কক্সবাজার শহরে শতাধিক ভবন চরম ঝুঁকিপূর্ণ

কক্সবাজার শহরে সরকারী ও অধাসরকারী ভবন, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, কক্সবাজার বালক উচ্চ বিদ্যালয় কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের ছাত্রাবাস, জেলা স্টেডিয়াম ভবন এবং আরো কিছু ব্যক্তি মালিকানাধীন ভবন সহ শতাধিক ভবন চরম ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। ঝুঁকিপূর্ণ জেনেও অনেকে ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে আবার অনেকে নিরুপায় হয়ে এসব ভবন ব্যবহার করছেন। যার ফলে যেকোন মুহূর্তে শহরের এসব ভবন ধ্বসে সাভার ট্রাজিডির মতো ঘটনা হওয়ার আশঙ্কা করছে সচেতন মহল। তাই অনতিবিলম্বে প্রশাসনের উদ্যোগে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করে একটি সমন্বিত ও কার্যকর উদ্যোগ করার আহবান জানিয়েছেন সচেতন মহল।
২৪ এপ্রিল ঢাকার সাভারে ভবন ধ্বসে স্মরণকালের সবচেয়ে বড় মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হওয়ায় সারাদেশের ন্যায় পর্যটন শহর কক্সবাজারের মানুষও শোকাহত এবং আতঙ্কিত। শহরের বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ খবর নিয়ে জানা গেছে, কক্সবাজার শহরে অসংখ্য ভবন মারাÍক ঝুঁকির মধ্যে আছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঝুকির মধ্যে আছে কক্সবাজার পৌরসভার মালিকানাধিন বড় বাজার এলাকার পৌর সুপার মার্কেট, কক্সবাজার বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের দক্ষিন পার্শের পুরাতন ভবন,কালুর দোকান এলাকার ব্যাংকার দলিলুর রহমানের মালিকানাধীন কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের ছাত্রাবাস, দশ বছর আগে পরিত্যাক্ত জেলা স্টেডিয়াম ভবন ও বইল্যাপাড়ার সরকারী কলোনী।
বড়বাজারস্থ কক্সবাজার পৌরসভার মালিকানাধিন পৌর সুপার মার্কেট এক দশকের বেশি সময় ধরে চরম ঝুঁকিপূর্ণ বলে দাবি করছে ব্যবসায়ীরা। দুতলা এ মার্কেটটির প্রায় সকল পিলারই ফেটে গেছে। প্রতিটি তলার ছাদের অংশ খসে পড়ছে। আর ঝুকিপূর্ন জেনেও ফাটল পিলারের উপর এ ভবনটির তিন তলা নতুন করে অফিস নির্মান করছে পৌর কর্তৃপক্ষ। স্থানীয় ব্যবসায়ী রাসেদ, ওসমান, এনাম বলেন পৌর সুপার মার্কেট চরম ঝুঁকিপূর্ণ যে কোন সময় এ মার্কেটটি ভেঙ্গে পড়তে পারে। তারা আরো জানান বেশ কয়েক বছর ধরে ভবনটি বার বার প্লাস্টার খসে পড়ছে, রড উঠে যাচ্ছে। এ ব্যাপারে পৌরসভাকে বলেও কোন লাভ হয়নি। ব্যবসায়িক কারণে নিজেদেরই সংস্কার করতে হয়েছে। বর্তমানেও বহুস্থানে ফাটল আছে। মার্কেটটিতে অবস্থিত কক্সবাজার দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মোস্তাক আহমদ জানিয়েছেন, ঝুকিনিয়েই এ মার্কেটের ছাদে অফিস করছি। আমাদের দোকান মালিক সমিতির অফিসের চার পাশেও ফাটল দেখা দিয়েছে। তারপরও পৌর কর্তৃপক্ষ আমাদের অফিসের উপর আবার বিল্ডিং করছে যার ফলে ফাটল আরো বোড়ে গেছে।
এ ব্যাপারে পৌর মেয়র রাজ বিহারী দাশ বলেন , পৌর সুপার মার্কেট কবে নির্মান করা হয়েছে তা তিনি জানেননা। তিনি আরো জানিয়েছেন পৌর শহরে যে কয়টি ভবন ঝুঁকিপূর্ণ আছে চিহ্নিত করে তালিকা করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কালুর দোকান এলাকার কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের ছাত্রাবাস এলাকার বাসিন্দার দাবি করেন, ছাত্রাবাসের ভবনের বেশ কিছু অংশ মাটির নিচে দেবে গেছে এবং পুরো ভবন পেছনের দিকে সামান্য হেলে গেছে। এর মধ্যে সামনের গ্রেডবিমসহ অনেক অংশে ফাটল দেখা দিলেও মালিক পক্ষ তার উপর প্লাষ্টার করে দিয়েছে। তবে এই ভবন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে এর আগেও পত্র-পত্রিকায় প্রতিবেদন ছাপানো হয়েছিল। স্থানীয়দের দাবি নির্মাণের সময় ছাত্রাবাস ভবনের ভাল করে পাইলিং করা হয়নি তার উপর এই ভবন অনুমোদনের চেয়ে বেশি নির্মান হয়েছে তাই এই অবস্থা। এ ব্যাপারে কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের উপাধ্যক্ষ ডা. অরূপ দত্ত বাপ্পী বলেন ভবনটির ব্যাপারে গণপূর্ত অধিদপ্তর জরিজ করেছে। তারা এখনো প্রতিবেদন না দেওয়ায় কিছু বলা যাচ্ছে না। তবে দ্রুত মেডিকেল ছাত্রদের সরিয়ে নেয়া