বাংলাদেশে সাংবিধানিক নিরাপত্তা এখন কাগুজে নির্দেশনা ছাড়া আর কিছুই নয়: এএইচআরসি

২০১২ সালে বাংলাদেশ জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলের সদস্য ছিল। ঠিক এ রকম একটি আন্তর্জাতিক মঞ্চে থেকে বাংলাদেশ তাদের আন্তর্জাতিক মান অনুসারে নিজেদের নাগরিকদের মানবাধিকার রক্ষা করতে পারেনি। যদিও বাংলাদেশ (বরাবরে মতো) দাবি করে এসেছে, গণতন্ত্র এবং আইনের শাসনের মধ্য দিয়ে সব ধরণের মানবাধিকার রক্ষার উপকরণাদি তাদের রয়েছে। (অথচ) বাংলাদেশে নির্যাতন-বান্ধব ও দুর্নীতি পরায়ণ পুলিশি ব্যবস্থা চলমান। এ ব্যবস্থাকে তাই শীঘ্রই ঢেলে সাজানো দরকার। কারণ, এখানে নির্যাতন একটি অহরহ ব্যাপার এবং সাংবিধানিক নিরাপত্তা এখন কাগুজে নির্দেশনা ছাড়া আর কিছুই নয়।

নির্যাতিতদের সহায়তায় জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক দিবস উপলক্ষে এশিয়ান মানবাধিকার কমিশনের (এএইচআরসি) নির্বাহী পরিচালক বিজো ফ্রান্সিস জাতিসংঘ হাই কমিশনের নেভি পিলায়কে এক খোলা চিঠিতে এ কথাগুলো লিখেছেন।

খোলা চিঠিতে ফ্রান্সিস দাবি করেছেন, তিনি নিজের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই এই দাবিগুলো উত্থাপন করেছেন। চিঠিতে বাংলাদেশের সংবিধানের কথা বলা হয়েছে। যেখানে মানবাধিকারকে মৌলিক দাবি হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়েছে। চিঠিতে উঠে এসেছে ৩৫ নং অনুচ্ছেদের কথা। এই অনুচ্ছেদে নাগরিকদের বিচারের ও দণ্ড প্রসঙ্গে বলা হয়েছে। এর ভিত্তিতেই বিচারিক ব্যবস্থার কথা উঠে এসেছে। পুলিশসহ অন্যন্য অঙ্গসংগঠনগুলোকেও দেয়া হয়েছে নির্দেশনা।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের তৃতীয় ভাগে [৩৫ (৫)] মৌলিক অধিকারের বিষয়ে উল্লেখ আছে, ”কোনো ব্যক্তিকে যন্ত্রনা দেওয়া যাইবে না কিংবা নিষ্ঠুর, অমানুষিক বা লাঞ্ছনাকর দণ্ড দেওয়া যাইবে না কিংবা কাহারও সহিত অনুরূপ ব্যবহার করা যাইবে না।”

পুলিশ, ম্যাজিস্টেসিসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারেও দেশের সর্বোচ্চ বিচারালয়ের নির্দেশনা রয়েছে।

চিঠিতে জানানো হয়, দুঃখজনক হলেও নির্যাতন এবং বিচার প্রসঙ্গে এমন সাংবিধানিক নিরাপত্তা কাগুজে নির্দেশনা ছাড়া আর কিছুই নয়। কারণ বাংলাদেশি নাগরিকদের জীবনে এসবের কোন বাস্তবিক প্রয়োগ নেই, বিশেষত যেখানে নির্যাতন খুবই অহরহ একটি বিষয়।

