কক্সবাজারে পিকেটারদের দাপটে প্রশাসন অচল, পুলিশ জনতা সংঘর্ষে, ৪ পুলিশসহ আহত ৩০

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারী জেনারেল ও বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা কাদের মোল্লাকে ফাঁসি দেয়ার ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদে কক্সবাজার শহরে বিশাল বিক্ষোভ মিছিল, সড়ক অবরোধ ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। কক্সবাজার শহর জামায়াতের আমীর অধ্যাপক আবু তাহের চৌং এর সভাপতিত্বে উক্ত সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জেলা জামায়াতের সেক্রেটারী সাবেক ছাত্র নেতা জি.এম রহিমুল্লাহ।
উক্ত কর্মসূচী সমূহে কক্সবাজার জেলা সেক্রেটারীসহ নেতৃবৃন্দ ও জনতা রাস্তায় শুয়ে পড়ে সড়ক অবরোধ করা সহ শহরের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট হাজার হাজার জনতার অংশ গ্রহণে পুরো কক্সবাজার শহর অচল হয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে এতে পুলিশ শত শত গুলি ও টিয়ার গ্যাস ছুড়েও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ আনতে সম্পূর্ণ  ব্যর্থ হয় এবং অসহায় হয়ে পড়ে। পরবর্তিতে র‌্যাব, বিজিবি এসে পরিস্থিতি শান্ত করার আপ্রাণ চেষ্ঠা চালিয়ে যায়, কিন্তু  জনতার গণবিষ্ফোরণকে কিছুতেই দমাতে পারেনি। দুপুর ৩টার দিকে জামায়াত নেতৃবৃন্দ এসে জনগণকে শান্ত করে।

কাদের মোল্লা মুক্তি মঞ্চ: জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুক্তিযোদ্ধা আবদুল কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর চেষ্টার প্রতিবাদে কক্সবাজারে অবস্থান ধর্মঘট পালন করেছে আবদুল কাদের মোল্লা মুক্তি মঞ্চ।
কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে হরতালের তৃতীয় দিন ১১ডিসেম্বর বুধবার ভোর থেকে শহরের প্রধান সড়কসহ অন্তত ডজনাধিক স্পটে সড়ক অবরোধ করে রাখে আবদুল কাদের মোল্লা মঞ্চ সমর্থকরা।
এ আন্দোলন পরিণত হয়েছে গণ বিক্ষোভে। ছড়িয়ে পড়েছে পুরো শহর জুড়ে। “নারায়ে তাকবীর-আল্লাহু আকবার” সহ নানা শ্লোগানে মুখরিত করে তোলে পুরো মঞ্চ এলাকার পরিবেশ।
এদিকে আবদুল কাদের মোল্লা মুক্তি মঞ্চের মুখপাত্র জননেতা সাইদুল আলম জানান, তারা শান্তিপূর্ণভাবে সড়কে অবস্থান করবেন- যতক্ষণ না তাদের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের মুক্তি হয়েছে। এ মঞ্চে সংহতি জানিয়ে অংশগ্রহণ করেছে খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে ছাত্র, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, পেশাজীবি, শান্তি ও মুক্তিকামীসহ সর্বস্তরের জনসাধারণ।
এতে মানুষের ব্যাপক সাড়া মেলেছে এমনটিই দাবি করে কাদের মোল্লা মুক্তি মঞ্চের অন্যতম সংগঠক ও ছাত্রনেতা জাহেদুল ইসলাম নোমান বলেন, বেলা যত বাড়ছে মানুষের ভিড়ও ততবেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অন্যদিকে জনতার শান্তিপূর্ণ সমাগম দেখে গণ প্রতিরোধ এড়াতে দূরত্ব অবস্থান বজায় রেখে নজরদারি চলছে আইন শৃংখলা বাহিনীর এমন প্রতিক্রিয়া প্রত্যক্ষদর্শীদের।

