প্রজন্ম শিশু পাঠশালা নিয়ে এগিয়ে যাবে ওরা

পাঠশালা’ চার অক্ষরের পরিচিত এই শব্দটির অর্থ বাংলা অভিধানে পওয়া যায় ‘বিদ্যালয়’। সহজভাবে বললে এটাকে প্রাথমিক বা প্রথম পর্যায়ের বিদ্যালয় বলাই সমুচীন হবে। এ পাঠশালা থেকেই প্রতিটি ছেলে-মেয়ের জীবনের পথ চলা শুরু হয়। মূলত এখান থেকেই মেধা বিকাশের প্রথম পর্যায় শুরু । চরম কোমল মমতার মাধ্যমে শিক্ষা দেয় হয় কোমল প্রান শিশুদের।
বহুদিন ধরে শোনা যাচ্ছিল কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোল ঘেষা সামাজিক বন বিভাগের ভিতরে বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষার্থী সুবিধা বঞ্চিত শিশুদেরকে বিনামূল্যে শিক্ষা দিচ্ছেন। এক দিন চলে গেলাম তাদের শিক্ষা কার্যক্রম দেখতে। প্রথম দেখাতেই আনন্দে চোখে পানি আসার উপক্রম, মনে হলো আবার যদি শিশু হতে পারতাম। সব শিশুকে পাঠশালার মেঝেতে হটু গেরে বা আসন পেতে বসে পড়তে দেখে মনে পড়ে গেল পাঠশালার প্রথম পাঠের কথা, প্রথম পাঠের কথা যে কেউ মনে না করে পরবে না। এখানে যে ভাবে শিশুদের শিক্ষা দেয় হয় তার তুলনা করা সত্যিই কঠিন কাজ। এখানে যারা শিশুদের শিক্ষা দিচ্ছেন তারা সবাই কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। পাঠশালাটির নাম ‘প্রজন্ম শিশু পাঠশালা’।
নামটা কতই না গুরুত্ব বহন করে। ‘প্রজন্ম শিশু পাঠশালা’ ২০১০ সালের ১ ডিসেম্বর কুমিল্লার দ্বেবিদ্বার ধামতী কামিল মাদ্রাসায় ৫৩ জন এতিম শিশুদের শিক্ষা দেয়ার মাধ্যমে ‘প্রজন্ম শিশু সংগঠণ’ নামে যাত্রা শুরু করে। এক সময় সংগঠণ নাম থেকে পাঠশালা নাম ধারণ করে। ২০১৩ সালের ৩ অক্টোবর মাত্র ৭ জন সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের নিয়ে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন সামাজিক বন বিভাগের ভিতরে নতুন উদ্দমে পথ চলা শুরু করে। বন বিভাগের ভিতরে একটি পরিত্যাক্ত চৈাচালা টিনের ঘরে চলছে এ পাঠশালার পাঠদান। বেড়াহীন এ পরিত্যাক্ত টিনের ঘরটি যেন পাঠশালার কোমল শিশুদের কোমল আদুরে ছোঁয়া পেয়ে প্রানের দেখা পেয়েছে। এখন এ পাঠশালার শিশু শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৪৫ জনে দাঁড়িয়েছে। এ সকল অবহেলিত শিশুরা এখন পেয়েছে অবহেলা থেকে মুক্তি পথের দেখা। প্রতিদিন দুপুর তিনটা থেকে পাঁচটা পর্যন্ত পাঠদান ও শুক্রবার সকাল নয়টা থেকে এগারোটা পর্যন্ত সংস্কৃতি কার্যক্রম সম্পাদন করা হয়। কোন আর্থিক প্রত্যাশা না করে মেহেদী, রুবেল গাজী, শুভ্র, মোমেন, জুয়েল, মাহবুব, তানভীর, শাহবুদ্দিন, আরিফ, অনা, আফসানা, মদিনা সরকারের মত অনেকই এই পাঠশালায় আগামী দিনের পথপ্রদর্শক শিশুদেরকে পাঠদানের মাধ্যমেই শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে চান।
