বিদ্যুৎ বিল ফাঁকির চাঞ্চল্যকর পদ্ধতি রিমোট মিটারে

রিমোট কন্ট্রোলের সাহায্যে বৈদ্যুতিক মিটার নিয়ন্ত্রণ করে বিল ফাঁকি দেয়ার চাঞ্চল্যকর পদ্ধতি ধরা পড়েছে খুলনায়। একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে এ পদ্ধতিতে মাসে কোটি কোটি টাকার বিদ্যুৎ ফাঁকি দিয়ে আসছে। আর এ কারণে বাড়ছে বিদ্যুতের সিস্টেম লস, কমছে সরকারের আয়। এদিকে, ঘটনার ধরার পড়ার পর ১৫ দিন পার হলেও কোনো আইনগত পদক্ষেপ না নেয়ায় রহস্য সৃষ্টি হয়েছে।

 

বিদ্যুতের সিস্টেম লসের কারণ খুঁজতে গিয়ে নতুন বার্তা ডটকমের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এ সব চাঞ্চল্যকর তথ্য। খুলনার লবণচরা শিল্প এলাকার ৩১টি তুষকাঠ মিলের অধিকাংশ এবং কয়েকটি অটো রাইস মিলে বিল ফাঁকি দিতে বসানো হয়েছে রিমোট মিটার। বিদ্যুতের ডিজিটাল মিটারের ভেতর সার্কিট বসিয়ে নিয়ন্ত্রণ নেয়া হয় এই রিমোট মিটারের। এরপর যত বিদ্যুতই ব্যবহার করা হোক মিটার ঘুরবে না। নিজেদের খুশি মতো বিল উঠানোর এ মিটার বসিয়ে দীর্ঘ দিন ধরে বিদ্যুৎ চুরি করে আসছেন তারা। সম্প্রতি বিদ্যুৎ বিভাগের লোকজনের সঙ্গে লেনদেনসংক্রান্ত দ্বন্দ্বের জের ধরে পাঁচটি মিটার জব্দ করা হয়েছে। মিটার পাঁচটি হলো: লবণচরার আজিজুল গাজী, বাবলু, রাজিব, রুহুল আমিন ও কিবরিয়ার তুষকাঠ মিলের।
যেভাবে তৈরি হয় রিমোট মিটার
মিলে ব্যবহৃত মিটারে পাঁচটি ধাপ থাকে। একে একে পাঁচটি ধাপ খোলার পর শেষ স্তরের উপরে অনেকটা জায়গা ফাঁকা থাকে। ওই ফাঁকা জায়গাতে বসানো হয় একটি সার্কিট। যা স্থাপন হয়ে গেলে মিটারের নিয়ন্ত্রণ চলে আসে একটি রিমোটে। তখন বিদ্যুৎ খরচের হিসাব ধরে মিটার ঘুরবে না। ওই রিমোট যেভাবে ঘুরবে সেভাবে চলবে মিটার।
কী লাভ রিমোট মিটারে
তুষকাঠ তৈরির অন্যতম কাঁচামাল বিদ্যুৎ। আর এই বিদ্যুৎ ফাঁকি দিতে পারলে বিশাল লাভ। যে চক্রটি এই মিটার তৈরি করে দেয় তারা এই লাভের বিষয়টি মিল মালিকদের বুঝিয়ে বসে আনে। চক্রটি তাদেরকে বোঝায় একমাত্র আল্লাহ ছাড়া এই মিটারের গোমর আর কেউ ধরতে পারবে না। দেখা যায় একটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু তুষকাঠ মিলে মাসে দুই লাখ টাকার বেশি বিদ্যুৎ বিল আসে। সেখানে রিমোট ব্যবহার করে মাত্র ২০ হাজার টাকা দিয়ে পার পাওয়া যায়। আর এভাবেই দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে বিল ফাঁকি দিয়ে আসছে একটি গ্রুপ। এতে কতিপয় মিল মালিক যেমন অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছে তেমন লাভবান হচ্ছে যারা এই মিটার তৈরি করে দিচ্ছে তারা।
খোঁজ-খবর নিয়ে জানা গেছে, মিটারের ভেতর যে সার্কিটটি বসানো হয় তার সর্বমোট খরচ দুই হাজার টাকার বেশি না। আর এ কাজটি করে দিয়ে চক্রটি প্রথমে মালিকদের কাজ থেকে এক লাখ টাকা, পরে ৮০ হাজার এবং সর্বশেষ ৪০ হাজার করে টাকা নেয়।
যারা জড়িত
