শ্রীলংকায় উদ্ধার হওয়া ১৩৯ জনের মধ্যে ৫৪জনই টেকনাফের বাসিন্দা

# পুত্র শোকে ২জনের মৃত্যু
# ঘটে চলছে লোমহর্ষক ঘটনা
# বাড়ছে স্বপ্নচারিদের মালয়েশিয়া পাড়ির প্রবণতা
সাগরের চোরাইপথে স্বপ্নের মালয়েশিয়া যাওয়া, এ যেন নৈমিত্তিক ব্যাপার। কুখ্যাত দালালদের খপ্পরে পড়ে মানুষ স্বপ্নচারিও হয় বটে। গা শিউরে উঠা আলোচিত বহুল ঘটনার পরও থামছেনা অজানা স্বপ্ন যাত্রার। একদিকে স্বজনদের গগণ বিদারী কান্না, অন্যদিকে বেসামাল শোকে মৃত্যুর মিছিলে লাশের যোজন। অভিভাবকদের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় পুরো এলাকা জুড়ে পড়েছে কান্নার রোল। আহাজারীতে ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ। সব মিলিয়ে তটস্থ প্রশাসন নির্বিকার। ঘটে চলেছে একের পর এক লোমহর্ষক ঘটনা। সাগর দিয়ে চোরাইপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার সময় সাগরে ভাসমান অবস্থায় শ্রীলংকান নৌবাহিনী কর্তৃক উদ্ধার প্রাপ্ত ১৩৯ জন যাত্রীর মধ্যে ৫৪ জনই টেকনাফ উপজেলার বাসিন্দা। তম্মধ্যে আবার ৭২ জন বাংলাদেশী ও ৬৬ জন মিয়ানমার রোহিঙ্গা নাগরিক। এতে ২ জন বাংলাদেশী যুবতী, ৩ জন শিশু এবং মিয়ানমারের একজন রোহিঙ্গা নারী রয়েছে। ১৬ ফেব্রুয়ারি বিকালে নির্ভরযোগ্য সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। এদিকে ১৬ ফেব্রুয়ারি শনিবার পুত্র শোকে মুহ্যমান দু’জন মা-বাবাও মারা গেছেন। আটকা পড়াদের ফিরিয়ে আনতে বিলম্ব হওয়ায় স্বজনদের পরিস্থিতি ক্রমশঃ অবনতির দিকে ধাবিত হচ্ছে বলে জানা গেছে। তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়- টেকনাফ উপজেলার সাবরাং ইউনিয়নের ইমান শরীফ, আবুল হাশেম ও লিটনের নেতৃত্বে গঠিত চোরাইপথে আদম পাচারকারী দালাল সিন্ডিকেট জানুয়ারি মাসের ১১ তারিখ রাতে সাবরাং ইউনিয়নের কাটবনিয়া ঘাট দিয়ে ১৩৫ জন যাত্রীকে ট্রলারে উঠিয়ে দিয়েছিল। প্রাপ্ত তথ্যমতে, রওয়ানা দেওয়ার ১সপ্তাহ পর এরা মিয়ানমারের ইয়াংগুন উপকূলে পৌঁছলে মিয়ানমার নৌবাহিনী এদেরকে আটক করে বেদম মারধর করে তাড়িয়ে দেয়। এরপর তারা আবার ২০জানুয়ারী ধরা পড়ে থাইল্যান্ড নেভীর হাতে। মিয়ানমার নেভীর দেয়া মারের ধকল কাটিয়ে উঠতে না উঠতে আবার ২য় দফা থাই নেভীর মার খেয়ে যাত্রীদের সকলেই অত্যন্ত কাহিল হয়ে পড়েছিল। থাই নেভী নাকি তাদের আটকপূর্বক সংশ্লিষ্ট কর্তৃপরে নিকট হস্তান্তর না করে গভীর সমুদ্রে নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দিয়েছিল। ট্রলারে জ্বালানী তেল না থাকায়, সাথে নেয়া খাদ্যদ্রব্য ও পানীয় পুরিয়ে যাওয়া