মানবাধিকার বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য অগ্রহণযোগ্য: সুলতানা কামাল

হিউম্যান রাইটস ফোরাম (এইচআরএফ) বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন ও গুমের অভিযোগগুলো বিবেচনায় নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে শাস্তিপ্রদান সংক্রান্ত যেসব সুপারিশ জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের ১৬তম অধিবেশনে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে করা হয়েছে সেগুলো দ্রুততার সঙ্গে সম্পাদন করে জনসম্মুখে প্রকাশের দাবি জানিয়েছে।

সোমবার সকালে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) সংবাদ সম্মেলনে এই দাবি জানান ফোরামের সভাপতি সুলতানা কামাল। জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির পর্যালোচনা এবং মানবাধিকার ফোরাম বাংলাদেশের প্রতিক্রিয়া জানাতে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এসময় আরো উপস্থিত ছিলেন ফোরামের সদস্য ও ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন, স্টেপস’র নির্বাহী পরিচালক রঞ্জন কর্মকার।
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করে সুলতানা কামাল বলেন, “বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন ও গুমের ব্যাপারে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য অত্যন্ত হতাশাজনক ও অগ্রহণযোগ্য। তিনি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কর্তৃক যেকোনো ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার ক্ষেত্রে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন, কিন্তু দেশের অভ্যন্তরে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম ও নির্যাতনের যেসব অভিযোগ রয়েছে তা বাতিল করে দিয়ে এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটছে না বলে দাবি করেছেন, যা অগ্রহণযোগ্য।”
সুলতানা কামাল বলেন, “ফোরাম মনে করে তার এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি সত্যকে এড়িয়ে গেছেন। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিশেষত র‌্যাবের মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ কোনোভাবেই এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। আমরা দীর্ঘদিন ধরে এই ধরনের হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ করে সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়ে আসছি।”
প্রসঙ্গত, মানবাধিকার কাউন্সিলের ১৬তম অধিবেশনে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যালোচনার তিন ঘণ্টাব্যাপী ওই আলোচনায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি গত চার বছরের (২০০৯-২০১২) মানবাধিকার উন্নয়নে প্রথম ইউপিআর অধিবেশনে প্রদত্ত সুপারিশ ও অঙ্গীকারসমূহ বাস্তবায়নের অগ্রগতি ওসরকারের গৃহীত অন্যান্য কার্যক্রম তুলে ধরেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য উপস্থাপনের পর পারস্পরিক অংশগ্রহণমূলক আলোচনায় ৯৭টি দেশের প্রতিনিধি আগামীতে মানবাধিকার উন্নয়নের বিষয়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রায় ১৯৬ টি সুপারিশ দেন এবং তাদের বক্তব্যে কিছু কিছু ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অগ্রগতির প্রশংসা করেন।
সর্বোচ্চ সংখ্যক সুপারিশ এসেছে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, শ্রমিক অধিকার ও শ্রমিকদের নিরাপদ কাজের পরিবেশ নিশ্চিতকরণ, নারী ও শিশু অধিকার, নারীর প্রতি সহিংসতা রোধ, মানব পাচার প্রতিরোধ, আাদিবাসীদের অধিকার, পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সনদ স্বাক্ষর ও সংরক্ষণ তুলে নেয়া, মৃত্যুদণ্ড বিলোপ প্রভৃতি সংক্রান্ত।
এসবের মধ্যে বাংলাদেশ সরকার ১৬৪টি সুপারিশ গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশ সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী রাজনৈতিক বিবেচনায় স্পর্শকাতর ২৫টি সুপারিশ  বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে সরকার সময় নিয়েছে সেপ্টেম্বরের মানবাধিকার কাউন্সিলের অধিবেশন পর্যন্ত। অন্যদিকে সাতটি বিষয়ে সুপারিশ বাংলাদেশ সরকার প্রত্যাখান করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য মৃত্যুদণ্ড বিলোপ করা এং তা বিলোপের আগ পর্যন্ত সব ফাঁসি বন্ধ রাখা, সমকামিতাকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা না করা, রোহিঙ্গা শরণার্থীসহ বাংলাদেশ-মায়ানমার সীমান্তে অন্যান্যদের মানবিক সহায়তা প্রদানের জন্য সহায়তা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে অনুমতি প্রদান প্রভৃতি।
