রাজনৈতিক অস্থিরতায় দেশে নিরব দুর্ভিক্ষ কক্সবাজার দিয়ে মানুষ ছুটছেন সাগর পথে মালয়েশিয়ায়

#পাসপোর্ট ভিসা ছাড়ায় মালয়েশিয়া# যাত্রীদের তালিকায় নারী-পুরুষ, শিশু ও বৃদ্ধরা # উত্তরবঙ্গ এবং রোহিঙ্গা যাত্রীদের সংখ্যাও কম না# প্রশাসন ব্যস্ত রাষ্ট্রীয় অভ্যন্তরীন কাজ নিয়ে # দালাল চক্র পোয়াবারো

চলমান অব্যাহত রাজনৈতিক সহিংসতায় কক্সবাজারের সাধারণ মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। ক’মাস আগেও জেলার যেসব জনগোষ্ঠী অর্থনৈতিকভাবে মাঝারি শ্রেণীতে ছিলেন, অর্থ ও রোজগারের অভাবে ক্রমেই তারা এখন নেমে এসেছেন দারিদ্রসীমার নিচে। ফলে জেলার ৮ উপজেলা জুড়ে বিরাজ করছে নিরব দুর্ভিক্ষ। কেউ শিকার করুক আর নাই করুক, বাস্তবতা তা প্রমাণ করে দিচ্ছে । কারণ রাজনৈতিক অস্থিরতা, অবরোধ, হরতাল ও নাশকতার কারনে কক্সবাজারের সাধারণ জনগোষ্ঠীর অনেকেই বর্তমানে তিন বেলা পেট ভরে খেতে পারছেন না। এই অবস্থায় নিজেদের ভাগ্য বদলে হতাশ সাধারণ জনগণ টেকনাফ-কক্সবাজারের বিভিন্ন জল সীমানা দিয়ে কাঠের নৌকায় পাড়ি জমাচ্ছেন সুদূর মালয়েশিয়ায়।
পাসপোর্ট ভিসা ছাড়াই স্বল্প সময়ে মালয়েশিয়ায় পৌঁছে তারা নিজেদের পরিবারে ফিরিয়ে আনবেন স্বচ্ছলতা। থাকবে না আর কোন অভাব। দালাল চক্রের এমন মন ভোলানো  রঙ্গিন স্বপ্নে বিভোর হয়ে সাগর পথে মালয়েশিয়া যাত্রীদের বেশির ভাগই জানেন না, আদৌ তারা স্বপ্নের মালয়েশিয়ায় পৌছবেন না কি? থাইল্যান্ড কিংবা অন্য কোথাও গিয়ে নিজেদের স্বপ্নের সমাপ্তি ঘটবে!

কিন্তু উপায় নেই, না খেয়ে-ুধা যন্ত্রণায় বেঁচে থাকা অথবা নিজের প্রিয় জন্মভূমিতে এমন অস্থিরতা চোখ বুঝে সহ্য করার চেয়ে সাগরে মরে যাওয়াই অনেকটা ভাল, ঠিক এমন মনোভাবে সাগর পথে মালয়েশিয়া যাত্রীর সংখ্যা দিন দিন দীর্ঘ হয়ে পড়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মাসের পর মাস ধরে কক্সবাজার-টেকনাফ ও জেলার বিভিন্ন সাগর পয়েন্ট দিয়ে কাঠের নৌকায় করে মালয়েশিয়াগামীদের দুরাতœ বেড়েই চলছে। পাশা-পাশি দালাল চক্ররাও সক্রিয়। সাম্প্রতিক সময়ে প্রতি রাতেই হাজার হাজার দরিদ্র বাংলাদেশিরা পাড়ি জমাচ্ছেন মালয়েশিয়ায়। এই যাত্রীর সাথে যোগ দিয়েছে মিয়ানমার থেকে ধেয়ে আসা কিছু রোহিঙ্গা, উত্তরবঙ্গের মঙ্গা কবলিত এলাকার অভাবগ্রস্ত নারী-পুরুষ ও শিশুরা। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, সাম্প্রতিক সময়ে কাঠের নৌকায় প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে মালয়েশিয়াগামীদের মধ্যে এমন এমন পরিবারও রয়েছে যারা কুলের শিশু ও পরিবারের সবচেয়ে বৃদ্ধ স্বজনটিকে নিয়ে যাচ্ছেন অনিশ্চিত মালয়েশিয়া যাত্রায়। সাগরে পথে মালয়েশিয়াগামী কয়েকজনের সাথে আলাপে জানা গেছে, দালালরা তাদের জানিয়েছে, ৫ দিন ৫ রাত যাত্রা করলেই তারা থাইল্যান্ড পৌঁছবেন। আর সেখানে গিয়ে দালালদের সাথে চুক্তি মতো টাকা পরিশোধ করলেই তারা থাইল্যান্ড থেকে যানবাহনযোগে যাত্রীদের মালয়েশিয়ায় পৌঁছিয়ে দিবেন। আর আশ্চর্য্যজনক বিষয় হচ্ছে, এই ৫ দিন ৫ রাত কিংবা সাগর পথে যতদিন তারা যাবেন এর মাঝে ভারি কোন খাবারের কোন বন্দোবস্ত নেই। শুধু শুকনো খাবার আর পানি খেয়ে সময়টুকু কাটাতে হবে হতভাগ্য এসব যাত্রীদের।
শুনতে অমানবিক ও পিলে চমকানো খবর হচ্ছে, রাত-দিন অনবরত সাগর যাত্রায় কেউ বমি করলে অথবা অন্য কোন ভাবে অসুস্থ হয়ে পড়লে সুস্থ যাত্রী ও নৌকার মাঝিমাল্লাদের কেউই তার দিকে ফিরে তাকাবে না, তাকে সাগরেই নিক্ষেপ করে বাকিরা চলে যাবেন নিরাপদে।