নির্যাতন কবলিত বাংলাদেশে পুলিশ এবং হয়রানির সমার্থক শব্দ হয়ে গেছে। পুলিশ বা অন্যকোন রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সংস্থা কাউকে আটক করলে তখন থেকেই নির্যাতন শুরু হয়। পুলিশ খুব কম সময়ই আদালত সমর্থিত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা দেখায়। গ্রেপ্তারি পরোয়ানা না দেখিয়েই আটক করে পুলিশ। আটক, আটক-পরবর্তী হয়রানি এবং তাৎক্ষণিক নির্যাতনের ভয়ে অনেকেই পুলিশকে গ্রেপ্তার বিষয়ে চ্যালেঞ্জ করেন না। কারাগারে আটককালীন সময় যত দীর্ঘ হয় তত পুলিশি নির্যাতনে প্রাণ খোঁয়ানোর ভয় বাড়তে থাকে। অনেক সময় স্থায়ী পঙ্গুত্ব বরণের ঘটনাও ঘটে। সুতরাং, এই অবৈধ গ্রেপ্তার ও আটক প্রসঙ্গে চুপ করে যান নাগরিকেরা।

পেশাদারিত্বের ধারণা থেকে বাংলাদেশের পুলিশ ব্যবস্থা অনেক দূরে। জিঞ্জাসাবাদের ক্ষেত্রে পুলিশের মূল অস্ত্র শারীরিক নির্যাতন। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর পেশাদারী অদক্ষতার কারণে তদন্ত সমাধানে এরা বহুলাংশে নির্যাতনের উপর নির্ভরশীল যা ‘থার্ড ডিগ্রি’ নামে পরিচিত। অথচ সংবিধানের ৩৫ নং অনুচ্ছেদে এ ব্যাপারে স্পষ্ট প্রতিবিধান দেয়া আছে।

অপরাধ তদন্ত সমাধানে আবশ্যকভাবে নির্যাতনের সাহায্য নেয়া হয়। অনেকটা এমন যে গ্রেপ্তারের পরই নির্যাতন করা হবে বলে আশা করা হয়। বাংলাদেশের পুলিশ প্রাতিষ্ঠানিকভাবেই দুর্নীতিগ্রস্ত। ঘুষের জন্যও নির্যাতনের আশ্রয় নেয় পুলিশ। পুলিশের দৈনিন্দিন জীবিকা নির্বাহের চাহিদা পূরণে সাধারণ মানুষ তাদের ঘুষ প্রদানে বাধ্য থাকে। তাছাড়া পেশাগর অপরাধীদের কাছ থেকে পুলিশ নিয়মিত হারে ঘুষ পেয়েই থাকে। টাকার জন্য (নীরিহ লোকজনকে) অপরাধ কার্যক্রমের তালিকায় ঢুকিয়েও তাদের হয়রানি করা হয়।

আধাসামরিক বাহিনী RAB, পুলিশ ও অন্যান্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কর্মকর্তারা তাদের ‘দায়মুক্তি’ সুবিধা ভোগ করে। ধনাঢ্য ব্যক্তি, ব্যবসায়ী, প্রবাসী নাগরিক, শিল্পপতি এদের প্রতি নজর রাখা হয়। এদের বাড়ি, কার্যালয় তল্লাশীর নামে অনেককে আটক করা হয়। টাকার দাবিতে আটকেও রাখা হয়। চাহিদা মোতাবেক টাকা পরিশোধ করতে পারলেই আটককৃত ব্যক্তি ছাড়া পান। এবং আটক থাকাকালীন সময় গুম বা ক্রসফায়ারের ভয়সহ নির্যাতনের শিকার হন অনেকে।

বাংলাদেশে পুলিশ কর্মকর্তারা নিজেদের স্ত্রী, সন্তান অথবা শ্বশুড়ের নামে অবৈধ সম্পদ গড়েন। সেখানে প্রাতিষ্ঠানিক কোন প্রক্রিয়া নেই যা পুলিশের এইসব কর্মকাণ্ডকে আটকাবে। চেইন অব কমান্ড পর্যায়ক্রমে চেইন অব করাপসনে পরিণত হয়।


সম্পাদনা: শামীম ইবনে মাজহার,নিউজরুম এডিটর

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।