিক জনপ্রিয় সভাপতি জননেতা ইঞ্জিয়ার মো. আবু নাছের ভুঁইয়ার অধ্যায়। রাতভর নির্ঘুম থেকে চান্দিনা থেকে নাছের ভাইয়ের মরদেহটি তখন নিয়ে আসেন বর্তমান লাকসাম উপজেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ন-আহবায়ক আবদুর রহমান বাদল ভাই। 


৯৬’র ১২ জুনের নির্বাচন পরবর্তী সময়ে বৃহত্তর লাকসামের বিএনপি যখন অভিভাবক শুন্য তখন কুমিল্লা দক্ষিন জেলা বিএনপির সভাপতি বেগম রাবেয়া চৌধুরীর হাত ধরে লাকসামের বিএনপির নেতৃত্বে আসেন প্রয়াত ইঞ্জি: নাছের। রাজনীতির পাশাপাশি তিনি প্রথম শ্রেনীর একজন প্রকৌশলী ছিলেন। তেজগাঁয়ের বিজি প্রেস সহ দেশের অনেক বড় বড় স্থাপনা নাছের ভাইয়ের ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান থেকেই নির্মিত হয়েছে।


রাজনৈতিক জীবনে তিনি অত্যন্ত হাসোজ্জল, সদালাপী, মিষ্টভাষী, রসিক এবং কর্মীবান্ধব ছিলেন। ওই সময়ে মোবাইল ফোনের অতটা বিস্তৃতি না থাকলেও, যাদের মোবাইল ফোন ছিল তাদের ফোনে প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠেই শতাধিক নেতাকর্মীর খোঁজখবর নিতেন নন্দিত বিএনপি নেতা নাছের ভাই। খবর না দিয়ে হঠাৎ করেই লাকসাম-মনোহরগঞ্জের প্রত্যন্ত অঞ্চলের তৃনমূলের নেতাকর্মীদের বাড়ীতে চলে যেতেন তিনি। যার পাতিলে যা রান্না হত, তাই খেতেন। আসার সময় নিজের সামর্থ অনুযায়ী তৃনমূলের নেতাদের হাতে কিছু টাকা দিয়ে বলতেন, “এই টাকা দিয়ে তোমার ছেলে মেয়ের জন্য বাজার থেকে কিছু ভালমন্দ খাবার আনিও, বিকাল বেলায় তোমার এলাকার নেতাকর্মীদের নিয়ে একটু চা পানি খেও, সবাই মিলে দলের জন্য কাজ করো, কোন সমষ্যা হলে আমাকে জানাইও” এভাবেই বৃহত্তর লাকসামের প্রত্যন্ত অঞ্চল ঘুরে ঘুরে বিএনপিকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে নিয়েছেন প্রিয় নাছের ভাই। নাছের ভাইয়ের সৃষ্টি করা উর্বর আর শক্তিশালী মাঠেই বিএনপি ২০০১ এর জাতীয় নির্বাচনে বিপুল ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়। ভয়াবহ প্রতিহিংসার রাজনীতির ওই সময়ে নাছের ভাই ছিলেন সম্প্রীতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত।


২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচন পূর্ববর্তী সময়ে বর্তমানে বিএনপি জাতীয় নির্বাহী কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক, সাবেক এমপি, কর্ণেল (অব.) এম. আনোয়ারুল আজীম যখন এঅঞ্চলের বিএনপির রাজনীতিতে সরাসরি সম্পৃক্ত হন, ঠিক তখনই আমরা যারা নাছের ভাইয়ের অনুসারী ছিলাম তাদেরকে নিজ উদ্যোগে নাছের ভাই ডেকে  বললেন, “আজিম ভাই অনেক ভাল মানুষ, ওনার রাজনীতিতে আসা লাকসামবাসীর জন্য সৌভাগ্য, আজিম ভাই এমপি হলে আমাদের অঞ্চলের ব্যাপক উন্নয়ন হবে, আমরা সকলে আজিম ভাইয়ের পক্ষে কাজ করবো” প্রায় ৫ বছর নিজের অর্থবিত্ত আর মেধা দিয়ে তৈরী করা রাজনীতির মাঠ সম্পুর্ন বিনাস্বার্থে এভাবেই ছেড়ে দিলেন নাছের ভাই। বর্তমান সময়ে এমন উদারতা আশা করাও দু:স্বপ্ন। রাজনীতির পাশাপাশী ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান মসজিদ, মাদ্রাসা, মন্দিরে প্রানখুলে দান করতেন নাছের ভাই।


বিএনপির পাশাপাশী সকল শ্রেনী পেশার মানুষের প্রতি ওনার দরদ ছিল ভিন্নরকম। নেতাকর্মী কেউ অসুস্থ হলেই তাদেরকে দেখতে চলে আসতেন। দলমত নির্বিশেষে কেউ মারা গেলে শত ব্যস্ততার মধ্যেও নাছের ভাই জানাযায় অংশ নিতে সদুর ঢাকা থেকে ছুটে আসতেন।


আজকের অনেক বিত্তবান নেতাদের রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠার পিছনেও নাছের ভাই অনেক ত্যাগ আছে। আমাকে যুবদলের নেতা বানাতে নাছের ভাই অন্য এক নেতার তালা লাগানো বাসার সিঁড়িতে বসেছিলেন প্রায় তিনঘন্টা। যা আমি কোনদিন ভুলবনা। নাছের ভাইয়ের এমন আকর্ষিক মৃত্যুর পর প্রথম প্রথম ২/১ বছর ওনার রাজনৈতিক বিশ্বস্ত এবং অনেক কাছের সহকর্মী, লাকসাম পৌরসভা বিএনপির সাবেক সভাপতি ডা. মুহাম্মদ নুর উল্লাহ রায়হানের উদ্যোগে সৃতিচারন করা হলেও গত কয়েক বছর নিরবেই কেটে যায় নাছের ভাইয়ের মৃত্যুবার্ষিকী। যদিও নাছের ভাইয়ের চেষ্টায় রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত হয়ে অনেকে আজ কোটিপতি। অনেকে আজ বড় বড় নেতা। আসলে আমরা স্বার্থপর, ক্ষমা আমাদের জন্য নয়।


কুমিল্লা এর অন্যান্য খবরসমূহ
মতামত এর অন্যান্য খবরসমূহ
রাজনীতি এর অন্যান্য খবরসমূহ
লাকসাম এর অন্যান্য খবরসমূহ