খরুলিয়ায় পুলিশ-পিকেটার একসাথে ভূরিভোজ: কক্সবাজারে হরতাল চলাকালে খরুলিয়ায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে রাত ১টা থেকে গতকাল বুধবার বিকেল ৩টা পর্যন্ত অবরোধ করে রাখে। জনতার বিুব্ধ উপস্থিতি দেখে অতিরিক্ত পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি ঘটনাস্থলে গিয়ে ফিরে আসতে বাধ্য হয়। এমনকি স্থানীয় নারী, পুরুষ, আবাল বৃদ্ধ বনিতা সবাই একসাথে রাস্তায় নেমে আসে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে গতকাল দুপুরে টহল পুলিশ সাধারণ জনগনের কাতারে নেমে আসতে দেখা গেছে। এমনকি তারা সেখানে একসাথে ভূরিভোজও করেছে। বেশ কজন পুলিশ সদস্য পিকেটারদের সাথে দুপুরের খাবার এক সাথে সেরে নিতে দেখা গেছে। হাঁড়ি-পাতিল নিয়ে অনেকেই রাস্তার পাশে রান্না-বান্না করে। সেখানে নেতৃত্ব দেন তারেক বিন মোকতার, সিরাজুল হক নিজামী, শ্রমিক নেতা আয়াতুল্লাহ, শরীফ উদ্দিন, সাইফুল বিন মোকতার, ফয়সাল, শিবির সদর সভাপতি শাহজাহান, স্থানীয় মেম্বার আনু, মাস্টার রফিক, জামায়াত নেতা মুহিবউল্লাহ, হাজি মো. ইসহাক, মেম্বার মোস্তাক, সেলিম উদ্দিনসহ প্রমূখ নেতৃবৃন্দ।
এদিকে নির্দোষ মজলুম জামায়াতনেতা আবদুল কাদের মোল্লার প্রশ্নবিদ্ধ বিচারের মৃত্যু পরোয়ানা জারির প্রতিবাদে জামায়াত আহুত সকাল-সন্ধ্যা হরতালের তৃতীয় দিনে সমগ্র জেলাজুড়ে পিকেটিং, মিছিল-সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। রায় কার্যকর করার ঘোষণার সাথে সাথে কক্সবাজার শহর, চকরিয়া, খরুলিয়া, উখিয়া, টেকনাফ, ঈদগাঁওসহ জেলার বিভিন্নস্থানে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীরা। হরতালের তৃতীয় দিনে ভোর থেকেই রাস্তায় অবস্থান নেয় । সকাল ৯টায়  কক্্সবাজার শহর জামায়াতের উদ্যোগে ফজল মার্কেট চত্ত্বর থেকে বিশাল বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। শহর জামায়াতের আমীর অধ্যাপক আবু তাহের চৌধুরীর নেতৃত্বে মিছিলটি প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে বড়বাজার এলাকায় সমাবেশে মিলিত হয়। সমাবেশের এক পর্যায়ে বিক্ষোব্দ নেতাকর্মীরা প্রধান সড়কে শুয়ে পড়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। মিছিলোত্তর সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি জিএম রহীমুল্লাহ। শান্তিপূর্ণ ও স্বত:স্ফূর্তভাবে সমাবেশ শেষ হওয়ার প্রায় ঘণ্টাখানেক পর আইনশৃংখলাবাহিনীর সাথে সাধারণ জনতার সংঘর্ষ হয়। এসময় পুলিশ শতাধিক রাউন্ড গুলি ছুঁড়ে। এতে ২০ জন পথচারী আহত হয়। পরে জামায়াত ও শিবির নেতৃবৃন্দের উদ্যোগে  পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনে।

