কক্সবাজার জেলায় ধ্বংসের পথে লবণ শিল্প: মাথাব্যথা নেই কারো

বাংলাদেশের লবণ বিদেশে রফতানি করার সুযোগ থাকলেও লবণ আমদানির পাশপাশি একটি কুচক্রি মহল ষড়যন্ত্র করে পঙ্গু করে দিচ্ছে স্বয়ংসম্পূর্ণ এ খাতকে। দেশের একমাত্র স্বয়ংসম্পূর্ণ উৎপাদন খাত ‘লবণে’র বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র কোনোমতেই বন্ধ হচ্ছে না।
সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞ মহলের মতে, এই খাতকে বাঁচাতে যেন কারো কোনো মাথাব্যথা নেই। কৃষকের মাথার ঘাম পায়ে ফেলে উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় এবছর ২০ হাজার একর লবণ মাঠ অনাবাদি পড়ে আছে। আর যেসব লবণ চাষি মাঠে নেমেছে তারাও ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি নিয়ে আশা-নিরাশার দোলাচলে হতাশ। একদিকে পণ্যের ন্যায্যমূল্য না পাওয়া, অন্যদিকে কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি ও প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ সরবরাহের অভাবে বন্ধ হয়ে গেছে শতাধিক লবণ মিল। চালু থাকা মিলিগুলোও অসাধু একটি চক্রের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে। এতে করে দেশের লবণ খাত দেউলিয়া হওয়ার পথে। গত মৌসুমেও উৎপাদিত পণ্যের দাম না পাওয়ায় অধিকাংশ চাষীই লবণ বিক্রি করতে পারেননি। হাজার হাজার মণ লবণ এখনো মাঠে পড়ে আছে। শ্রমের সমপরিমাণও মূল্য না উঠায় এবছর বর্গাচাষীদের উল্টো খরচের টাকা দিয়েও মাঠে নামাতে কষ্ট হয়েছে। এজন্য লবণ খাতকে বাঁচিয়ে রাখতে সরকারের বিশেষ উদ্যোগ দরকার মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প (বিসিক) সূত্রমতে, সারাদেশে লবণের চাহিদা বছরে ১৫ লাখ ৮০ হাজার টন। এর বিপরীতে গত অর্থবছরে স্থানীয়ভাবে লবণ উৎপাদন হয় ১৯ লাখ ৩৩ হাজার টন। চলতি অর্থবছরে উৎপাদন ল্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৬ লাখ টন। দেশে লবণের উৎপাদনযোগ্য জমির পরিমাণ হচ্ছে ৭৫ হাজার একর। দেশের একমাত্র লবণ উৎপাদনকারী জেলা কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম জেলার বাঁশখালী উপজেলা। কক্সবাজার সদর, সীমান্ত উপজেলা টেকনাফ, চকরিয়া, পেকুয়া, মহেশখালী, কুতুবদিয়া ও বাঁশখালী উপজেলায় লবণ উৎপাদন হয়ে থাকে। সেখানে বিসিকের অধীনে জমি রয়েছে প্রায় ১শ’ একরের উপরে। কিন্তু এবছর সব মিলিয়ে চাষ হচ্ছে ৫৫ হাজার একর জমিতে। বাকি ২০ হাজার একর মাঠ খালি পড়ে আছে। যাতে খোদ বিসিকেরও প্রায় ৫০ একরের মতো লবণ মাঠ রয়েছে।
সূত্রমতে, লবণ আমদানিকারকদের একটি চিহ্নিত সিন্ডিকেট দেশে লবণের ঘাটতি দেখিয়ে ২০১১-১২ অর্থবছরে ৩ লাখ টন লবণ আমদানির অনুমতি নিয়ে ৫ লাখ ৬০ হাজার টন লবণ আমদানি করে। ২০১২-১৩ অর্থবছরে আমদানি করা হয় ২ লাখ ৪০ হাজার টন। অথচ এবছর লবণ উৎপাদন হয় ১৯ লাখ টন। এ নিয়ে দেশে লবণের মজুদ দাঁড়ায় ২২ লাখ টনে। ইতোমধ্যে ওই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে আরো ২ লাখ টন লবণ আমদানির অনুমতি দেয় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। এতে অতিরিক্ত লবণের মজুদের পরিমাণ দাঁড়ায় ৯ লাখ টন। মাঠেই অবিক্রিত রয়ে যায় কয়েক লাখ টন লবণ। যে কারণে লবণের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে প্রান্তিক চাষীরা।
