সন্দেহের তীর সাংসদ নিজাম উদ্দিন হাজারীর দিকে, সাহস করে কেউ প্রকাশ্যে বলছেনা

ফেনী জেলার ফুলগাজী উপজেলা চেয়ারম্যান এবং উপজেলা আ’লীগ সভাপতি একরামুল হক একরাম হত্যাকান্ডের রহস্য দিন দিন পরিস্কার হচ্ছে। এ নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। ১৯৮৩ সালের পৌর যুবলীগের নেতা হিসেবে রাজনীতিতে আবির্ভুত হন একরাম। তার পিতা মরহুম নুরুল হক ছিলেন একজন শিক্ষক। একরাম এর জন্মস্থান ফুলগাজী উপজেলার আনন্দপুর ইউনিয়নের হাসানপুর হলেও ফেনীর মাষ্টার পাড়ায় তাদের পৈত্রিক বাড়ী ছিল। এখানেই তার শৈশব থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বসবাস ছিল। স্ত্রী-সন্তানরা ঢাকায় বসবাস করলেও জনপ্রতিনিধি হওয়ার কারনে তিনি ফেনী ছেড়ে যাননি।

তিন বোন এবং পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে একরাম ছিল চতুর্থ সন্তান। ১৯৮৩ সাল থেকে তৎকালীন গডফাদার জয়নাল হাজারীর সাথে হাত ধরেই রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে একরাম। এক পর্যায়ে জয়নাল হাজারীর ডান-বামের চার ক্যাডারের একজন হয়ে উঠেন তিনি। তখন থেকে একরাম হয়ে উঠে ফেনীর দ্বিতীয় সম্রাট। ২০০১ সালের নির্বাচনের পর বিএনপি জামায়াত ক্ষমতায় আসার পর একরামের গুরু ভারতে পালিয়ে গেলে একরাম আত্মগোপনে চলে যান। এরপর গ্রেফতার হয়ে কিছুদিন জেলে ছিলেন দিনে। জয়নাল হাজারী পরবর্তী ফেনীতে দ্বিতীয় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভুত হন  ফেনীর মাষ্টার পাড়ার নিজাম উদ্দিন হাজারী।

 

এ সময় নিজাম উদ্দিন হাজারীর সাথে সখ্যতা গড়ে পুনরায় রাজনীতির মুল ধারায় ফিরে আসে একরাম। ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় আসার পর একরাম নিজাম হাজারীর পাশাপাশি রাজনীতিতে সক্রিয় ভুমিকা পালন করেন। এদিকে প্রথম শ্রেণীর ঠিকাদার হওয়ায় জেলার বেশীরভাগ কাজ একরামের মাধ্যমে হতে থাকে। দলের একচ্ছত্র আধিপত্য খাটিয়ে নিজাম উদ্দিন হাজারীকে পাশ কাটিয়ে একরাম হয়ে উঠেন ফেনীর টেন্ডার স¤্রাট। ফেনী শহরের ডায়াবেটিক হাসপাতালের সাধারণ সম্পাদকের মতো লোভনীয় পদটি একরামের দখলে ছিল। এ ছাড়া পাউবো, এলজিইডি, গণপূর্তের বড় বড় প্রজেক্টগুলো সিস্টেমের মাধ্যমে একরাম হাতিয়ে নিতেন। এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে নিজাম উদ্দিন হাজারীর সাথে একরামের গোপন বিরোধ চলে আসছিল। এ ছাড়া একরামের রাজনৈতিক গুরু জয়নাল হাজারী ফেনীর রাজনীতিতে পুনর্বহাল হতে না পারলেও একরাম হাজারীর সাথে সখ্যতা বজায় রাখতো বলে নিজাম হাজারী মনে করত। এদিকে ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একরাম ফেনী-১ আসন থেকে সাংসদ হিসেবে মনোনয়ন প্রত্যাশী হলেও নিজাম হাজারী তা কৌশলে সরিয়ে দেন বলে জানা গেছে।

 

সূত্র জানায়, উপজেলা নির্বাচনে একরামের পরিবর্তে জেলা তাঁতী দলের আহবায়ক মিনারকে বেশী পছন্দ করতেন নিজাম হাজারী। ফলে তিনি প্রথম অবস্থায় একরামের নির্বাচনী প্রচারনায় যোগ দেননি। এদিকে ফেনীর রামপুরে আলোচিত নাসির হত্যাকান্ডের চার্জশীটভুক্ত আসামী ছিলেন একরাম। কিছুদিন পূর্বে চট্টগ্রামের আদালত মামলাটি থেকে তাদের অব্যাহতি দেন। এ ছাড়া একরামকে ফেনী বিলাসী হলের সামনে প্রকাশ্য দিবালোকে একাডেমী সড়কে হত্যা করা হয়। জানা গেছে, ১৯৯৮ সালের নভেম্বর মাসে ঐ সড়কেই একরাম নিজের একক আধিপত্যে প্রতিষ্ঠার জন্য ফুলগাজী যুবলীগ নেতা আবুল বাশার ওরপে বৈশ্যা কে হত্যা করিয়েছিল। বৈশ্যা ফেনী থেকে টেম্পুযোগে ফুলগাজী যাওয়ার পথে পথরোধ করে একরামের নির্দেশে সন্ত্রাসীরা তাকে কুপিয়ে গুলি করে হত্যা করে বলে অভিযোগ রয়েছে। তার এক যুগ পর একই স্থানে একরামের হত্যাকান্ড নতুন রহস্যের জন্ম দিয়েছে। এদিকে গত ৫ জানুয়ারীর উপজেলা নির্বাচনে ফুলগাজী উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে সবগুলো কেন্দ্র দখল করে একরাম বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়। সে সময় তিনি সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করেন, তার প্রতিদ্বন্ধি প্রার্থী বিএনপির মিনার তাকে গুলি করে হত্যার হুমকি দিচ্ছে।

 

এ ছাড়া নির্বাচনের দিন জিএমহাট বাজারে গেলে একরামের গাড়ী লক্ষ্য করে গুলি চালায় মিনার। নির্বাচনী প্রচারনাকালেও একরামকে একাধিকবার মিনার এবং তার বাহিনী হত্যা করার চেষ্টা করেছে। ফলে জিলা আওয়ামীলীগের ধারণা নির্বাচনে পরাজিত হয়ে মিনারই একরামকে হত্যা করেছে। এদিকে ফেনী জেলা বিএনপির উদ্যোগে মঙ্গলবার রাত ৮ টার দিকে সাংবাদিক সম্মেলনে হাজারিকা প্রতিদিনের উদ্বৃতি দিয়ে বলা হয়, এ হত্যাকান্ডের সাথে নিজাম হাজারী জড়িত রয়েছে। এ সময় ফেনী জেলা বিএনপি নেতাদের স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বলা হয় একরাম যে স্থানে খুন হয়েছে তা নিজাম হাজারীর অন্যতম সহযোগী কাউন্সিলর শিবলু নিয়ন্ত্রিত এলাকা। শিবলুর অনুমতি ছাড়া এখানে পশু-পাখিও প্রবেশ করতে পারেনা। শিবলুর নিজস্ব ক্যাডার বাহিনী সবসময় একাডেমী এলাকা ধাপিয়ে বেড়ায়। একই ধারণা জনমনে বিরাজ করছে। শিবলুর মতো দুর্ধষ সন্ত্রাসী বহাল থাকতে বিলাসী সিনেমা হলের সামনে আওয়ামীলীগ বিরোধী কোন শক্তি একরামকে হত্যা করতে পারেনা।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।