সিয়াম, আবির, ঝুমা, শারমিন, সোহেল এরা এই পাঠশালার শিশু শিক্ষার্থী। এখানে পড়তে কি রকম লাগছে জানতে চাইলে সবাই অশিক্ষার ভীত কাপিঁয়ে দিয়ে সমস্বরে বলল ‘ভাল’। আসলে ভাল না লেগে উপায় কি? এসব শিক্ষার্থীরা ছিল ছন্নছাড়া। বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছের এলাকা হলেও এখানে শিক্ষার আলো কাছে নয়। এলাকার সবাই যেন শিক্ষা নিয়ে তেমন চিন্ত করছে না। নিয়তি যেমন চায়, তেমনি নিয়তির হাতে ছেড়ে দিয়ে পার পেতে চাইছে এখানের সকল নর-নারী। কিন্তু নিয়তি তো সব সময় যে সকলের ভাল চাইবে তা তো নয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের এলাকায় শিক্ষার অধিপত্য থাকবে না, এটা হয় না এমন চিন্তা থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষার্থী এ পাঠশালার মাধ্যমে এলাকার লোকদেরকে সচেতন করে যাচ্ছেন। এভাবে কতটুকু শিক্ষার আলো ছড়ানো যাবে এমন প্রশ্নের জবাবে এ পাঠশালার শিক্ষকরা বলেন, এভাবেই বাংলাদেশ এক সময় এগিয়ে যাবে। প্রতিটি মানুষ যদি তার পাশের মানুষদের শিক্ষা সচেতন করে তাহলে বাংলাদেশে অশিক্ষা বলে কোন শব্দ বস্তবে পাওয়া যাবে না। বিশ্ববিদ্যালায়ের শিক্ষার্থীরা অনেক চিন্তাশীল, তার চিন্তা থেকে একটু ছাড়িয়ে দিলে ঐটুকু দিয়ে অনেকেই সারা জীবনের জন্য সামনে এগিয়ে যাবে। ‘প্রজন্ম শিশু পাঠশালা’ হলো ‘বিদ্যাসগর উন্মুক্ত পাঠাগার’ এর একটি সহশিক্ষা কার্যক্রম। এ পাঠাগার থেকে পাঠশালার মত আরও অনেক কার্যক্রম চালান হয়। ‘বিদ্যাসাগর উন্মুক্ত পাঠাগার’ ও ‘প্রজন্ম শিশু পাঠশালা’র প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মোঃ ইমামা হোসেন বলেন, ‘ আমাদের দেশে এখনও অনেক শিশু শিক্ষা থেকে বঞ্চিত। আমরা যদি কিছু শিশুকে অশিক্ষার ছায়া থেকে বের করে আনতে পারি এক সময় শিক্ষা বঞ্চিত শিশুর সংখ্যা কমে যাবে। আমরা যে দেশের সন্তান সেখানে শিক্ষাই হলো বড় অস্ত্র।’
ইমাম হোসেনের মত ‘প্রজন্ম শিশু পাঠশালা’ এর সকল শিক্ষকরাই এমনটি মনে করেন যে, বাংলাদেশ সত্যিই পথ না হরিয়ে সঠিক পথে যাবে । নিজেদের ও সমাজের বিত্তশীলদের সহযোগীতায় চলে এ পাঠশালা। এক সময় এ পাঠশালা নিজেদের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করবে এমনটি আশা করেন তারা। ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি।’ কথাটি কত সহজেই বলা যায় কিন্তু সবাই কি আর মনে প্রানে ও কাজের মাধ্যমেই ভালবাসার সৈাভাগ্য অর্জণ করে? এ পাঠশালা সংশ্লিষ্ট সকলেই মনে ও কাজে সোনার বাংলাকে ভালবাসতে পেড়েছে। এভাবে সামনের দিকে ‘প্রজন্ম শিশু পাঠশালা’।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।