ভারত থেকে আনা এই প্রযুক্তি নিয়ে যশোরের দুই যুবক খুলনায় আসে। তারা সখ্যতা গড়ে তোলে খুলনা বিদ্যুৎ বিভাগের বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-১ এর ক্যাজুয়াল বিল বিলিকারী বাবুর সঙ্গে। বাবু লবণচরা এলাকায় দায়িত্ব পালন করার কারণে সেখানে কার মিলে কত বিল হয় তা চক্রটি জানতে পারে। এরপর বেশি বিল হওয়া মিলগুলোতে বাবুর মাধ্যমে চক্রটি রিমোট মিটার বসানোর কাজ শুরু করে। রাতারাতি চক্রটির আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়ে যায়। হঠাৎ করে সিস্টেম লসের কারণে বিপদে পড়েন এ অঞ্চলের দায়িত্ব পালনকারী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর হোসেন। তিনি দেখেন যে পরিমাণ লোড নিচ্ছেন তার থেকে অনেক কম বিল হচ্ছে । অর্থাৎ সিস্টেম লস বেড়ে গেছে অনেক। বিষয়টি নিয়ে বাবুর সঙ্গে তার কথা হয়। এক পর্যায়ে বিষয়টি ধামাচাপা দিতে বাবুর মাধ্যমে রিমোট ব্যবহৃত মিল থেকে টাকা তুলে প্রতি মাসে দেয়া হতো প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর হোসেনকে। বিষয়টি এক কান দুই কান করে উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাদের কানে যায়। সেই সঙ্গে বিষয়টি নতুন বার্তা ডটকম জানতে পারে। জাহাঙ্গীর হোসেনের ওপর চাপ বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত তার প্রচেষ্টায় পাঁচটি মিটার ধরা হয়।
বাঁচানোর চেষ্টা চলছে অপরাধীদের
পাঁচটি রিমোট মিটারের সঙ্গে আরে দুই মিল মালিক মিটারে বাইরে থেকে সরাসরি লাইন নেয়ার কারণে জব্দ করা হয় তাদের মিটার। এরপরই শুরু হয় তদবির। বাবুর মাধ্যমে এসব মিল মালিকের কাছ থেকে উঠানো হয় বড় অঙ্কের টাকা। যা পৌঁছানো হয় প্রকৌশলী জাহাঙ্গীরের হাতে। তিনি কর্তৃপক্ষকে বোঝানোর চেষ্টা করেন মিল মালিকদের চাপ দিলে তারা পালিয়ে যাবে। তাতে তাদের কাছ থেকে আর টাকা আদায় সম্ভব হবে না। সামান্য জরিমানা করে তিনি নতুন মিটার দিয়ে মিলগুলো চালু করার জন্য চেষ্টা করছেন। আর এ কারণে গত ২২ মে মিটারগুলো ধরা পড়লেও এখনো পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি।
অপরদিকে যারা রিমোট মিটার তৈরি করে দেয় তাদের কাজ থেমে নেই বলে জানা গেছে। চক্রটি অভয় দিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত কোনো ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ নেই বিদ্যুৎ আইনে। বিদ্যুৎ বিভাগের ক্ষমতা গ্রাহক নিয়ন্ত্রণ করা পর্যন্ত। কোনো ধরনের বিপদে পড়বে না এ ব্যাপারে আশ্বস্ত হওয়ার কারণে তারা তাদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের বক্তব্য
ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ওজোপাডিকো) ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবুল কালাম আজাদ জানান, জড়িত গ্রাহকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। তবে যারা রিমোট মিটার তৈরি করেছে তাদেরকে ধরার জন্য কোনো পদক্ষেপ নেয়ার সুযোগ ওজোপাডিকো’র নেই বলে তিনি জানান।
ডিভিশন-১’র নির্বাহী প্রকৌশলী মো. হাবিবুর রহমান জানান, বিষয়টি নিয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ওই কমিটির রিপোর্টের পর ব্যবস্থা নেয়া হবে। এ কারণে এখনো পর্যন্ত মামলা হয়নি বলে তিনি জানান। প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর জানান, ঘটনার সঙ্গে আমাকে জড়ানোর যে চেষ্টা চলছে তা সঠিক না। তবে বাবুর কর্মকাণ্ড নিয়ে তিনি নেতিবাচক মন্তব্য করেন।
বিদ্যুতের বিলবিলিকারী বাবু বলেন, আমি বিল বিলি করতে করতে এক সময় তুষকাঠ ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ি। তবে এখন আমি ওই ব্যবসার সঙ্গে নেই। তিনি বলেন, রিমোট মিটার তৈরির ব্যাপারে তার কিছু জানা নেই। এক সময় আসল সত্য বেরিয়ে আসবে বলে তিনি জানান।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।