২০১২ সালে গণধর্ষণ ১৫৭, ধর্ষণের পর হত্যা ১০৬: অধিকার

বিদায়ী বছর ২০১২ সালে বাংলাদেশে রেকর্ড পরিমাণ নারী ও শিশু ধর্ষিত হয়েছে। এক বছরে ৭৭১ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। যাদের মধ্যে ২৩৯ জন নারী, ৩৮৪ জন শিশু। বাকিদের নাম ও বয়স জানা যায়নি। এদের মধ্যে ১৫৭ জনই গণধর্ষণের শিকার। আর ধর্ষণের পর ১০৬ জনকে হত্যা করা হয়। আবার ধর্ষণের অপবাদ নিয়ে ২৩০ জন আত্মহত্যাও করেন। মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের জরিপে এসব তথ্য ওঠে এসেছে। জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অধিকারের এ রিপোর্ট অনুযায়ী এ সময়ে নয়জন নারী ও শিশু আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের দ্বারা ধর্ষিত হয়েছে।

ধর্ষণের প্রতিবাদে আন্দোলনের মুখে ভারত যখন অচল, ১৪৪ দিয়েও জনগণকে থামিয়ে রাখা যায়নিঠিক একই ঘটনা বাংলাদেশেও ঘটে গেল তেমনি এক ঘটনা। গত ৭ ডিসেম্বর থেকে ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৫ বছর বয়সের এক কিশোরী ময়নাকে মধুপুরের পাহাড়ি এলাকার একটি বাড়িতে আটকে রেখে ধর্ষণ করে চার ব্যক্তি। এদের সহযোগিতা করে ধর্ষিতা মেয়েটির বান্ধবী বীথি।

১০ ডিসেম্বর সদর উপজেলার রসুলপুর রেললাইনের ওপর তাকে রেখে যায়। পরে অচেতন অবস্থায় রেললাইন থেকে তাকে উদ্ধার করে টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে ওসিসির সমন্বয়কারী ডা. বিলকিস বেগম জানান, বুধবার ৯টায় মেয়েটির ফরেনসিক করা হয়েছে। মেয়েটির ওপর শারীরিক এবং মানসিকভাবে অনেক নির্যাতন করা হয়েছে। যার ফলে মেয়েটি এখন ভারসাম্যহীন অবস্থায় আছে বললেই চলে।

ভারতে বাড়ির চিলেকোঠা থেকে চায়ের দোকান এমনকি প্রশাসন ও রাজনীতিতেও ধর্ষণের প্রতিবাদের ঝড় উঠলেও, বাংলাদেশে এখনো কোনো প্রতিক্রিয়াই লক্ষ্য করা যায়নি। বরং এ দেশের জনগণ পশ্চিমা কায়দায় ২০১৩ পালন করছে। অন্যদিকে ভারতীয়রা নিজেদের বর্ষবরণের আয়োজন থেকে তাদের সরিয়ে নেয়।

মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট আদিলুর রহমান নতুন বার্তা ডটকমকে বলেন, “প্রশাসনে দলীয় লোক থাকার কারণে এসব ঘটনায় অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় পার পেয়ে যায়। এছাড়া ফৌজদারী আইনের দুর্বলতা থাকার কারণেও অপরাধীদের উপযুক্ত শাস্তি হয় না। যার কারণে অপরাধ বেড়ে যাচ্ছে।”

তিনি বলেন, “অপরাধ প্রতিরোধের জন্য জনগণের প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। তাহলেই এরা শাস্তি পাবে। যেভাবে সীমা হত্যার বিচারের দাবিতে জনগণ প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল।”

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম বলেন, “নারী নির্যাতন বন্ধ করতে সম্মিলিতভাবে আন্দোলন করতে হবে। পাঠ্যপুস্তকে লিঙ্গ বিষয়টি আনতে হবে। বিচ্ছিন্নভাবে নয়, প্রত্যেককে এই আন্দোলনে যুক্ত হতে হবে।”

অপরাধকারীরা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের হলেই তারা পার পেয়ে যান। ময়নাকে ধর্ষণ করে টাঙ্গাইলের যুবদল নেতা মনির ও তার সহযোগীরা। গত বছরের ৪ জানুয়ারি ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীকে সাতক্ষীরা জেলা ছাত্রলীগ সভাপতি জুয়েল হাসান ও সাধারণ সম্পাদক পলাশ কমার্স কলেজের বিবিএ’এর ছাত্রীকে ধর্ষণ করেন।

যাদের কাছে অভিযোগ দাখিল করবে, যারা মানুষের বিপদের সাথী হবে, সেই আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের কাছে অভিযোগ নিয়ে গেলে সেখানেও পুলিশ হেফাজতে ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে অহরহ। ২১ আগস্ট খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার কার্বারীপাড়ার ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ১১ বছরের শিশু অটল টিলা পুলিশ ক্যাম্পের পাশে গরু চরাতে যায়। সেখানে ওই পুলিশ ক্যাম্পের কনস্টেবল রাসেল রানা তাকে ধর্ষণ করে।

এসব ঘটনায় সমাজের বিশিষ্টজনেরা উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেন। তবে যাদের এ ব্যাপারে তৎপর হওয়া বেশি প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এসব ব্যাপারে তেমন কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ে না। কর্তপক্ষ সচেতন ও আন্তরিক না হলে ধর্ষণের মতো জঘন্য ঘটনা এড়ানো সম্ভব নয় বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।