যেসব সুপারিশ গ্রহণ করতে সরকার রাজনৈতিক স্পর্শকাতরতার কথা বলে সময় নিচ্ছেন, সেগুলো দ্রুত গ্রহণ করে জনসাধারণের জন্য মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার দিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানায় এইচআরএফ।
ফোরামের সভাপতি বলেন, “মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারপ্রক্রিয়ার অগ্রগতির যে চিত্র সরকার তুলে ধরছে তাতে আমাদের ফোরাম সন্তোষ প্রকাশ করছে।  ১৯৭১ সালে যারা মানবতার বিরুদ্ধে জঘন্যতম অপরাধ করে দীর্ঘদিন ধরে বিচারের আওতামুক্ত ছিল, তাদের সেসব অপরাধের জন্য প্রচলিত আইন অনুযায়ী সুষ্ঠু বিচার ও শাস্তি হওয়া উচিত।”
এই বিচার প্রক্রিয়াকে রাজনীতির আওতামুক্ত রাখতে এবং বিচার প্রক্রিয়ার সর্বোচ্চ পর্যায়ের নিরপেক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতা ধরে রাখতে সব পক্ষের নিকট আবেদন জানায় মানবাধিকার ফোরাম।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে সুলতানা কামাল বলেন, “দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর যুদ্ধাপরাধের মামলায় সাক্ষী সুখরঞ্জন বালিকে গত বছরের ৫ নভেম্বর ট্রাইব্যুনাল চত্বর থেকে অপহরণের যে খবর গণমাধ্যমে প্রচার হয়েছিল, বিষয়টি নাকি সেরকম ছিল না। এর বেশি কিছু আমি জানি না।”
সংবাদ সম্মেলনে উদ্বেগ প্রকাশ করে এইচআরএফ সভাপতি বলেন, “মন্ত্রী দীপু মনি তার বক্তব্যে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সব নাগরিকের মানবাধিকার সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করেন। যদিও এই সংশোধনীতে ইসলামকে রাষ্ট্র ধর্ম হিসেবে রেখে দেয়ার মাধ্যমে রাষ্ট্রকে একটি ধর্মীয় পরিচয় প্রদানের পাশাপাশি অন্য ধর্মাবলম্বীদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকে পরিণত করা হয়েছে।”
তিনি বলেন, “মন্ত্রী আরো উল্লেখ করেছেন- এই সংশোধনীর মাধ্যমে সব নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীকে  সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো এই সংশোধনীতে আদিবাসীদের পৃথক জাতিসত্তার স্বীকৃতি দেয়া হয়নি, যার জন্য দীর্ঘদিন আদিবাসী নেতারা ও মানবাধিকার সংগঠনসমূহসহ মানবাধিকার ফোরাম বাংলাদেশ দাবি জানিয়ে আসছে।”
আইএলও কনভেনশন নং ১৬৯ স্বাক্ষর করা এবং আদিবাসী নারী ও শিশুদের সব ধরনের সহিংসতা ও নির্যাতন থেকে রক্ষা করতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করার ব্যাপারে যে দুটি সুপারিশ সরকারের বিবেচনাধীন রয়েছে সরকার সেগুলো গ্রহণ করে সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে বলে আশা প্রকাশ করে এইচআরএফ।
এছাড়া পার্বত্য শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নের অঙ্গীকারানুযায়ী সুনির্দিষ্ট ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণেও সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। আদিবাসীদের ভূমির অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি ভূমি কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে অতি শিগগির সবার জন্য গ্রহণযোগ্য একজনকে নিয়োগ দেয়ার দাবি জানায় মানবাধিকার ফোরাম।
সুলতানা কামাল বলেন, “পররাষ্ট্র মন্ত্রী ড. দীপু মনি মানবাধিকার উন্নয়নে/সুরক্ষায় তার বক্তব্যে সরকারের কাজের যে মূল্যায়ন তুলে ধরেছেন তার অনেক দিক নিয়ে আমাদের দ্বিমত রয়েছে। মানবাধিকার ফোরাম বাংলাদেশ মনে করে, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যে উদ্বেগসমূহ বিরাজ করছে সেগুলো দূর করতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা প্রত্যাখ্যান করার প্রবণতা পরিহার করা উচিত। বরং বাস্তবতাকে স্বীকার করে পদক্ষেপ গ্রহণ করলেই পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটবে। কেননা আমাদের সংবিধানের বাধ্যবাধকতা, আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার এবং বর্তমান মহাজোট সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলো’র সবক্ষেত্রে এসব মানবাধিকারকে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে এবং রক্ষার অঙ্গীকার করা হয়েছে।”

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।