কক্সবাজারে বিসিকের গবেষণা কর্মকর্তা এটিএম ওয়ালী উল্লাহ জানান, চলতি মৌসুমে এ পর্যন্ত লবণ উৎপাদন হয়েছে ১০ লাখ ৪৪ হাজার মেট্রিক টন। মাঠের কালো লবণ মণ প্রতি ৯৩ টাকা, মাঠ ওয়াশ লবণ ১০২ টাকা ও পলিথিন পদ্ধতিতে উৎপাদিত সাদা লবণ ১১৯ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। ইসলামপুরের লবণ চাষী মাস্টার আবুল হোছাইন জানান, লাগিয়ত, লেবার ও পলিথিন খরচসহ প্রতি একর জমিতে কমপে উৎপাদন খরচ পড়ে ৮০/৯০ হাজার টাকা। এই খরচ উঠাতে প্রতি একরে লবণ উৎপাদন হতে হবে ৭-৮শ’ মণ। অথবা প্রতি মণ লবণের মূল্য পেতে হবে ১৭০ থেকে ১৮০ টাকা। কিন্তু এ পর্যন্ত উৎপাদিত হয়েছে আড়াইশ’ থেকে তিনশ’ মণ লবণ। আর এখন লবণ বিক্রি হচ্ছে ১২০ টাকায়। তাই লবণ চাষীরা হতাশ। লবণ চাষীরা জানান, প্রতি কেজি কালো লবণ বিক্রি হয় ২ টাকা ২৫ পয়সায়। পরিশোধন থেকে শুরু করে বাজারে আসা পর্যন্ত এর সঙ্গে আরো ৫ থেকে সাড়ে ৫ টাকা খরচ যোগ হয়। এ হিসাবে খুচরা বাজারে প্রতি কেজি লবণ ৮-১০ টাকায় বিক্রি হওয়ার কথা। অথচ তা বিক্রি হচ্ছে ২৫ টাকায়।
অন্যদিকে উৎপাদন ব্যয় ও বিক্রয় মূল্যের এ অসঙ্গতি ভোক্তাদের প্রতি বড় জুলুম বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিসিকের হিসাব মতে, প্রতি কেজি লবণে আয়োডিন প্রয়োজন হয় .০৯ গ্রাম। প্রতি কেজি ৪ হাজার ৭০০ টাকা হিসেবে এর দাম পড়ে ৪২ পয়সা। এর সঙ্গে বিদ্যুৎ, শ্রমিক, প্যাকেজিং সহ আনুষঙ্গিক খরচ পড়ে সর্বোচ্চ ২ টাকা ৫০ পয়সা। সবমিলিয়ে এক কেজি প্যাকেটজাত লবণ উৎপাদনে খরচ হয় সর্বোচ্চ ৭ টাকা। কোম্পানি ভেদে এ খরচ আরো কম। যদিওবা খরচ আরো কিছুটা বেশি বলে হিসাব দিচ্ছে ট্যারিফ কমিশন। তাদের মতে, প্রতি কেজি কালো লবণ কারখানায় পৌঁছানোসহ খরচ পড়ছে ৩ টাকা ৫০ পয়সা। এর সঙ্গে পরিশোধন, আয়োডিন মিশ্রণ, প্যাকেজিং, কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন, শ্রমিকের মজুরি, কোম্পানি, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের লাভ ধরে প্রতি কেজি লবণের মূল্য সর্বোচ্চ দাঁড়ায় ২০ টাকার মতো। তবে এ দামও অযৌক্তিক বলে মনে করছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।
অভিযোগ রয়েছে, ৩ টাকার লবণ ৩০ টাকায় বিক্রি করে দেশের ১৬ কোটি মানুষের পকেট কাটছে একটি অসাধু সিন্ডিকেট। গরিব অসহায় লবণ চাষীদের বঞ্চিত করে কেজি প্রতি এত বিরাট অংক হাতিয়ে নিচ্ছে সিন্ডিকেটটি। তাদের ব্যাপারে সরকারের নেই কোনো ‘টু শব্দ’ও। ফলে ওই চক্রটি আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। এদিকে, অসাধু ওই চক্রটির সাথে বিসিক ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতিবাজ কিছু কর্মকর্তাও জড়িত বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
কক্সবাজার লবন মিল মালিক সমিতির সভাপতি ও ইসলামপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মাষ্টার আব্দুল কাদের জানান, লবণের ন্যায্যমূল্য না পওয়ায় লবণ চাষারা আজ মানবেতর জীবন যাপন করছে। ভরা মৌসুমেও তারা লবণের দাম পাচ্ছেনা। একটি সিন্ডিকটের কাছে লবন শিল্প জিম্মি হয়ে গেছে। এ নিয়ে সরকারের মাথা ব্যাথা না থাকায় লবণ শিল্প হুমকির মুখে পড়েছে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।