‘মহাসেন’ আতংকে সোনাগাজী উপকুলের হাজার হাজার মানুষ

ঘূর্ণিঝড় মহাসেন যতই ঘনিয়ে আসছে ততই সোনাগাজীর উপকুলের মানুষের মাঝে বাড়ছে আতংক, উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা। সোনাগাজী সমুদ্র উপকুলীয় অঞ্চলের লোকজন ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় স্থানীয় প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবীদের দৃঢ় মনোবল থাকলেও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদির অভাবে তা অনেকটা হতাশ হওয়ার মত। উপকুলীয় অঞ্চলের দূর্যোগকালীন সময়ে আশ্রয় গ্রহণের জন্য নেই প্রয়োজনীয় সংখ্যক আশ্রায়ণ কেন্দ্র।
উপজেলা প্রশাসন, রেড ক্রিসেন্ট অফিস ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় মহাসেন যে কোন সময় উপকুলীয় অঞ্চলে ব্যাপকভাবে আঘাত হানতে পারে এমন সংকেত শোনার পর থেকে সোনাগাজী উপজেলা প্রশাসন, স্থানীয় রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিসহ বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের কর্মীরা দূর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। এছাড়াও গত সোমবার বিকেলে সোনাগাজী উপজেলা প্রশাসন কার্যালয়ে দূর্যোগ মোকাবিলার জন্য উপজেলা চেয়ারম্যান জেড, এম, কামরুল আনামের সভাপতিত্বে প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরকে দায়িত্ব দিয়ে কয়েকটি টীম গঠন করে মাঠে কাজ করার জন্য নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। দূর্যোগকালীন সময়ে সকল প্রকার সংবাদ আদান-প্রদান ও সহযোগিতার জন্য উপজেলায় দুটি কন্ট্রোল রুম ও ইউনিয়নে  ৩টি সাব কন্ট্রোল রুম বসানো হয়েছে। সভায় কমিটির সকল সদস্যদেরকে বর্তমানে ৪ নং সতর্ক সংকেত থেকে ৫, ৬, ৭ নং সংকেত ঘোষণা করা মাত্রই মাঠে গিয়ে কাজ করে উপকুলীয় অঞ্চলের জনগণকে নিরাপদে আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে নিয়ে আসার জন্য নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। এছাড়াও উপজেলা প্রশাসনের সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীর দূর্যোগকালীন সময়ে ছুটি বাতিল করা হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় উপকুলীয় অঞ্চলের লোকজনের জন্য জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে ত্রাণ সামগ্রী বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। সোনাগাজী উপজেলার সমুদ্র উপকুলীয় চরচান্দিয়া, চরদরবেশ, সোনাগাজী সদর ও আমিরাবাদ ইউনিয়নসহ উপজেলা ৯টি ইউনিয়নে ৫৭টি সাইক্লোন শেল্টার আশ্রায়ণ কেন্দ্র থাকলেও এর মধ্যে তিনটি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ৩৫টি আশ্রায়ণ কেন্দ্র ঝুঁিকপূর্ণ ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে গেছে। কয়েকটি আশ্রয় কেন্দ্র ভাল থাকলেও সেগুলোতে প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি নেই বললেই চলে। যার কারনে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সমুদ্র উপকুলীয় অঞ্চলের সকল প্রকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পৌর এলাকার সকল প্রতিষ্ঠানের প্রধানদেরকে দূর্যোগকালীন সময়ে প্রতিষ্ঠানের দরজা খোলা রেখে জনসাধারণকে আশ্রয় দিয়ে সহযোগিতা করার জন্য চিঠির মাধ্যমে জানিয়ে দেয়া হয়েছে। চরচান্দিয়া ইউনিয়নের ১৭ নং ইউনিট লিডার আবু সুফিয়ান জানান, তার ইউনিটের ১৫ জন সদস্য গতকয়েক দিনে প্রতিনিয়ত সমুদ্র উপকুলীয় অঞ্চলের লোকজনকে ঘূর্ণিঝড় মহাসেন সম্পর্কে মাইকিং করে, পতাকা উঠিয়ে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে, এমনকি দূরবর্তী বাড়িগুলোতে পায়ে হেঁটে গিয়ে সচেতন করে তুলছেন। এছাড়াও তার দলের বেশ কিছু সদস্যের দূর্যোগকালীন সময়ে চলাফেরার জন্য এবং উদ্ধার তৎপরতার কাজ চালানোর জন্য কোন প্রকার সরঞ্জামাদি নেই। শুধু তাই নয় তার কাছে একটি