টেকনাফ থানার ওসি মোহাম্মদ ফরহাদ জানিয়েছেন, সাগর পথে মালয়েশিয়া যাত্রীদের গুটি কয়েক মালয়েশিয়ায় পৌঁছতে পারলেও তিনি যতটুকু জানেন বেশি ভাগই থাইল্যান্ড কিংবা অন্য কোন দেশে গিয়ে ভয়াবহ বিপদের মুখোমুখি হন। তাদের কারোর ভাগ্যে জেল আবার কারোর ভাগ্যে দালালের অত্যাচার আর কারো ভাগ্য জুটে অকাল মৃত্যু। তাই সরকারের পক্ষ থেকে পুলিশ, বিজিবি ও নৌবাহিনী সব সময় তৎপর মালয়েশিয়া যাত্রার নামে এই মরণ যাত্রীদের যেভাবেই হোক প্রতিরোধ করতে। কিন্তু দুর্ভাগ্য প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে বাংলাদেশিরা কেন চুরি করে হরদম মালয়েশিয়া যাচ্ছেন, তা তার বোধগম্য হচ্ছে না বলে জানিয়ে টেকনাফের ওসি আরো জানান, সাগর পথে আদম পাচারকারীদের বিরুদ্ধে টেকনাফ থানায় নিয়মিত মামলা হচ্ছে-আটকও কম হচ্ছে না। পুলিশ সবসময় তৎপর এই পথে যাত্রীদের রুখে দিতে।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তোফায়েল আহমেদ জানান, টেকনাফসহ জেলার সকল থানার পুলিশ অপরাধ নির্মূলের পাশাপাশি মালয়েশিয়া যাত্রীদের আটকে সবসময় তৎপর। তবুও কেউ চুরি করে চলে গেলে পুলিশ কিংবা প্রশাসনের কি আর করার আছে বলে জানিয়ে উক্ত অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আরো জানান, এ ব্যাপারে সামাজিক সচেতনতা না আসা পর্যন্ত পুলিশ কিংবা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্ম্পূন্ন ভাবে সমুদ্র পথে মালয়েশিয়াগামীদের আটকিয়ে রাখা যাবে না। কারণ তাদের এক পথ দিয়ে প্রশাসন আটকিয়ে রাখলে শোনা যায় ক’দিন পর সাগর পথে মালয়েশিয়াগামীরা ঠিকই আরেক পথ দিয়ে চলে গেছে।

এদিকে বিজিবি, পুলিশ ও নৌবাহিনীর এত কড়াকড়ির পরও সাগর পথে মালয়েশিয়াগামীরা কেন থামছেন না, এ সংবাদের পেছনের খবর নিয়ে জানা গেছে- তথ্য একটাই দেশে অভাবের যন্ত্রণা সইতে না পেরে বিদেশে গিয়ে টাকা রোজগারের লোভ। শুধু তাই নয়, রাজনৈতিক সহিংতায় সাগর পথে মালয়েশিয়া যাত্রীদের সাথে এবার নাকি যোগ দিয়েছে পুলিশের গ্রেপ্তার এড়াতে বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীরাও। ফলে পাসপোর্ট ভিসা ছাড়াই টেকনাফ-কক্সবাজার জলসীমা দিয়ে এখন প্রতিদিন যতসব লোক সাগর পথে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমাচ্ছেন অনুসন্ধানে জানা গেছে, তত বাংলাদেশি লোক বৈধভাবে দেশের আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরগুলো দিয়েও বিদেশ যাচ্ছেন না।

সূত্র জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে সাগর পথে মালয়েশিয়া যাত্রীদের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার পেছনে আর একটি প্রধান কারণ হচ্ছে, আইন শৃঙখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা হরতাল ও দেশের অভ্যন্তরিণ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে ব্যস্ত। তাই তারা আগের মতো সীমানাগুলো পাহারা দিতে পারছেন না। এ সুযোগটি কাজে লাগিয়ে দালাল চক্র হরদম চালিয়ে যাচ্ছে এই ব্যবসা।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।