টেকনাফ ৫০শয্যা হাসপাতালে ১০৮টি পদ শূণ্য

কক্সবাজারের সীমান্ত উপজেলা টেকনাফে হেল্থ সেক্টর অনুমোদিত ১৭৯টি পদে ৫০শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালে বর্তমানে ১০৮টি পদই শূণ্য রয়েছে। ১জন সহকারী সার্জন গত ৮মাস ধরে লাপাত্তা, ১জন জুনিয়র কনসালটেন্ট ও ১জন ডেন্টাল সার্জন দীর্ঘদিন ধরে ডেপুটেশনে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কর্মরত, ২৯জন ডাক্তারের মধ্যে ২১টিই শূণ্য, নবসৃষ্ট পদসহ ২য় শ্রেনীর ১৬টি পদে নার্সিং সুপারভাইজার ও সিনিয়র স্টাফ নার্সসহ ১৩টি পদ শূণ্য, ৩য় শ্রেনীর ৮৬টি পদে কাগজে-কলমে ৫১জন কর্মরত থাকলেও ১জন সাময়িক বরখাস্ত ও ৩জন ভিন্ন উপজেলায় কর্মরত, ৪র্থ শ্রেনীর ২৪টি পদের ১৬টিই শূণ্য, সেন্টমার্টিনদ্বীপের উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্র ও ১০শয্যা হাসপাতালে আউট সোর্সিংসহ মোট ২৪টি পদে কর্মরত আছেন মাত্র ১জন এমএলএসএস- এই হচ্ছে পর্যটন শহর ও রোহিঙ্গা অধ্যুষিত টেকনাফের ৫০ শয্যা হাসপাতালের প্রকৃত জনবল চিত্র।

এরমধ্যে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ৭১জন। ফলে জনগুরুত্বপূর্ণ এই সেবা খাতে অতি জরুরি বেশ কিছু পদে ডাক্তার, কর্মকর্তা-কর্মচারী না থাকায় সাধারণ রুগী স্বাস্থ্য সেবা থেকে শোচনীয় ও দুর্ভাগ্যজনকভাবে বঞ্চিত হচ্ছে। মঞ্জুরীকৃত এবং নব সৃষ্ট  পদসমূহ থেকে ডাক্তার কর্মকর্তা কর্মচারী বদলী হয়ে চলে যান, কিন্তু তদস্থলে পোষ্টিং দেয়া হয়না। আবার এমন কিছু জরুরী পদ আছে যা শুধু বছর নয়, যুগ যুগ ধরে শূণ্য রয়েছে। এভাবেই চলছে টেকনাফ উপজেলার ৫০শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল। সর্বত্রই ডাক্তার নার্স, কর্মকর্তা, কর্মচারীর নেই নেই অবস্থা। ফলে রোগ সারানোর এই হাসপাতালটি নিজেই “নেই রোগে” আক্রান্ত হয়ে যেন রুগ্ন প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।

৭মার্চ ২০১১ সালে টেকনাফ উপজেলার স্বাস্থ্য বিভাগের ইতিহাসে সর্বপ্রথম একজন মহিলা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা হিসাবে যোগদান করেছেন। তিনি হলেন ফেনীর বাসিন্দা ডাঃ সামসুজ্জাহান রকিবুন্নেছা চৌধুরী। মহিলা অফিসার হলেও অত্যন্ত দক্ষ, কর্মঠ, দায়িত্বের প্রতি আন্তরিকভাবে সচেতন ও নীতিপরায়ণ। রোহিঙ্গা অধ্যুষিত জনবহুল সীমান্ত উপজেলা টেকনাফে প্রয়োজনীয় জনবল সংকটের কারণে স্বাস্থ্য সেবার বেহাল দশা প্রসঙ্গে আলাপকালে অত্যন্ত আপে করে বলেন- ইচ্ছা থাকা সত্বেও ডাক্তার কর্মকর্তা কর্মচারী স্বল্পতার কারণে কাংখিত স্বাস্থ্য সেবা দেয়া সম্ভব হচ্ছেনা। আমাদের অবস্থা হচ্ছে- “ঢাল নেই তলোয়ার নেই নিধিরাম সর্দার” এর মতো। জানা যায়- টেকনাফে সর্বপ্রথম হাসপাতাল চালু হয়েছিল থানার পাশে ১৯৩৩ সনে। এরপর উপজেলা পরিষদ সংলগ্ন স্থানে বিশাল আয়তনের উপর মান উন্নীত ৩১ শয্যা হাসপাতাল হিসাবে চালু হয় ১২ মার্চ ১৯৮৭। দীর্ঘ ২ যুগ পরে ৫০ শয্যা হাসপাতাল চালু হয় ২০১০ সনের ২৫ এপ্রিল। ৫০ শয্যার হাসপাতাল চালু, জনবল কাঠামো, মঞ্জুরীকৃত (ষ্টাফ পজিশন) পদ নির্ধারিত হয়েছে।

