কক্সবাজার জেলার প্রধান তিন নদী নাব্যতা হারিয়ে মরুভূমি হওয়ার পথে

কক্সবাজার জেলার প্রধান ৩টি নদীই এখন নাব্যতা হারিয়ে অস্থিত্বহীন হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি নিধন হচ্ছে বনভুমি। অবাধে কর্তন হচ্ছে এলাকার বনাঞ্চলের কাঠ। ফলে বিরুপ প্রভাব পড়ছে পরিবেশের ওপর। খরস্রোত নদীতে ধু-ধু বালুচর আর বনভুমি পরিনত হচ্ছে মরুভূমিতে। সংশয় বাড়ছে আগামী প্রজন্মের সুস্থ পরিবেশে বেঁচে থাকা নিয়ে।

কক্সবাজার জেলার প্রধান নদীগুলো হচ্ছে বাঁকখালী, ঈদগাঁও ফুলেশ্বরী ও মাতামুহুরী নদী। এসব নদীর উৎপত্তিস্থলের বিষয়ে স্পষ্ট কোন তথ্য না থাকলেও ভারত ও মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে এই তিনটি নদী। খরস্রোত বাঁকখালী নদীর কিছু অংশ জেলার কক্সবাজার সদর, রামু ও বান্দরবানের নাই্যংছড়িকে ঘিরে রয়েছে। পার্বত্য এলাকা হতে সৃষ্ট প্রমত্তা মাতামুহুরী ও ঈদগাঁও ফুলেশ্বরী নদীদ্বয় কক্সবাজার জেলার চকরিয়া, কক্সবাজার সদর, রামু ও বান্দরবানের লামা ও নাই্যংছড়ি উপজেলার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।

এ নদী গুলো সরাসরি বঙ্গোপসাগরের সাথে মিলিত হয়েছে। কক্সবাজার জেলার ভেতর দিয়ে প্রবাহিত এই তিনটি নদীই এখন পলি জমে ভরাট হয়ে যাচ্ছে। ফলে গভীরতা ও প্রশস্থতা কমার পাশাপাশি কমেছে এর খরস্রোত। এতে পানিশূন্য হয়ে নদীগুলো হারিয়ে ফেলেছে নাব্যতা। একসময়ের প্রমত্তা বাঁকখালী, ঈদগাঁও ফুলেশ্বরী ও মাতামুহুরী নদী এখন মরা খালে পরিণত হযেছে। কোথাও কোথাও এ নদীগুলোর বুকজুড়ে দেখা দিয়েছে শুধু ধু-ধু বালুচর। স্রোতহীনা নদীগুলোর পাশেই অগভীর নলকূপ স্থাপন করে এখন চাষ হচ্ছে আবাদী ফসল। অথচ এক সময় নদীগুলো দিয়ে চলাচল করত বড় বড় নৌযান। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে এ অঞ্চলের সাথে যোগাযোগ ও পণ্য আনা নেওয়ার জন্য এ নদীগুলোই ছিলো একমাত্র উপায়। কালের বিবর্তনে নতুন প্রজন্মের কাছে এসব নদী এখন শুধু ইতিহাস।

ফুলেশ্বরী, মাতামুহুরী ও বাঁকখালী নদী স্রোতহীন হয়ে পড়ায় বর্ষায় নদী বুকে জমে যাওয়া পলি অপসারিত হয় না। ফলে প্রতিবছর জেগে উঠছে ছোট বড় চর। এতে নদীগুলো হারিয়ে ফেলেছে নাব্যতা। নদীর দু’পাড়ে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ করে নদীগুলোর পাড় দখল করা হচ্ছে। একারণেও নদীর প্রশস্থতা হ্রাস পাচ্ছে। এককথায় পূণরায় খাল খনন কর্মসূচীই নদীগুলো ফিরিয়ে দিতে পারে তাদের পূর্বের অবস্থা, এমনটি ধারনা পরিবেশ বিশ্লেষকদের।