ঈদগাঁও থানা : সদর উপজেলার ঈদগাঁওতে রাত্রে রায় কার্যকরের ঘোষণা শোনার সাথে সাথে হাজার নেতাকর্মী বিক্ষোভ প্রদর্শন করে কক্্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করে। হরতালের তৃতীয়দিনে ভোর থেকে ঈদগাঁও বিভিন্ন এলাকা থেকে মিছির সহকারে ঈদগাঁও বাজারে সমবেত হয়। সকাল ৯ টায় হাজার হাজার নেতাকর্মী বাজার থেকে মিছিল শুরু করে আলমাছিয়া সড়ক, কবি নুরুল হুদা সড়ক প্রদক্ষিণ করে বেলা ১২ টায় স্টেশন চত্ত্বরে সমাবেশে মিলিত হয়। এসময় সকল দোকান-পাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল। রাস্তায় কোন ধরণের যানবাহন চলেনি। ঈদগাঁও থানা আমীর ডা. আমীর সোলতানের সভাপতিত্বে বিক্ষোভ মিছিলোত্তর সমাবেশে বক্তব্য রাখেন শিবির সভাপতি লায়েক বিন ফাজেল, থানা জামায়াত সেক্রেটারি মাওলানা সলিম উল্লাহ জিহাদী, জামায়াতনেতা মফিজুর রহমান, মাষ্টার নজির, নুরুল হুদা, কাজী সিরাজ, ফাজেল ইবনে শরীফ, শিবির সেক্রেটারি লুৎফুর রহমান, রেজাউল হুদা বাবু,  জামায়াতনেতা হারুণ, হেলাল উদ্দিন, আতাউল্লাহ, ইউছুপ প্রমুখ।

হরতালে জনমানবহীন উখিয়া-টেকনাফ: উখিয়াতে হরতাল উপল্েয থাইংখালি থেকে কোর্টবাজার পর্যন্ত একাধিক জায়গায় গাছ ফেলে অবরোধ করে রেখেছে এবং সফল হরতাল পালন করেছে। হরতাল অবরোধ সফল করার লক্ষে সকালে বিশাল সমাবেশ ও মিছিল করেছে জামায়াত শিবিরের নেতাকর্মীরা। একই সময় উখিয়ার থাইংখালীতে হরতালকারীদের উপর পুলিশ টিয়ার শেল নিপে করে। তারই জের ধরে অবরোধ এবং হরতালকারীরা পুলিশের গাড়িতে হামলা চালায়। বিকেলে কোর্ট বাজার চত্ত্বরে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। হাজার হাজার জনতার উপস্থিতিতে এসমাবেশে বক্তব্য রাখেন উপজেলা আমীর মাওলানা আবুল ফজল, শ্রমিক নেতা শাহ আলম ও ছাত্রনেতা আব্দুর রহিম।
এদিকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে হরতাল এবং অবরোধ কর্মসূচি পালন করায় জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও কক্সবাজার জেলা আমীর মুহাম্মদ শাহজাহান ও জেলা সেক্রেটারি জিএম রহিমুল্লাহ জেলাবাসীকে অভিনন্দন জানিয়ে এক বিবৃতিতে বলেন, সরকার একদিকে প্রশ্নবিদ্ধ রায় কার্যকর চেষ্টার মাধ্যমে জামায়াত নেতাদের হত্যার ষড়যন্ত্র করছে। অন্যদিকে শান্তিকামী মানুষের গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে স্তব্ধ করে দিতে পুলিশ লেলিয়ে দিচ্ছে। নেতৃদ্বয় আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালনের আহবান করে বলেন, আপনারা জনগণের জানমালের নিরাপত্তা রক্ষার সেবক। আপনারা সন্ত্রাসী বাহিনীতে পরিণত হবেন না। অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসবেন- জাতি আপনাদের কাছ থেকে এটাই প্রত্যাশা করে। নেতৃবৃন্দ আজ জামায়াতের ডাকা চতুর্থ দিনের হরতাল ও ১৮ দলের তৃতীয় দফার ৬ষ্ঠ দিনের অবরোধ কর্মসূচি সর্বাত্মকভাবে সফল করে তোলতে সর্বস্তরের জনতাকে এগিয়ে আসার আহবান জানান।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।