কাজী নজরুল ইসলামের রাজনৈতিক গান

বাংলা গানের সূচনা চর্যাগীতিতে হলেও পদাবলী কীর্তনে এসে এর সঙ্গীতরূপটি প্রতিষ্ঠা লাভ করে। বাংলা গানের ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলামের (১৮৯৯-১৯৭৬) অবস্থান ও গানের প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলা গানের জগতে নজরুল ইসলাম ছিলেন একাধারে গীতরচয়িতা, সুরকার ও গায়ক। সাধারণ ভাষায় ইংরেজ আগমনের পূর্বে বাংলাদেশের নব্বই ভাগ কবিতাই ছিলো গান। কাজী নজরুল ইসলামের ধর্মনিরপে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক বিষয়ে ব্যক্তিগত ভিন্নমত তাঁর জীবনযাপনে, কর্মতৎপরতায় ও সৃজনশীলতার মধ্যে প্রতিফলিত। এই ভিন্নমত সত্তাকে উপমহাদেশের বিরুদ্ধ স্রোতের প্রতিনিধিত্বকারী ব্যক্তি হিসেবে নজরুল ইসলামকে চিহ্নিত করা যায়। বাংলা গানের মাধ্যমে নজরুল ইসলামকে কোন কোন আদর্শের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হয়েছিলো এবং এক্ষেত্রে তাঁর রচিত বিভিন্ন ধরনের গানের মধ্যে রাজনৈতিক গানগুলো কেমন ছিলো তা দেখা যেতে পারে।

অষ্টাদশ শতকের প্রথম দিক থেকেই মোগল সা¤্রাজ্যের দুর্দিন ঘনিয়ে আসতে থাকলে সঙ্গীত শিল্পীগণ বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়তে থাকেন। ক্রমে তাঁদের অনেকেই বাংলায় আসেন। ইংরেজ শাসনাধীন ভারতবর্ষের সর্বাদিক গুরুত্বপূর্ণ নগররূপে কলকাতার অভ্যুদয় ঘটে। এর পর এই নগরই বাংলার সর্বপ্রধান সঙ্গীত সংস্কৃতি কেন্দ্ররূপে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। নজরুল ইসলাম জন্মেছিলেন অতি দরিদ্র পিতৃগৃহে। প্রাণে বেঁচে থাকার জন্য কঠোর সংগ্রামই ছিলো সেখানকার বড় চ্যালেঞ্জ। গ্রাম্য লেটোর দলের সংস্পর্শে কেটেছে নজরুলের কিছুটা সময়। এর পরবর্তী জীবনও কেটেছে দারিদ্র্যে, সংগ্রামে আর সঙ্কটে। এসব পরিবেশ সাথে নিয়েই পরবর্তীতে হিন্দুস্তানি গান ভেঙে উৎকৃষ্ট কাব্যগীতি রচনাতেই নজরুল শ্রেষ্ঠতম সাফল্য লাভ করেছিলেন।

নজরুলসঙ্গীতের বৈশিষ্ট্য নজরুলের স্বাভাবিক বিকাশের অন্তর্গত যা নজরুলের মৌলিক সঙ্গীতকৃতি। পদ্ধতিগতভাবে তালিম নেওয়ার অবকাশ তাঁর কখনো হয়নি। শৈশবে লেটোর দলে গান রচনার শিক্ষা নিয়েছিলেন বজলে করিম ও শেখ চকোর গোদার নিকট। স্কুলে পড়বার সময় সঙ্গীতের অনুপ্রেরণা দেন শিক্ষক সতীশচন্দ্র কাঞ্জিলাল। ৪৯নং বাঙালি পল্টনে যোগ দিয়ে করাচি গিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে মিলেমিশে গান বাজনা করেন। সেখানে দুএকটি পাশ্চাত্য যন্ত্রবাদনও আয়ত্ত করেন। কলকাতা ফেরার প্রায় এক দশক পরে আসেন গ্রামোফোন কোম্পানির পরিবেশে। গ্রামোফোন কোম্পানিতে এসে তাঁর কাজ শতগুণে বেড়ে যায়।

