তারেক সাঈদ সহ ৫জনের বিরুদ্ধে কুমিল্লার আদালতে মামলা

র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়ন-র‌্যাব-১১ এর বাধ্যতা মূলক অবসরে যাওয়া সাবেক অধিনায়ক (সিও) লে. কর্ণেল তারেক সাঈদ মোহাম্মদসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে গতকাল রোববার কুমিল্লার আদালতে একটি মামলা হয়েছে।
লাকসাম উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক সাংসদ মো. সাইফুল ইসলাম হিরু এবং পৌরসভা বিএনপি’র সভাপতি মো. হুমায়ুন কবির পারভেজের গুমের ঘটনায় মামলাটি হয়। গত বছরের ২৭ নভেম্বর থেকে লাকসামের বিএনপির ওই দুই নেতা নিখোঁজ রয়েছেন।
ওইদিন দুপুরে মো. হুমায়ুন কবির পারভেজের বৃদ্ধ বাবা মো. রঙ্গু মিয়া বাদি হয়ে দণ্ডবিধির ৩৪, ৩২৩, ৩৬৪, ৩৮০, ৪৪৭ ও ৪৪৮ ধারায় কুমিল্লার ৬ নম্বর আমলী আদালতের জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম সাবরিনা নার্গিসের আদালতে মামলাটি দায়ের করেন। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে তদন্ত করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য লাকসাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) নির্দেশ দেন।
মামলার অন্য চার বিবাদি হলেন, র‌্যাব-১১ এর তৎকালীন কুমিল্লা ক্যাম্পের দায়িত্বে থাকা কোম্পানী-২ এর মেজর শাহেদ হাসান রাজী, উপ সহকারী পরিচালক (ডিএডি) মো. শাহজাহান আলী, উপ-পরিদর্শক কাজী সুলতান আহমেদ এবং অসিত কুমার রায়।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত বছরের ২৭ নভেম্বর রাত অনুমান নয়টা থেকে এগারটার দিকে কুমিল্লার সদর দণি উপজেলার হরিশ্চর এলাকা থেকে মো. সাইফুল ইসলাম হিরু এবং মো. হুমায়ুন কবির পারভেজ এবং পৌর বিএনপির সহ সাংগঠনিক সম্পাদক জসিম উদ্দিনকে র‌্যাব আটক করে। পরে জসিম উদ্দিনকে লাকসাম থানায় হস্তান্তর করে। কিন্তু আপর দুইজনের আজও কোনো খোঁজ মেলেনি। নিখোঁজ হওয়া বিএনপির ওই দুই নেতার পরিবারের সদস্যদের দাবি র‌্যাব তাঁদের গুম করেছে।
হুমায়ুনের স্ত্রী শাহনাজ আকতার গত ৭ মে রাতে লাকসাম পৌর এলাকার ফতেপুরের বাড়িতে এক সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করেন, র‌্যাব-১১ সাবেক অধিনায়ক (সিও) লে. কর্ণেল তারেক সাঈদ এর নেতৃত্বে তাঁর স্বামী মো. হুমায়ুন কবির পারভেজ এবং চাচা শ্বশুর মো. সাইফুল ইসলাম হিরুকে গুম করেছেন। ওই সময় তিনি থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশ মামলা নেয়নি। পরে তাঁর দেবর মো. গোলাম ফারুক একটি সাধারণ ডাইরী (জিডি) করেন। তাঁর অভিযোগ, ওই জিডিরও কোন তদন্ত করেননি পুলিশ। তাই তিনি মামলা করার কথা ভাবছেন। ওই সংবাদ সম্মেলনে টাঙানো ব্যানারে লেখা ছিল ” র‌্যাব ১১-এর সিও সদ্য চাকুরীচ্যূত সিও তারেক সাঈদ’র নেতৃত্বে হিরু ও হুমায়ুনকে গুম করা হয়েছে।
