মানুষের দীর্ঘশ্বাস দেশ কোন দিকে যাচ্ছে

অনেক সময় পর্যন্ত একটা গাড়ীর জন্য রাস্তায় অপেমাণ মানুষ দীর্ঘশ্বাস ফেলছে,শুধু তার গন্তব্য যাওয়ার জন্য। বলছে, এভাবেতো আর মানুষ চলতে পারে না। অবরোধের কবলে পড়া মহাসড়কে কান্ত মানুষ হাহাকার করে বলছে, গোটা জেলাটা তার কাছে এখন অচেনা মনে হচ্ছে। সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক, দোকানদার, ছাত্র, শিক, চাকুরিজীবী, দিনমজুর যাকেই প্রশ্ন করা হয়, জবাব ফেরায়,দেশের পরিস্থিতি ভালো না।

৩ দফা টানা হরতাল, ২ দফা অবরোধের পর গত শনিবার থেকে বাংলাদেশ আটকা পড়েছে টানা ৬ দিনের অবরোধে আবার আগামী শনিবার থেকে মঙ্গলবার পর্যন্ত ৭২ ঘন্টা অবরোধ। এরপর বিরোধী দলের কী কর্মসূচি আসছে, কেউ জানেন না। শহরের একটি নামকরা খাবারের দোকান। নিয়ম করে খোলা থাকে রাত ১১টা পর্যন্ত। শুক্র-শনিবার বাঁধা সময় গড়ায় রাত ১২টা। গত কাল থেকে ছিল এর ব্যতিক্রম। ছুটির দিনটিও বিরোধী জোটের ডাকা আকস্মিক অবরোধের ফাঁদে আটকা পড়ে সব। তাই আগে করে রাখা অনেক পরিকল্পনা ভেস্তে যায় সাধারণ মানুষের। নতুন করে আতঙ্ক-উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। রাত পৌনে ৯টা। বিস্তৃত পরিসরের ওই দোকানটিতে তখন মাত্র দুজন গ্রাহক। দোকানের সদর দরজায় জোরদার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। সব আয়োজন গুটিয়ে ফেলার তৎপরতাও ল করা গেল। আগেভাগেই দোকান বন্ধের আয়োজন কেন? প্রশ্ন করতেই ব্যবস্থাপক উৎকণ্ঠা মেশানো গলায় জবাব দেন, বুঝতেই পারছেন, দেশের পরিস্থিতি ভালো নয়। আর কাস্টমারও আসছে না। অবস্থা এমন, বিদ্যুত খরচও উঠবে না। ভাড়ায় চলা নোহা গাড়ীর চালক মিজান। গ্রামের বাড়ি টেকনাফ। পরিবারের সঙ্গে থাকেন কক্সবাজার শহরে। হরতাল আর অবরোধের ধকলে নাকাল অবস্থা তার। বললেন, আর কয়দিন এভাবে চলতে থাকলে আমাদের না খেয়ে মরতে হবে। পাড়ার মুদি দোকানদার কামাল। ওষুধ ব্যবসায়ী মুজিব। দেখা হলেই জানতে চান, পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে? নির্বাচন কি হবে? বিএনপি কি নির্বাচনে অংশ নেবে? খোলাসা করে কোনও জবাব দেওয়া যায় না তাদের প্রশ্নের। তবে সব কথার শেষ কথা সবাই বলে দেন, দেশের পরিস্থিতি আসলেই ভালো নয়। হরতাল-অবরোধে হাতে জীবন নিয়ে সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালকরা রাস্তায় নামেন। অবরোধের সময় কক্সবাজার শহরকে ভুল করে সবুজ রঙের অটোরিকশা,টমটম ও রিক্্রার শহর মনে হতে পারে। হরতাল-অবরোধের ফাঁকা সড়কে পাল্লা দিয়ে ছোটা কজন অটোরিকশা ও টম টম চালকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, নিতান্তই পেটের দায়ে পথে নামছেন তারা। বোমা আর আগুনে পুড়িয়ে মারার খবরও তাদের কাছে আসে। চালকের ওপর গানপাউডার, পেট্রলবোমা মেরে জ্বালিয়ে দেওয়ার দৃশ্য টেলিভিশনে দেখে আঁতকে উঠেন শিকার না হওয়া চালকদের পরিবারের সদস্যরা। মোবাইল ফোনে বারবার সতর্ক করে দেন প্রিয় স্বজনকে। কুতুবদিয়া থেকে সকালে ফোন করে সিএনজিচালিত অটোচালক ছেলে জসিমকে সতর্ক করেন বৃদ্ধ মা। ছেলে দোয়া চান মায়ের কাছে। বলেন, তোমরাও সাবধানে থেকো, দেশের অবস্থা ভালো নয়। ঢাকায় চট্রগ্রাম থেকে যাত্রা করা একজন সংবাদকর্মী ফোনে বিদায় নেন এমন ভঙ্গিতে, যেন এটাই শেষ বিদায়। অবরোধকারীরা যেভাবে রেলের ওপর চড়াও হয়েছে, তাতে যে-কোনও সময় হুমড়ি খেয়ে পড়তে পারে যাত্রীবোঝাই ট্রেন। এ রকম ঘটনা ঘটছে প্রায় প্রতিদিন। ওই সংবাদকর্মী জানান, ট্রেনের ভেতর যার সঙ্গে কথা হয়, তার চেহারায় আতঙ্কের ছাপ। নিজের দেশেই সব অচেনা, অজানা মনে হয়। কেউ কাউকে বিশ্বাস করতে পারছেন না। সবাই ভাগ্যের হাতে নিজেকে ছেড়ে দিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলছেন আর বলছেন, জানি না, কী হবে!

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।