কিন্তু সে মতে ডাক্তার কর্মকর্তা কর্মচারী পোষ্টিং দেয়া হয়নি। বরং যা আছে, তা থেকেও বদলী করে এবং বদলী হয়ে শুন্যতার কলেবর দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইউনিয়ন থেকে উপজেলা পর্যন্ত সর্বত্রই একই চিত্র। অবস্থা দেখে অতি জরুরী স্বাস্থ্য সেবার প্রতি সরকারের মাথা ব্যথা এবং নজরদারী আছে বলে মনে হয়না। টেকনাফ উপজেলায় ডাক্তারের (১ম শ্রেণীর কর্মকর্তা) মঞ্জুরীকৃত পদ আছে ২৯টি। বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ৮জন। ১০টি জুনিয়র কনসালটেন্ট পদের মধ্যে বর্তমানে মাত্র ১জন কর্মরত আছেন। তিনি হলেন ডাঃ মোহাম্মদ আতাউর রহমান। মেডিসিন, গাইনী, সার্জারী, এ্যানেসথেসিয়া, অর্থোসার্জারী, কার্ডিওলজি, চু, ইএনটি, চর্ম ও যৌন এই ৯টি জুনিয়র কনসালটেন্ট পদগুলো শূণ্য রয়েছে। সহকারী সার্জনের ৮টি পদে কর্মরত আছেন মাত্র ১জন, তিনি হলেন ডাঃ ফারহানা নাজনীন। সহকারী সার্জন (এ্যানেসথেসিয়া) ডাঃ মোঃ ইসমাইল আলম আজাদ ২৬মার্চ ২০১৩ থেকে বিনা অনুমতিতে কর্মস্থলে অনুপস্থিত রয়েছেন। মেডিকেল অফিসারের ৬টি পদে বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ৩জন। তাঁরা হলেন ডাঃ টিটু চন্দ্র শীল, ডাঃ মোঃ এনামুল হক, ডাঃ শংকর চন্দ্র দেবনাথ। এছাড়া অতি জরুরী ইমারজেন্সী মেডিকেল অফিসার, এমওএমসিএইচ-এফপি, ডেন্টাল সার্জনের ১টি করে পদগুলোতে একজনও নেই। জুনিয়র কনসালটেন্ট (এ্যানেসথেসিয়া) ডাঃ মামুনুর রহমান ও ডেন্টাল সার্জন ডাঃ তানজিনা আনোয়ার দীর্ঘদিন ধরে চমেক হাসপাতালে ডেপুটেশনে রয়েছেন। ২য় শ্রেনীর ১৬টি পদে ১৩টি শূণ্য। তম্মধ্যে ১টি নার্সিং সুপারভাইজার ও ১২টি সিনিয়র স্টাফ নার্স। ৩য় শ্রেণী কর্মচারীর মঞ্জুরীকৃত মোট পদের সংখ্যা ৮৬টি, বর্তমানে কাগজে কলমে কর্মরত আছে ৫১জন, ৩৫টি পদই শূণ্য। তা হচ্ছে- প্রধান সহকারী-কাম হিসাব রক্ষক ১টি, হিসাব রক ১টি, পরিসংখ্যানবিদ ১টি, ভান্ডাররক ১টি, ক্যাশিয়ার ১টি, অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর ৩টি, চিকিৎসা সহকারী ৪টি, ফার্মাসিস্ট ৪টি, মেডিকেল টেকনোলজিষ্ট (ল্যাব) ২টি, মেডিকেল টেকনোলজিষ্ট (রেডিও) ১টি, মেডিকেল টেকনোলজিষ্ট (ফিজিও) ১টি, কার্ডিওগ্রাফার ১টি, কম্পাউন্ডার ১টি, সহকারী নার্স ১টি, স্বাস্থ্য পরিদর্শক ১টি, স্বাস্থ্য সহকারী ১০টি, জুনিয়র মেকানিক ১টি। ৪র্থ শ্রেণীর মঞ্জুরীকৃত ২৪টি পদের মধ্যে ১৬টিই শূণ্য রয়েছে। তা হচ্ছে- ল্যাবরেটরী এটেনডেন্ট ১টি, ওটি বয়/ওটি এটেনডেন্ট ১টি, ইমারজেন্সী এটেনডেন্ট ১টি, এমএলএসএস ৪টি, আয়া ১টি, ওয়ার্ডবয় ১টি, কুক/মশালচী ১টি, নিরাপত্তা প্রহরী ১টি, মালি ১টি, ঝাড়–দার ৪টি। শূণ্য পদগুলোর মধ্যে এমন কতগুলো পদ রয়েছে যা অত্যন্ত জরুরী। তম্মধ্যে আবার এমন কিছু পদ আছে যার পদসংখ্যা মাত্র ১টি, এবং এই পদের কোন সহকারীও নেই। যেমন আরএমও, ইএমও, এমও-এমসিএইচ (এফপি), হিসাব রক, পরিসংখ্যাানবিদ, ভান্ডাররক, ক্যাশিয়ার, ফার্মাসিস্ট, মেডিকেল টেকনোলজিষ্ট (রেডিও), মেডিকেল টেকনোলজিষ্ট (ফিজিও), কার্ডিওগ্রাফার, কম্পাউন্ডার, সুপারভাইজার, জুনিয়র মেকানিক, ল্যাবরেটরী এটেনডেন্ট, ওটি বয়/ওটি এটেনডেন্ট, ইমারজেন্সী এটেনডেন্ট। এদিকে দেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিন ১০শয্যা হাসপাতালের জন্য ৩টি মেডিকেল অফিসারের পদ রয়েছে। ৩টি পদে একজন ডাক্তারও নেই। হোয়াইক্যং, সাবরাং এবং বাহারছড়া স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে ডাক্তার নেই। সহকারী ছাড়া ১জন বিশিষ্ট পদে কেউ না থাকায় কিভাবে কাজ চালাচ্ছেন জানতে চাইলে উপজেলা স্বাস্থ্য ও প.প. কর্মকর্তা  ডাঃ সামসুজ্জাহান রকিবুন্নেছা চৌধুরী বলেন- আসলে মঞ্জুরীকৃত সব পদই জরুরী।

