মনোহরগঞ্জের হাতিমারা গ্রামে চলছে শোকের মাতম: ৩ দিনের শোক

হাতিমারা গ্রামে চলছে শোকের মাতম। যে শিশুদের কোলাহলে ঘুম ভাঙত প্রতিবেশীর, সেই শিশুদের জন্যে কাদঁছে গোটা গ্রাম। গতকাল রোববার কুমিল্লার মনোহরগঞ্জের হাতিমারা গ্রামের দেখা যায় বাড়িতে বাড়িতে শোকের মাতম। সন্তান হারা পিতা-মাতাসহ স্বজনদের শান্তনা দেয়ারও যেন কেউ নেই। উপজেলার মাধ্যমিক ও প্রাথমিক বিদ্যালয়সমূহে ৩ দিনের শোক ঘোষনা করেছে কর্তৃপক্ষ। এ সময় প্রত্যেক স্কুলে কালো পতাকা উত্তোলন, নিহতদের রুহের মাগফেরাত কামনায় মিলাদ ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে।
গত শনিবার নাথুরপেটুয়া বাজারে ঘাতক ট্রাক কেড়ে নেয় এ গ্রামের ৭টি ফুটফুটে শিশুর প্রাণ। বেপরোয়া ট্রাকের চাপায় স্কুল ভ্যানে থাকা নাথুরপেটুয়া মর্ডান স্কুলের ৭ শিশু শিক্ষার্থী মর্মান্তিকভাবে প্রাণ হারায়। নিহত শোভা, হৃদয়, শুভ’র খেলার সাথীদের দেখা যায় ছলছল অপলক দৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে থাকতে।
ওই গ্রামের ৬০ বছরের বৃদ্ধ আবু জাফরও দাঁড়িয়ে চোখের পানি মুছছিলেন। তিনি ভারি কণ্ঠে বলেন, “যে শিশুগুলো গতকাল হাসতে হাসতে স্কুলে গেলো, তারা আজ কবরে। এই কষ্ট গ্রামবাসী কেমনে সয়।” তিনি বলেন, “বাদশা মিয়া ফোরম্যান বাড়ির ৩টি শিশুই আজ কবরে। ভূঁইয়া বাড়ির ১ শিশু, মজুমদার বাড়ি ১ শিশু, সেয়ার বাড়ি আর মাস্টারের বাড়িতেও সন্তান হারা পিতা-মাতা আর স্বজনদের কান্নায় আকাশ ভারী হয়ে গেছে। সব বাড়িতেই কান্না আর কান্না।” কবরের পাশে দাঁড়িয়ে সবুজ পাঞ্জাবি পরা শোভার বাবা জহুরুল ইসলাম ঢুঁকরে কাঁদছেন, ‘মাবুদ, ও মা, ও মা, আইঁও মরি যাইয়ুম’ (আমিও মারা যাব)। পাশে দাঁড়িয়ে চোখ মোছেন জহুরুলের চাচাতো ভাই শাহ আলম। তিনি জানান, “জহুরুলের ২ মেয়ের মধ্যে বড় মেয়ে ছিল জান্নাতুল মাওয়া শোভা। ৭ বছর বয়সী শোভা নার্সারিতে পড়তো।” বাক্য শেষ না হতেই ঢুঁকরে ওঠেন তিনিও, “এতো সোন্দর মাইয়্যারে মারি হালাইছে।” তিনি জানান, “শোভার বাবা জহুরুল সৌদি প্রবাসী। এক মাস হলো ছুটিতে এসেছেন।” এদিকে, চতুর্থ শ্রেণীর সুলতান আহমেদ স্বাধীনের পিতা সেলিম মিয়া সন্তান হারিয়ে পাগল প্রায়। মাঝে মাঝে প্রলাপ বকছেন। তার চাচাতো ভাই বাবুল বলেন, ‘হিজ্যা (সে) বিশ্বাস কইরতো চায় না, স্বাধীন মরি (মারা) গেছে।”
সন্তানহারা পিতা-মাতা ছাড়াও দুর্ঘটনায় নিহত শিশুরা কারো নাতি-নাতনি, কারো ভাইয়ের ছেলে, বোনের ছেলে, কারো ভাই-বোন আবার কারও খেলার সঙ্গী। এতে গ্রামজুড়েই শুধু শোক আর শোক। শোকে কাদঁছে পুরো গ্রাম। হাতিমারা গ্রামের  আহাজারি যেন থামবার নয়!

উল্লেখ্য, শনিবার ঘাতক ট্রাক কেড়ে নেয় নাথেরপেটুয়া মর্ডান স্কুলে অধ্যয়নরত হাতিমারা ৭ শিশু শিক্ষার্থীর প্রাণ। এরা হলো- আবু তাহেরের ছেলে হাসিবুল হাসান নিহাদ (৬) ও মেয়ে তিনা (৮), একই গ্রামের মাওলানা আবদুল মালেকের ছেলে আল আমীন (৭), মনির হোসেনের ছেলে রাকিবুল হাসান রাকিব (৮), মাহবুবুল আলমের ছেলে ফাহাদুল ইসলাম মিথন (৬), সেলিম মিয়ার ছেলে টিপু সুলতান স্বাধীন (৯), জহির মিয়ার মেয়ে জান্নাতুল মাওয়া শোভা (৭)। এ ঘটনায় আহত শিশু ফাহমিদা তাহের তমাকে গতকাল রোববার ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়েছে। খাজিদা আক্তার জুথি কুমিল্লা টাওয়ার হসপিটালে চিকিৎসাধিন এবং ভ্যান চালক জয়নাল আবেদীনকে রিলিজ দেয়া হয়েছে।


শনিবার রাতে হাতিমারা পূর্বপাড়া ঈদগাহে জানাযার নামাজের পর পারিবারিক কবরস্থানে নিহত ৭ শিশুর লাশ দাফন করা হয়। স্থানীয় এমপি মোঃ তাজুল ইসলাম, জেলা প্রশাসক মো. রেজাউল আহসান, পুলিশ সুপার মাহবুবুর রহমানসহ উপজেলা ও থানা প্রশাসনের কর্মকর্তা, স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃবৃন্দ নিহতের স্বজনদের সমবেদনায় পাশে এসে দাঁড়ান।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।