নজরুল ইসলামকে মোটা দাগে পাঁচ ধরনের রণশীলতার বিরুদ্ধে ভিন্নমত পোষণ করতে হয়েছিলো। যেমন, ভারতে বৃটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে (১৮৯৯-১৯২০), ব্রিটিশবিরোধী রাজনীতিতে গান্ধীবাদী আদর্শের বিরুদ্ধে (১৯২০-১৯৩০), ইসলামি রণশীলতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে (১৯৩০-১৯৪২), হিন্দু সামাজিক ও সাংস্কৃতিক রণশীলতার বিরুদ্ধে এবং রবীন্দ্র নামধারী সমকালীন সাহিত্যিক আদর্শের বিরুদ্ধে (পুরো জীবনকালের বিভিন্ন সময়ে)। ১৯২০ থেকে ১৯৩০ সাল পর্যন্ত নির্ধারিত সময়কালই ছিলো নজরুল ইসলামের ভিন্নমত প্রকাশের সবচেয়ে মোম সময়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন পৃথিবীব্যাপী রাজনৈতিক আর্থিক সামাজিক বিপর্যয় দেখা দেয়। ১৯৪৭ সালে ভারতভাগ হলে বাংলার রাজনৈতিক-সামাজিক পরিস্থিতিতে প্রবল ভাঙাগড়া চলতে থাকে।

নজরুলের ভিন্নমত পোষণের জীবনাভিজ্ঞতা পরিপুষ্ট ও বিকশিত হয়েছিলো সেনাবাহিনিতে যোগদান করে। নিজে সামান্য ফার্সি ভাষা জানতেন। সেনাবাহিনিতে থাকলেও তাঁকে যুদ্ধে যেতে হয়নি। ফলে বিস্তর সময় পেয়ে তখন ইরানের দার্শনিক ও সাহিত্যিকদের ভিন্ন মতাদর্শের সঙ্গে গভীর পরিচিতি লাভ করেন। এ সময়েই তিনি রাশিয়ার সমাজতান্ত্রিক বলশেভিক আন্দোলনের সঙ্গে পরিচিতি লাভ করেন। এই সংযোগের বামপন্থি কমরেড মুজফ্ফর আহমদসহ বামপন্থি বন্ধুদের ঘনিষ্টতায় আসেন নজরুল। বিশ দশকের সূচনায় নজরুলের রাজনৈতিক ভাবদ্রোহের অনেকটাই এই আন্দোলনের প্রভাবজাত। কেননা, সমাজতান্ত্রিক আদর্শের সঙ্গে সমকালীন ইংরেজ শাসকদের, হিন্দু ও মুসলমানের ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির, স্বাধীনতা আন্দোলনের অহিংস প্রকৃতির, এমনকি সাহিত্যের শিল্পসর্বস্বতার প্রতি আনুগত্যের বিরোধ ঘটা ছিলো খুবই স্বাভাবিক। নজরুল ইসলামের েেত্রও তাই ঘটে।

নজরুলের উদ্দীপনামূলক রাজনৈতিক গান একাধিক ঐতিহাসিক অনুষঙ্গের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এবং তা সমকালের রাজনৈতিক কর্মীদের উদ্বুদ্ধ ও অনুপ্রাণিত করতো। এ প্রসঙ্গে দিলীপকুমার রায় স্মৃতিচারণ করে বলেন, কাজী নজরুলের গান শুনে বিচলিত হয়ে পড়তেন বিখ্যাত রাজনৈতিক ব্যক্তিগণ। যেমন রাম মোহন লাইব্রেরিতে, ওভারটুন হলে, ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউটে নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু ও দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন নজরুলের শিকল পরার গান শুনে বিচলিত হয়ে উঠেছিলেন। এসময় নজরুলের গাওয়া আত্মোৎসর্গের গান :

এই শিকল পরা ছল মোদের এই শিকল পরা ছল
এই শিকল পরেই শিকল তোদের করব রে বিকল।
অথবা,
ওরে ক্রন্দন নয় বন্ধন এই শিকল ঝন্্ঝনা
ওরে মুক্তি পথের অগ্রদূতের চরণবন্দনা
এই লাঞ্ছিতেরই অত্যাচারকে হানছে লাঞ্ছনা
মোদের অস্থি দিয়েই জ্বলবে দেশে আবার বজ্রানল।

কাজী নজরুল ইসলাম এমন গান গাইতেন যে, ভাঙ্গা গলাকেও ভাঙ্গা মনে হতো না, আগুন ছুটিয়ে দিতেন তিনি। জেলের ভেতরেও নেতাজী সুভাষচন্দ্রকে আরো বিচলিত করেছিলো কাজী নজরুলের গান :
কারার ঐ লৌহকপাট
ভেঙ্গে ফেল কররে লোপাট
রক্তজমাট শিকলপূজার পাষাণবেদী।