সহকারী বিহীন ১জন বিশিষ্ট শূণ্য পদগুলোই ভোগাচ্ছে বেশি। ডাক্তার, নার্স ও সুইপার অন্ততঃ এই পদগুলো শুন্য না থাকলে স্বাস্থ্য সেবা দেয়া সম্ভব ও সহজ হত। এখানে ৩/৪ জনের কাজ ১জনকে দিয়ে করাতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে। মাঝে মধ্যে গরু, ছাগল তাড়াতে আমাকেই ছুটতে হয়। তিনি আরও বলেন- মেডিকেল টেকনোলজিষ্ট (রেডিও) পদে পদায়ন না থাকায় এক্স-রে মেশিন চালু করা সম্ভব হচ্ছেনা । ৫টি ঝাড়–দার পদে মাত্র ১জন বৃদ্ধ ও অসুস্থ ঝাড়–দার রয়েছে। সীমানা প্রাচীর নিচু হওয়ায় চোরের উপদ্রব এবং হাসপাতাল গেইটে ছিনতাইকারীদের তৎপরতা লেগেই রয়েছে। এমনিতেই জনবল সংকটে সমস্যায় জর্জরিত। উপরন্তু একজন রুগীর সাথে ৮/১০ জন লোক এসে অনর্থক ভীড় করে, রুগীর সিটে বসে থাকে এবং বিশৃংখলা সৃষ্টি করে। এতে যে রুগীরই তি করা হচ্ছে তা তারা মানতে চায়না। বুঝিয়ে বলা হলেও ষ্টাফদের সাথে দুর্ব্যবহার করে। স্বয়ং সম্পূর্ণ অপারেশন থিয়েটার আছে, কিন্তু ব্যবহার বা কাজে আনার মতো ডাক্তার ও টেকনিশিয়ান নেই। শূণ্য পদগুলো পূরণের জন্য একাধিকবার উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বরাবরে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। সরেজমিন পরিদর্শনে জানা গেছে, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ সামসুজ্জাহান রকিবুন্নেছা চৌধুরীর কঠোর দায়িত্বশীলতা সময়ানুবর্তিতা ও আন্তরিকতার কারণে এত বেশী জনবল সংকট থাকা সত্বেও স্বল্প সংখ্যক জনবল দিয়ে সুন্দর এবং সুশৃংখলভাবে সেবা প্রদানে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। যা সম্ভব হচ্ছে কর্মরত ডাক্তার ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আন্তরিকতা এবং সমন্বয় সাধনের কারনে। তাছাড়া পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে টিম গঠন করে দেয়া হয়েছে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।