সর্বোপরি ট্রলারের ইঞ্জিন বিকল হওয়ায় যাত্রীরা অসহায় ভাবে সাগরে ভাসতে ভাসতে উজানে চলে গিয়েছিল। ২০ জানুয়ারি থাই নেভীর হাতে ধরা পড়ার দিন সর্বশেষ দলটির সাথে টেকনাফের আত্মীয়-স্বজনরা স্বল্প সময়ের জন্য মোবাইল ফোনে কথা বলতে সম হয়েছিল। শ্রীলংকা দ্বীপের কাছাকাছি ভাসমান অবস্থায় শ্রীলংকান ধনাঢ্য এক ব্যক্তির মালিকানাধীন ফিশিং ট্রলার এদের আবিস্কার করে নৌবাহিনীকে খবর দিলে ৩ফেব্রুয়ারি এরা উদ্ধারপ্রাপ্ত হয়। ১৩৯ জন বনি আদমের মধ্যে উদ্ধারের দিনই ১জন মারা যায়। টেকনাফ উপজেলা সমবায় কার্যালয়ে কর্মরত আব্দুল গণি জানান, উদ্ধার প্রাপ্তদের মধ্যে সাবরাং নয়াপাড়া মৃত আবুল কাসেমের পুত্র মোঃ ইসমাইল (১৯)ও রয়েছে। দালালদের খপ্পরে পড়ে সকলের অগোচরে সেও চোরাইপথে সাগর দিয়ে মালয়েশিয়া পাড়ি দিয়েছিল। উদ্ধার হওয়ার পর শ্রীলংকান নেভী এবং সংশ্লিষ্ট ষ্টেশনের পুলিশ কর্মকর্তাদের সাথে একাধিকবার আলাপ করে নিশ্চিত হয়। চিকিৎসা করার পর কিছুটা সুস্থ হলে ৭২ বাংলাদেশী এবং ৬৬ জন মিয়ানমার রোহিঙ্গা নাগরিককে পৃথক করে ফেলেছে। প্রথমে উলুবিল ক্যাম্পে এরপর মাহিয়ানা পুলিশ ক্যাম্পে এদেরকে হস্তান্তর করা হয়েছে। এদিকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে গন্তব্যে না পৌঁছা এবং এসংক্রান্ত কোন খবরাখবর না পাওয়ায় আত্মীয় স্বজনদের মধ্যে চরম উৎকন্ঠা বিরাজ করছিল। ৩ ফেব্রুয়ারি গভীর সমুদ্র থেকে শ্রীলংকান নৌবাহিনী কর্তৃক তাদেরকে উদ্ধারের সচিত্র সংবাদ বিভিন্ন টেলিভিশনসহ মিডিয়ায় প্রচারিত হয়। তাদের কাহিল অবস্থা দেখে পুত্র শোকে স্বজনরা প্রবলভাবে ভেঙ্গে পড়েন। এই শোক সইতে না পেরে নুনিয়ারছড়া বসবাসকারী ইসমাইলের পিতা এবং হারিয়াখালীর বাসিন্দা শফিকের মা মারা গিয়েছেন। আব্দুল গণি আরও জানান- উদ্ধার হওয়ার ১সপ্তাহ পর বাংলাদেশী ও মিয়ানমার রোহিঙ্গা নাগরিকদের পৃথক করে ফেলায় আর তাদের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করা সম্ভব হচ্ছে না। বাংলাদেশী ৭২জন নাগরিকদেরকে আত্মীয় স্বজনদের সাথে কথা বলার সুযোগ দেয়া হচ্ছে না। ফলে কোথায় কোন ক্যাম্পে তাদের রাখা হয়েছে তা জানা সম্ভব হচ্ছে না। অপরদিকে মিয়ানমার রোহিঙ্গা নাগরিকদের সাথে এখান থেকে কথা বলার সুযোগ দেয়া হচ্ছে। কিন্তু ভাষাগত সমস্যার কারণে কোথায় রাখা হয়েছে তা নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তিনি সরকারী উদ্যোগে উদ্ধারপ্রাপ্তদের দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার দাবী জানিয়েছেন।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।