গণতন্ত্র, দেশ ও জাতির স্বার্থে গণমাধ্যম ও সাংবাদিক নির্যাতন বন্ধ হওয়ার প্রয়োজন: এড: শাহজাহান

সংবাদপত্রকে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ (Fourth state) বলা হয়। খুব স্বাভাবিক ভাবেই বলা যায় সংবাদপত্র রাষ্ট্রের অত্যাবশ্যর্কীয় অঙ্গ। গণতন্ত্র ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য সংবাদপত্রের স্বাধীনতা অপরিহার্য। স্বাধীন মত প্রকাশের সুযোগ না থাকলে গণতন্ত্র অর্থহীন। বাংলাদেশে স্বাধীন মত প্রকাশের সুযোগ বাধাগ্রন্থ হচ্ছে।

বিশ্বের কাছে স্বৈরশাসকগণ সংবাদপত্রের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী নয়। তারা নিজেদের মতামত অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে দিতে চায়। অতীতের যে কোন সময়ের তুলনায় বাংলাদেশে স্বাধীন মত প্রকাশে চরম সংকট হচ্ছে। এ সংকটের প্রধান কারণ সাংবাদিক সমাজের অনৈক্য। স্বৈরাচার সব সময় সাংবাদিক সমাজকে বিভক্ত করে তাদের পায়দা লুটার চেষ্টা করে। সাংবাদিক সমাজ ঐক্যবদ্ধ হলে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা কেহ হরণ করতে সাহস পায় না। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর সংবাদপত্রের স্বাধীনতা কেড়ে নেয়া হয়েছে। তৎকালীন সরকার নিয়ন্ত্রিত ৩টি পত্রিকা রেখে বাকী সকল পত্রিকা বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। বহু ত্যাগের পর সংবাদ পত্রের স্বাধীনতা পুনরূদ্ধার করা হয়। কিন্তু ক্ষমতাসীন সরকার তার পরেও নিজেদের  স্বার্থে অন্যমতের মিডিয়া বন্ধ করার জন্য সব সময় চেষ্টা করেছে। বিশেষ করে ফখরুদ্দিন মইনুদ্দিন এর ১/১১ সরকার সংবাদপত্র ও গণমাধ্যমের উপর খড়গ হস্ত চালিয়েছে।

জনপ্রিয় টিভি চ্যানেল সিএসবি নিউজ চ্যানেল সহ কয়েকটি মিডিয়া বন্ধ করা হয়। বর্তমান আওয়ামী মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রথমেই এদেশের জনপ্রিয় টিভি ‘চ্যানেল ওয়ান’ বন্ধ করে দেয়। বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রচার করায় পরবর্তীতে দেশের বহুল প্রচারিত জনপ্রিয় গণমাধ্যম দৈনিক আমার দেশ পত্রিকা বন্ধ করে প্রেসে তালা লাগিয়ে দেয় সরকার। একই সময় এই পত্রিকার সম্পাদক সময়ের সাহসী কলম সৈনিক প্রকৌশলী মাহমুদুর রহমানকে মিথ্যা ভিত্তিহীন অভিযোগে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়। সবচেয়ে দূভার্গের বিষয় এই সম্পাদককে রিমান্ডে নিয়ে অমানবিক হয়রানী ও নির্যাতনের রেকর্ড সৃষ্টি করেছে সরকার। অসংখ্য মামলা দিয়ে আজ পর্যন্ত তাকে কারাগারে আটক রেখেছে সরকার। দেশের সকল শ্রেণী পেশার মানুষ মাহমুদুর রহমানের মুক্তির দাবীতে আন্দোলন করার পরও তিনি মুক্তি পায়নি। কারণ সাংবাদিক সমাজের অনৈক্য। গত ৫ মে ২০১৩ ঢাকায় হেফাজতে ইসলামের প্রোগ্রাম কভারেজ করার অপরাধে এদেশের জনপ্রিয় টিভি চ্যানেল ‘দিগন্ত টিভি ও ইসলামিক টিভি’ গভীর রাতে সাময়িক ভাবে বন্ধ করে দেয়। আজ পর্যন্ত ঐ টিভি চ্যানেল ২টি সম্প্রচারে আসতে পারছে না।

বর্তমান সরকারের আমলে রেকর্ড পরিমাণ গণমাধ্যম অনলাইন পত্রিকার টুর্টি চেপে ধরা হয়েছে। বহু সাংবাদিক হত্যা ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। আলোচিত ‘সাগর-রুনী’ সাংবাদিক দম্পত্তির নির্মম হত্যাকান্ডের বিচার আজ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি। শুধু জাতীয় পর্যায়ে নয় আঞ্চলিক ও স্থানীয় পর্যায়ের বহু পত্রিকা বন্ধ করা হয়েছে বর্তমান সরকারের আমলে। সরকারের নগ্ন হস্তক্ষেপের কারণে মিডিয়ার হাজার হাজার কর্মী পথে বসার উপক্রম হয়েছে। সাংবাদিক সমাজ জীবনের ঝুকি নিয়ে সংবাদ সংগ্রহ করে। তাদের প্রতি সকলের দায়িত্ব রয়েছে। গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রনের অংশ হিসেবে আওয়ামী সরকার বিটিভি’র সংবাদ সকল টিভি চ্যানেলে প্রতিদিন প্রচারে বাধ্য করেছে। সরকার গণমাধ্যম ও সাংবাদিক নিয়ন্ত্রণের জন্য গণমাধ্যম নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। যা সংবাদপত্রের স্বাধীনতা চরমভাবে খর্ম করেছে।