এদিকে নিখোঁজ বিএনপি নেতা মো. সাইফুল ইসলাম হিরুর ছেলে রাফসান অভিযোগ করে বলেন, আমাদের সন্দেহ লে.কর্ণেল তারেক সাঈদ এই গুমের সঙ্গে জড়িত। তিনি নিজেই কুমিল্লা গিয়ে গুমের নেতৃত্ব দেন এবং সব কিছু জানেন। ওই সময় তাঁর সঙ্গে র‌্যাব-১১ এর তৎকালীন কুমিল্লা ক্যাম্পের দায়িত্বে থাকা কোম্পানী-২ এর মেজর শাহেদ হাসান রাজী, উপ সহকারী পরিচালক (ডিএডি) মো. শাহজাহান আলী জড়িত ছিলেন।
মেজর শাহেদ হাসান রাজী দাবি করেন, মো. সাইফুল ইসলাম হিরু এবং মো. হুমায়ুন কবির পারভেজ নামে কাউকে র‌্যাব আটক করেনি।
নিখোঁজ ওই দুই নেতার পরিবারের সদস্যরা জানায়, গত বছরের ২৭ নভেম্বর রাত সাড়ে দশটায় লাকসাম উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক সাংসদ সাইফুল ইসলাম হিরু, পৌর বিএনপি’র সভাপতি হুমায়ুন কবির পারভেজ এবং একই কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক জসিম উদ্দিন ’লাকসাম ফেয়ার হেল্থ’ হসপিটালের অ্যাম্বুলেন্সে ঢাকা যাচ্ছিলেন। অ্যাম্বুলেন্সটি কুমিল্লা সদর দণি উপজেলার হরিশ্চর এলাকায় পৌঁছলে ওই সময় সাদা পোশাকদারী র‌্যাব পরিচয়ে একটি দল অ্যাম্বুলেন্সটি ব্যারিকেড দিয়ে থামায় এবং তাঁদের আটক করে অন্য একটি গাড়িতে তুলে নিয়ে যায়। ওইদিন রাত প্রায় সাড়ে বারটার দিকে র‌্যাব-১১-এর ক্রাইম প্রিভেনশন কোম্পানী-২-এর উপ-সহকারী পরিচালক (ডিএডি) শাহজাহান আলী জসিম উদ্দিনকে লাকসাম থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেন। কিন্তু অপর ওই দুই নেতাকে আটকের বিষয়টি র‌্যাব স্বীকার করছেন না। এ ছাড়া, একই রাতে র‌্যাবের একটি দল উপজেলা বিএনপির সভাপতি সাইফুল ইসলাম হিরুর লাকসামের একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে আরও নয়জনকে আটক করে। তাঁদেরকে ওই রাতেই লাকসাম থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেন। র‌্যাব-১১-এর ক্রাইম প্রিভেনশন কোম্পানী-২-এর উপ-সহকারী পরিচালক (ডিএডি) শাহজাহান আলী।
র‌্যাবের কাছ থেকে ছাড়া পাওয়া জসিম উদ্দিন ওই রাতের বর্ণনা দিয়ে বলেন, র‌্যাব তাঁদের আটকের পর তিন জনকে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড এলাকায় নিয়ে যায়। সেখান থেকে হিরু ভাই ও হুমায়ুন ভাইকে একটি গাড়িতে তুলে নেয় এবং আমাকে অন্য একটি গাড়িতে করে এনে রাত প্রায় সাড়ে বারটার দিকে লাকসাম থানায় হস্তান্তর করেন।
নিখোঁজ মো. হুমায়ুনের ছোট ভাই গোলাম ফারুক জানান, ঘটনার তিন দিন পরও তাঁদের কোনো খোঁজ না পেয়ে র‌্যাব’র সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। কিন্তু র‌্যাব ওই দুইজনকে (হিরু-হুমায়ুন) আটকের বিষয়টি স্বীকার করেননি। পরে এই ব্যাপারে ১ ডিসেম্বর তিনি লাকসাম থানায় একটি সাধারণ ডাইরী (জিডি নং-২৩ ) করেন।
লাকসাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনোয়ার হোসেন চৌধুরী জানান, ওই সময় আমি এই থানায় ছিলাম না। এখানে যোগদানের পর জেনেছি, বিএনপির ওই দুই নেতার নিখেঁজের বিষয়ে ১ ডিসেম্বর থানায় একটি জিডি হয়েছে। এ ছাড়া, নিখোঁজের ব্যাপারে আমাদের কাছে আর কোনো তথ্য জানা নেই।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।