একথা নিঃসঙ্কোচে বলা চলে যে, নজরুল জেলে না গেলে কখনোই লিখতে পারতেন না এমন প্রাণজাগানিয়া গান :
তোমরা ভয় দেখিয়ে করছ শাসন, জয় দেখিয়ে নয়
সেই ভয়ের টুটিই ধরব টিপে করব তারে লয়,
মোরা আপনি মরে মরার দেশে আনব ভরাভয়
মোরা ফাঁসি পরে আনব হাসি মৃত্যুজয়ের ফল।
অথবা,
তাদেরি উষ্ণ শোনিত বহিছে আমাদেরও এই শিরা-মাঝে,
তাদেরি সত্য-জয়-ঢাক আজি মোদেরি কণ্ঠে ঘন বাজে
সম্মান নহে তাহাদের তরে ক্রন্দন-রোল দীর্ঘশ্বাস,
তাহাদেরি পথে চলিয়া মোরাও বরিব ভাই ঐ বন্দি-বাস॥
….
শিকলে যাদের উঠেছে বাজিয়া বীরের মুক্তি-তরবারি,
আমরা তাদেরি ত্রিশ কোটি ভাই, গাহি বন্দনা-গীতি তারি॥

নেতাজী সুভাষচন্দ্রের অত্যন্ত পছন্দের গান যা নজরুলের কণ্ঠে শুনে তাঁর মুখ আবেগে রাঙা হয়ে উঠতো––

দুর্গম গিরি কান্তার মরু দুস্তর পারাবার
লঙ্ঘিতে হবে রাত্রি নিশীথে যাত্রীরা হুঁশিয়ার।

ফাঁসির মঞ্চে গেল যারা জীবনের জয় গান,
আসি অলক্ষ্যে দাঁড়ায়েছে তাঁরা, দিবে কোন বলিদান?

অথবা,

(তোরা)         পথের কুকুর দু’কান-কাটা মান-অপমান নাইকো জ্ঞান।
(তাই)         যে জুতোতে মারছে গুঁতো করছ তাকেই তৈল দান॥
(তোরা)        নাক কেটে নিজ পরের যাত্রা ভঙ্গ করিস বুদ্ধিমান।
(তোদের)         কে যে ভাল কে যে মন্দ সব শিয়ালই এক সমান॥

নজরুল ইসলামের কিংবদন্তিতুল্য জীবনদর্শনের স্বরূপ দেখা যায় যখন তিনি দেশামাতৃকার টানে দেশমাতৃকাকে দশভুজা দেবীতে পাল্টে দেন। দেশ ও জাতির জন্য বহু আকাক্সিক্ষত সময়ে উপযুক্ত প্রতিক্রিয়ায় ১৯২২ সালের ২৬শে সেপ্টেম্বরের ‘ধূমকেতু’তে “আনন্দময়ীর আগমনে” প্রকাশিত কবিতায় নজরুলের জীবনবোধ পাওয়া যায় :

আর কতকাল থাকবি বেটী মাটির ঢেলার মূর্তি আড়াল?
স্বর্গ যে আজ জয় করেছে অত্যাচারী শক্তি চাঁড়াল।
দেব-শিশুদের মারছে চাবুক, ধীর যুবাদের দিচ্ছে ফাঁসি,
ভূ-ভারত আজ কসাইখানা, আসবি কখন সর্বনাশী?
দেব-সেনা আজ টানছে ঘানি তেপান্তরের দীপান্তরে
রণাঙ্গনে নামবে কে আর তুই না এলে কৃপাণ ধরে?

নজরুল বিদেশি শাসকদের অন্যায় অত্যাচারের কথা যেমন তাঁর গানে উল্লেখ করেছেন, তেমনি বিদেশি অত্যাচারের অবসানও কামনা করেছেন। নজরুলের এ জাতীয় ঐক্যবোধ সকল মানুষের ঐক্য। মানুষের প্রতি তাঁর আস্থা সমগ্র মানব পরিবারের প্রতিই আস্থা। আর তাঁর বিদ্রোহ সমস্ত অন্যায়ের বিরুদ্ধেই বিদ্রোহ। কাজী নজরুল সম্পর্কে নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর গুরুত্বপূর্ণ মতামত, নজরুল ইসলাম যা রচনা করেছেন তার সঙ্গে তাঁর বাস্তব অভিজ্ঞতাপ্রসূত অনুভূতির সম্পর্ক রয়েছে। ইংরেজশাসন বিরোধী তাঁর যেসব রচনা, সেসব আন্দোলন থেকে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থানকারী কেনো কবির রচনা নয়, নিজে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছেন, জেল খেটেছেন, জুলুমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন, দীর্ঘ অনশন পালন করেছেন, এমন কবির রচনা সেসব। সুতরাং এ একেবারে প্রাণের গভীর থেকে প্রত্যক্ষ প্রেরণায় বেরিয়ে আসা বস্তু। এই বৈশিষ্ট্যটুকু নজরুলের গান, কবিতা বা অন্যান্য রচনার ব্যাপারে খুবই লক্ষ করবার মতো।

 

লেখক :
ড. জি. এম. মনিরুজ্জামান
বাংলা বিভাগ
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লা।
ফোন : ০১৯১৭-০৭৭৪০১
ই-মেইল : [email protected]

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।