রেডিও, একটি হ্যান্ডমাইক ব্যতীত আর কিছুই নেই। সদর ইউনিয়নের ১৩ নং ইউনিট লিডার সফি উল্যাহ জানান, স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে ১৫ বছর কাজ করে রেড ক্রিসেন্ট থেকে কিছুই পায়নি। তার ইউনিটের জন্য একটি মাইক, একটি মেগাফোন, রেইনকোর্ট দেয়া হলেও সেগুলো অনেকটাই অকেজো হয়ে পড়েছে। রাত্রে চলাফেরার জন্য নেই লাইট ও গামবোর্ডের ব্যবস্থা নেই। রেডক্রিসেন্টের একজন স্বেচ্ছাসেবক জানান, ১০ জন পুরুষ ও ৫জন নারী নিয়ে একটি ইউনিট গঠন করা হয়। উপজেলায় ৯৬টি ইউনিটে ১৪শ’র অধিক স্বেচ্ছাসেবক রয়েছে। সম্প্রতি সাড়ে নয়শ’ স্বেচ্ছাসেবককে দূর্যোগ মোকাবিলায় প্রশিক্ষণ দেয়া হলেও সেখানে দূর্যোগ মোকাবিলার জন্য একটি ছাতা ব্যতীত আর কিছুই দেয়া হয়নি। পূর্বে  প্রতিটি ইউনিটের সাইকেল, হ্যান্ডমাইক, সাইরেন, রেডিও, টসলাইট, সংকেত প্রদানের জন্য পতাকা, রেইনকোর্ট , গামবোর্ড, ফাস্ট এইড বক্স ও উদ্ধার সামগ্রী দেয়া হতো। বিগত ১০ বছরে তাদেরকে আর কোন সরঞ্জামাদি দেয়া হয়নি। অপর দিকে সোনাগাজী উপজেলা রেডক্রিসেন্ট কার্যালয়ে দীর্ঘদিন থেকে জনবল সংকটে রয়েছে। একজন কর্মকর্তা, তিনজন কর্মচারির পদ থাকলেও বর্তমানে একজন কর্মকর্তা, একজন কর্মচারি ও অস্থায়ী ভাবে একজন লোক নিয়োজিত হয়ে গুরুত্বপূর্ণ বেতার বার্তা অপারেটরের কাজটি দীর্ঘ বার বছর ধরে চালিয়ে যাচ্ছেন। ছয় বছর যাবত নৈশ্যপ্রহরীর পদটি শূণ্য রয়েছে। আবহাওয়ার তথ্য আদান-প্রদানের রেডিও স্টেশনটি খুব ভাল নয়। বর্তমানে উপকুলীয় অঞ্চলের চারটি ইউনিয়নের দুই লাখেরও অধিক মানুষকে ঘূর্ণিঝড় বিপদসংকেত সম্পর্কে পতাকা উড়িয়ে মোবাইলফোনে মসজিদের মাইকেও, পায়ে হেঁটে বাড়ি বাড়ি গিয়ে জানানো হচ্ছে। উপজেলার চরখোন্দকার গ্রামের জেলেদেরকে সকল প্রকার মাছধরার ট্রলার ও নৌকাগুলোকে পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে আসা হয়েছে। দূর্যোগকালীন সময়ে দ্রুত স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের লক্ষ্যে উপজেলায় ৫টি ও ৯টি ইউনিয়ে ৯টি মেডিকেল টীম গঠন করা হয়েছে। চরচান্দিয়া ইউনিয়নের দক্ষিণপূর্ব চরচান্দিয়া গ্রাম ও চরখোন্দকার গ্রামে কোন আশ্রয় কেন্দ্র না থাকায় সে অঞ্চলে বসবাসকারী অর্ধলক্ষাধিক মানুষকে দুই কিঃ মিঃ দূরে গিয়ে দুর্যোগকালীন সময়ে অপর একটি আশ্রায়ণ কেন্দ্র কাম স্কুলে আশ্রয় গ্রহণ করতে হবে। এ ব্যাপারে উপজেলা রেডক্রিসেন্ট কর্মকর্তা মেছপা-উর-রশিদ জানান, দূর্যোগ মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় সকল প্রকার প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। অনেকগুলো সরঞ্জামাদির অভাবের বিষয়টি দ্রুত পুরণের জন্য উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট আবেদন পাঠানো হয়েছে। উপজেলা দূর্যোগব্যবস্থাপনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক উপজেলা প্রকল্পকর্মকর্তা মিন্টন দোস্তীদার জানান, দূর্যোগ মোকাবিলায় ইতিমধ্যে আমরা সকল প্রকার প্রস্তুতি গ্রহণ করে কাজ শুরু করে দিয়েছি। অতিরিক্ত দায়িত্বরত উপজেলা নির্বাহী অফিসার মনছুর উদ্দিন ও উপজেলা চেয়ারম্যান জেড, এম, কামরুল আনাম জানান, ঘূর্ণিঝড় মহাসেন মোকাবিলায় সোনাগাজী উপজেলা প্রশাসন সর্বাত্মক ভাবে প্রস্তুত রয়েছে। পূর্ব থেকেই স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে মাইকিং করে মসজিদের মাইকে, মোবাইল ফোনে এমনকি পায়ে হেঁেট উপকুলীয় অঞ্চলের জনগণকে নিরাপদ আশ্রয় গ্রহণের জন্য নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। সরেজমিনে আশ্রায়ণ কেন্দ্রগুলো পরিদর্শন করে আমরা সার্বক্ষণিক খোলা রাখার জন্য কেন্দ্রগুলোতে স্বেচ্ছাসবেক মোতায়েন করেছি। বিভিন্ন অঞ্চলের যোগাযোগ খারাপ হওয়ায় পূর্ব থেকেই তাদেরকে সচেতন করা হয়েছে।


সম্পাদনা: শামীম ইবনে মাজহার,নিউজরুম এডিটর

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।