হবে বলে জানান তিনি। একইসাথে পার্শ্ববর্তী বড়–য়া পাড়ার সৌদি প্রবাসী রোহিঙ্গা ফারুকের ফারুকী মহলও চরম ঝুঁকিপূর্ণ বলে দাবি করেছে এলাকাবাসী। স্থানীয় শংকর বড়–য়া, শামসুল আলম, নেছার আহামদ বলেন রোহিঙ্গা মৌলভী ফারুক এই ভবন যখন করছে তখন কোন ধরনের পাইলিং করা হয়নি। আর ৫ তলার অনুমোদন থাকলেও বর্তমানে তুলেছে ৬ তলা। এছাড়া কিছুদিন আগে ভূমিক¤েপর সময় এই ভবন কিছুটা হেলে পড়েছিল। যার ফলে অনেকে বিল্ডিং থেকে বের হয়ে পড়েছিল। সব মিলিয়ে আমরা আশঙ্কা করছি এই ভবন চরম ঝুঁকিপূর্ণ। এছাড়া এই ভবনে রোহিঙ্গা জঙ্গিদের আনাগোনাসহ নানা ধরনের অসামাজিক কার্যকলাপের জন্য এই ফারুকী মহলকে মানুষ বিশেষভাবে চেনে বলে জানান তারা।
এ ব্যাপারে মৌলভী ফারুকীর ছেলে শাসমের আলম মিশু বলেন ভবনের ৮ তলা অনুমোদন আছে আমরা ৬ তলা তুলেছি। এদিকে টেকপাড়া এলাকার মৃত ফজল হাজীর বিল্ডিংও চরম ঝুঁকিপূর্ণ বলে জানিয়েছে এলাকাবাসী। প্রায় ৩/৪ বছর আগে এই বিল্ডিং একেবারে হেলে পড়ার কারণে ইলেকট্রনিক মিডিয়াসহ বিভিন্ন পত্রিকায় সংবাদ হয়েছিল। বর্তমানেও এই বিল্ডিং অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এ ব্যাপারে আলাপকালে এই বিল্ডিংয়ের কয়েকজন বলেন যেহেতু এটি আমাদের একমাত্র সম্বল। এটি ছাড়া আর কোথাও যাবার স্থান নেই। তাই বাধ্য হয়ে এখানে থাকছি। একই সাথে টেকপাড়া জনতা সড়ক এলাকার হাজী আবদুল গফুর সওদাগরের বাড়িও চরম ঝুঁকিপূর্ণ বলে জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
কক্সবাজার সরকারী বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের দক্ষিণ পার্শের পুরাতন দুতলা ভবন ও অডিটোরিয়াম ও চরম ঝুকি পূর্ন। পরিত্যাক্ত ভবনটিই প্রায় ছাদের প্লাষ্টার খসে পড়ে। কয়েকদিন আগে শেষ হওয়া এসএসসি পরিক্ষার সময় ছাদের প্লাষ্টার খসে এক ছাত্র আহত হয়েছিল বলে জানা গেছে। এ ব্যাপারে কক্সবাজার বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রাম মোহস সেন জানিয়েছেন, বিদ্যালয়ের ঝুকিপূর্ন ভবন নির্মানের জন্য বেশ কয়েকবার আবেদন করা হয়েছে। আশা করছি অতিদ্রুত সংস্কার কাজ শুরু হবে।
এদিকে বিগত ২০০৪ সালের গণপূর্ত অধিদপ্তর ঝুঁকিপূর্ণ চিহ্নিত করে বাজেয়াপ্ত ঘোষণা করে কক্সবাজার স্টেডিয়াম ভবন। তবুও এই ভবনে চরম ঝুঁকি নিয়ে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে স্টেডিয়াম কর্তৃপক্ষ। এ ব্যাপারে জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ স¤পাদক অধ্যাপক জসীম উদ্দিন বলেন স্টেডিয়াম ভবনের উপরের ছাদের বেশির ভাগ অংশ ভেঙ্গে পড়েছে। আমরা কোন ধরনের জোড়া তালি দিয়ে চলছি। ছাদে সামান্য রডের সাথে বাঁশও পাওয়া গেছে। অর্থাৎ যারা কাজ করেছে তারা ছাদে লোহার বদলে বাঁশ দিয়ে ঢালাই দিয়েছিল। তাই এই ভবনকে চরম ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
এদিকে বার্মিজ মার্কেট এলাকার হাজী বিল্ডিং চরম ঝুঁকির মধ্যে আছে বলে দাবি করেন ব্যবসায়ীরা। এ ব্যাপারে আলাপকালে প্রকৌশলী বদিউল আলম ও আবুল মঞ্জুর বলেন পুরু শহরে অসংখ্য ভবন ঝুঁকিপূর্ণ আছে এটা নিশ্চিত। যে কোন মুহূর্তে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। এজন্য প্রশাসনের উদ্যোগে এসব ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা করে কিছু আগাম প্রস্তুতি নেয়া দরকার। তাহলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমতে পারে।
এ ব্যাপারে কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী, অধ্যাপক অজিত দাশ, আইনজীবী জিয়া উদ্দিন, প্রকৌশলী কানন পালসহ সুশীল সমাজের দাবি দ্রুত প্রশাসনের উদ্যোগে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো চিহ্নিত করে তাদের সাথে বসে কারিগরিভাবে অথবা অন্যকোনভাবে তাদের সচেতন ও সহায়তা করা দরকার। এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক মো. রুহুল আমিন বলেন বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবশ্যই প্রশাসনের উদ্যোগে এ ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হবে।


সম্পাদনা: শামীম ইবনে মাজহার,নিউজরুম এডিটর

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।