এক প্রশ্নের উত্তরে কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ড নির্বাহী প্রকৌশলী জানান, দেশের নদীগুলোকে রার্থে খাল খনন কর্মসূচী গ্রহনে সরকার সচেষ্ট রয়েছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, বাংলাদেশে দুইভাবে নদী বিপর্যয় হয়। অভ্যন্তরীণ ও বহিদেশীয়। অভ্যন্তরীণ কারণগুলো হলো- নদীর বুক ও পাহাড়ে জমি দখল, চাষাবাদ, স্থাপনা নির্মাণ, পাড় কাটা, পাথর ও বালু আহরণ, বাঁক কেটে গতিপথ পরিবর্তন, সেচ খাল তৈরি, পানি সরিয়ে নেয়া, কৃষি ও বন্যা নিয়ন্ত্রণের নামে বোল্ডার নির্মাণ, বিরতিহীন পাড় বাঁধাই, ঢাকা ও হবিগঞ্জের মতো শহর বা জনপদ, বিরতিহীন বাঁধ নির্মাণ, নদীর উপর বাঁধ-সেতু-জলবিদ্যুৎ প্রকল্প জলাধার বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণ, নদীর পানিতে বোল্ডার ও পাথর নিপে, গাছ-গাছালির ফাঁদ স্থাপন, পানিতে অতিরিক্ত কচুরিপানা, উন্নয়নের নামে পাড়ের গাছ কাটা, নদী পাড়ে নৌযান ভাঙ্গা ও নির্মাণ সামগ্রীর স্তূপ, নদীর পানিতে শহুরে ও গ্রামীণ শিল্প বর্জ্য, রাসায়নিক সার-কীটনাশক নিপে ও মিশ্রণ ইত্যাদি।

আর বহিদেশীয় বিষয়গুলো হলো- বাংলাদেশে প্রবেশকারী প্রায় সবগুলো নদীরই ভারতীয় ও মিয়ানমার অংশে হওয়ায় সেসব দেশ নদীর উপর বৃহৎ স্থাপনা বাঁধ, সেচ বা পানি বিদ্যুৎ প্রকল্প। এই সবগুলো কারণে নদীর এখন বিপর্যস্ত অবস্থা। পানি শুকিয়ে যাওয়ার পর চাষাবাদের কারণে নদীর অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।

সূত্রে আরও জানা যায়, নদীসমূহের বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত খারাপ। সবকটি নদীই দীর্ঘমেয়াদি, অবারিত ও ক্রমবর্ধমান অবয়ের শিকার। নদীগুলোর পানির পরিমাণ ও প্রবাহ হ্রাস, নদীর কলেবর সংকোচন, তলা ভরাট, পাড় ভাঙন, দিক পরিবর্তন, নদীর বুক জুড়ে ব্যাপক চর সৃষ্টি, বর্ষায় প্লাবন ও শীতে খরা, নদী সংশ্লিষ্ট খাল-বিল-হাওর পানির পরিমাণ হ্রাস বর্তমানে নদী সংকটের সাধারণ রূপ।

এই তিনটি নদীর দুই পাশে বেশীর ভাগ স্থান সবুজের সমারোহ। নদী গুলোর দুই পাড়ে স্থায়ীভাবে বসতবাড়ি গড়ে তুলেছে মানুষ। পানির অভাবে নদীর বুকে এভাবে বসতি গড়তে থাকলে আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ কি হবে? জীব বৈচিত্র ও পরিবেশও হুমকির সম্মুখীন হবে।

জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে দেশের মানচিত্রে। বদলে যাচ্ছে দৃশ্যপট। এরই মধ্যেই এসব নদীর সাথে বন্ধ হয়ে গেছে মূল নদীর সংযোগ। অনেক নদীই এখন কৃষি জমিতে পানি সংগ্রহের নর্দমার মতো দেখতে। স্থানীয়রা বলছেন, নদী বিলীন হলে পরিবেশ ও জলবায়ুর বিপর্যয় ঘটবে। তাই পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনের হাত থেকে দেশকে রা করতে কর্তৃপরে যথাযথ দৃষ্টি আকর্ষণ একান্ত প্রয়োজন বলে মনে করেন এ অঞ্চলের সাধারণ মানুষ।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।