সংবাদপত্র ও সাংবাদিক নির্যাতনের চাঁদপুরের চিত্র ব্যতিক্রম নয়। বিগত ৫ আগষ্ট ২০০০ পেশাগত দায়িত্ব পালন করে চাঁদপুর শহরের বায়তুল আমিন জামে মসজিদে নামাজ শেষে বের হওয়ার পরে মসজিদ গেইটে ছাত্রলীগ সন্ত্রাসীদের হামলায় গুরুত্বর আহত হন দৈনিক সংগ্রামের চাঁদপুর জেলা প্রতিনিধি ও চাঁদপুর প্রেসকাব সদস্য এডভোকেট শাহজাহান মিয়া। ঘটনার পর চাঁদপুর প্রেসকাবের তৎকালীন সদস্য এডভোকেট ইকবাল বিন বাশারের নেতৃত্বে সদর হাসপাতালে এডভোকেট শাহজাহান মিয়াকে দেখতে যান বিভিন্ন শ্রেণী ও পেশার মানুষ । এ ঘটনার সুষ্ঠ বিচার দাবী করে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের নিকট প্রেসকাব নেতৃবৃন্দ স্বারকলিপি প্রদান করে। কিন্তু প্রশাসন একটি জিডিএন্টি পর্যন্ত করেনি। এরি ধারাবাহিকতায় চাঁদপুরে বিভিন্ন সময়ে সাংবাদিক নির্যাতনের কোন ঘটনার বিচার হয়নি। রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় ডিকারেশান বাতিল করা হয়েছে দৈনিক আমার চাঁদপুর পত্রিকার। এখনো পর্যন্ত আইনী লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে পত্রিকা কর্তৃপক্ষ। গত ২৩ অক্টোবর চাঁদপুর বাসষ্ট্যান্ডে পেশাগত দায়িথ্ব পালনের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (হেডকোয়াটার) এবং এসআই রাজিব আল রশিদৈর নেতৃত্বে দৈনিক চাঁদপুর দিন্তের চীফ রিপোর্টার সাংবাদিক এম ইদ্রিস খানের উপর অকথ্য নির্যাতন করে। একই সময় পুলিশ এই সাংবাদিকের ক্যামেরা ভাংচুর করে। দেশের বিভিন্ন স্থানে সরকারী দল ও পুলিশের সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। সর্বশেষ গত শুক্রবার ভোর রাতে বিএনপি’র কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে দলের যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীকে সশস্ত্র সন্ত্রাসী কায়দায় পুলিশ গ্রেফতার করে। একই সময় পুলিশ ও ডিবি সদস্যরা অফিসের বিভিন্ন কক্ষে ভাংচুর ও তান্ডব চালায়। এই ঘটনার ছবি তুলতে গেলে সময় টিভি, ৭১ টিভি সহ বেশ কিছু গণমাধ্যমের সিনিয়র সাংবাদিককে পুলিশ অকথ্য নির্যাতন চালায় এবং তাদের ক্যামেরা ভাংচুর করে। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর এ ধরনের নগ্ন হামলা অহরহই ঘটে। কিন্তু আজ পর্যন্ত কোন সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনার সুষ্ঠ বিচার হয়নি।

সম্প্রতি চাঁদপুরেও রাজনৈতিক দলের, কর্মসূচী চলাকালে সাংবাদিকের উপর হামলা হয়েছে। এসব হামলার ঘটনায় পুলিশের কয়েকটি মামলাও হয়েছে। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হামলায় সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনায় ১টি মামলাও হয়নি। তাহলে পুলিশের অন্যায় অত্যাচার সাংবাদিক সমাজ শুধু নিন্দা জানিয়ে শান্ত হবে? সাংবাদিক গণ কোন দলের নয়। তারা দেশ ও জাতির কল্যাণে সংবাদ প্রকাশ করে। সাংবাদিকগণ সকলের সংবাদ সংগ্রহ ও পরিবশেন করে। তাদের উপর কোন ধরনের হামলাই কাম্য নহে। সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দল ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে এ ব্যাপারে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। একই সাথে বন্ধ করা সকল মিডিয়া খুলে দেয়ার আহ্বান জানাই। কারাগারে আটক সকল সাংবাদিক ও মানবাধিকার ব্যক্তিদের মুক্তি, একই সাথে সাংবাদিক হত্যা ও নির্যাতন প্রতিরোধে সকলকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানাই।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।