ছেলে-বুডো, যুবা-বৃদ্ধা সবার চোখে-মুখে বিজয়ের হাসি, মুক্তির ঝিলিক

ঢাকা, ১৬ ডিসেম্বর (খবর তরঙ্গ ডটকম)- রোববার, চলতি বছরের অন্য সব দিনগুলোর চেয়ে একেবারেই আলাদা। সে যে আলাদা, তার প্রমাণ ভোর, সূর্য আর প্রকৃতি- অন্যদিনের চেয়ে তারা আজ বেশ আগে-ভাগে বাঙালিদের কাছে ধরা দিয়েছে। রাত ১২টা ১ মিনিটে বাংলাদেশে রাস্তায় নেমে এসেছে হাজারো মানুষ। তারা আনন্দ করছে, উল্লাসে ফেটে পড়েছে, যেমনটি আজ থেকে ঠিক ৪১ বছর আগে পুরো বাংলাদেশ ভোরকে প্রকৃতির নিয়মের আগেই জাগিয়ে দিয়েছিল। বাংলাদেশ নামক বিশ্ব মানচিত্রে স্থান অর্জনের এই গৌরবময় দিনে মেতেছে সবাই বাঁধ ভাঙার আহ্বানে। ছেলে-বুডো, যুবা-বৃদ্ধা সবার চোখে-মুখে বিজয়ের হাসি, মুক্তির ঝিলিক। শপথে নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়, যে বাংলাদেশ থেকে দূর হবে দীর্ঘদিনে বয়ে চলা সব কলঙ্ক।

বিজয় দিবসের উৎসব মানে রাজধানী ঢাকা সবার চোখে ভেসে আসে। আর ঢাকার মধ্যে সবার আগে মানসপটে জেগে ওঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, টিএসসি, ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, শিখা চিরন্তন, কেন্দ্রীয শহীদ মিনার আর রমনা।

বিজয়ের প্রথম প্রহর থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীক এসব এরিয়ায় উৎসবে মেতেছিল সবাই। জাতীয় পতাকার আদলে পোশাক পরে দিনভর তারা বিজয়োল্লাস করেছে। আগামী প্রজন্মের কর্ণধাররা তাদের উত্তর আর বর্তমান প্রজন্মের হাতে হাত রেখে ভেসেছে আনন্দে।

এই আগামী প্রজন্মই সবচেয়ে বেশি আনন্দ করেছে। তারা মুখে দেশমাতৃকার পতাকার নানা উল্কি আর হাতে গৌরবের ঝাণ্ডা উড়িয়ে জানান দিয়েছে, ‘ভয় কি মা তোর, আমরা আছি।’

শনিবার বিকেল থেকে রোববারের বিজয় দিবস ঘিরে সেজে উঠে রাজধানীর ঢাকা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও এর আশপাশের এলাকা। বাড়িঘর, দোকানপাট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা, রঙিন কাগজ আর বর্ণিল আলোকসজ্জা করা হয়।

রোববার সকাল ১১টায় জাতীয় জাদুঘরের সামনে থেকে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট বিজয় র‌্যালি বের করে। এটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন এলাকা প্রদিক্ষণ শেষে সামসুন্নাহার হলের সামনে এসে যুদ্ধাপরাধীদের প্রতীকী কুশপুত্তলিকা দাহ করে।

শহীদ মিনারে সকাল থেকেই হাজারো মানুষ জড়ো হয়। সকলের হাতেই শোভা পাচ্ছিল জাতীয় পতাকা, কপালে পতাকা শোভিত ব্যান্ড, মুখে ছিল দেশের গান। বদনজুড়ে আঁকা নানা উল্কি।

দেশের প্রতি ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশে নগরীর প্রায় সব গাড়িতেই উড়েছে জাতীয় পতাকা। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে হাজারো মানুষ মেতে ওঠে বিজয়ের আনন্দে। এখানকার শিখা চিরন্তনে ফুল দিয়ে অনেকে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।

রমনা বটমূলে শনিবার রাত থেকেই উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী গান পরিবেশন করে। সেখানেও আনন্দমুখর পরিবেশ দেখা যায়।

ঢাকার মানিকনগর থেকে ঢাবিতে এসেছে মেহরান, মুনিরা, মহুয়া, নাওফি। এই প্রজন্মের এই কর্ণধাররা জানান, ‘আমরা মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি। তাতে কি? আজ সকলের সাথে এসে আমরাও বিজয় কি তা বুঝতে পারছি।’

নগরীর রামকৃষ্ণ মিশন এলাকা থেকে বিজয় উৎসব করা তাওসীফ বলেন, ‘ঢাকা আসার পর এবারই সে প্রথম বিজয় দিবস পেলো। তাই মানুষের উচ্ছ্বাস দেখে অবিভূত।’

মোহাম্মদপুর থেকে এসেছেন স্বাধীন, হাসান, নুসরাত। তারা জানান, প্রতি বছর এই দিনটিতে তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাতে চলে আসেন। সারাদিন এখানে আয়োজিত নানা অনুষ্ঠান উপভোগ করেন।

বাড্ডার জিনিয়া এবং মাহী তাদের মায়ের সাথে বিজয় উৎসবে এসেছে। তারা জানায়, ঈদের পরেই তারা এই দিনটিতে সবচেয়ে বেশি আনন্দ করে। পরীক্ষা শেষ, তাই আনন্দে তাদের যোগ হয়েছে নতুন মাত্রা।

উৎসবের আয়োজনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ও সেজেছিল নবসাজে। ঐতিহ্যবাহী এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সব হলে আলোকসজ্জা করা হয়। দিনটিতে দেয়া হয়েছে বিশেষ খাবার।

প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থীরা জাতীয় পতাকার আদলে পোশাক পরে উৎসবে মেতে ওঠে। কেউ বা গলায় ঝুলিয়ে, মাথায় মুড়িয়ে আবার কেউ কপালে পতাকা বেধে বিজয় উৎসব করে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।