হলমার্কসহ আরও কয়েক প্রতিষ্ঠানের অর্থ আত্মসাতের ঘটনা চিহ্নিত

হলমার্ক কেলেঙ্কারির সঙ্গে কেবল সোনালী ব্যাংক নয়, জড়িত রয়েছে রাষ্ট্রমালিকানাধীন আরও দুই ব্যাংক। জনতা ও অগ্রণী ব্যাংকও বিশেষ আর্থিক সুবিধা দিয়েছে হলমার্ক গ্রুপকে। বাংলাদেশ ব্যাংক পরিদর্শন করে দেখেছে, এই দুই ব্যাংকের কর্মকর্তারা সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা (সাবেক শেরাটন হোটেল) শাখার কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশ করে হলমার্ক গ্রুপকে নানা ধরনের অবৈধ সুবিধা দিয়েছেন।
হলমার্ক নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হলেও এর বাইরে আরও কয়েকটি অখ্যাত প্রতিষ্ঠান দেড় হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থ এই তিন ব্যাংক থেকে তুলে নিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শন অনুযায়ী, সোনালী ব্যাংকের গুলশান ও আগারগাঁও শাখা, জনতা ব্যাংকের করপোরেট শাখা ও স্থানীয় কার্যালয় (লোকাল অফিস) এবং অগ্রণী ব্যাংকের প্রধান (প্রিন্সিপাল) শাখায় অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক এ ক্ষেত্রে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং আত্মসাৎ করা অর্থ শ্রেণীবিন্যাস করার নির্দেশ দিয়ে তিন ব্যাংককেই চিঠি দিয়েছে।
প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব নেই, অথচ ঋণ দেওয়া হয়েছে। যদিও ঋণ নেওয়ার সময় উৎপাদন চলছে বলে ব্যাংক প্রতিবেদন দিয়েছিল। আবার রপ্তানি না করেও অর্থ তুলে নিয়েছে হলমার্কসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। ক্রেতা-বিক্রেতা একই প্রতিষ্ঠান, কিন্তু ঋণসুবিধা দেওয়া হয়েছে উভয়কেই। এভাবে নানা ধরনের অনিয়ম করে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে ব্যাংকগুলো থেকে।
সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা শাখায় হলমার্কের জালিয়াতির ঘটনা ঘটলেও বিভিন্ন ব্যাংক থেকে স্থানীয় ঋণপত্র খোলা হয়েছে, যার স্বীকৃতি দিয়েছে রূপসী বাংলা শাখা। মোট ৩৯টি ব্যাংক থেকে এ ধরনের কাজ করা হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি ব্যাংক গ্রাহকের সঠিক পরিচিতি (কেওয়াইসি-নো ইউর কাস্টমার) না জেনেই ঋণসুবিধা দিয়েছে। এ রকম কিছু ব্যাংকের অর্থ এখন আটকে গেছে বলে জানা গেছে। এর মধ্যে জনতা ও অগ্রণী ব্যাংক অন্যতম।
জনতা ব্যাংক: জনতা ব্যাংকের করপোরেট শাখায় আনোয়ারা স্পিনিং মিলস ও ম্যাক্স স্পিনিং মিলের নামে দুটি হিসাব খোলা হয় ২০১১ সালের ৮ জুন। নথি অনুযায়ী, আনোয়ারা স্পিনিং মিলের মালিক জাহাঙ্গীর আলম এবং ম্যাক্সের মালিক মীর জাকারিয়া। এই দুই হিসাবের পরিচয়দানকারী ববি স্পিনিং মিলের মালিক তানভীর মাহমুদ। তিনি আবার হলমার্ক গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি)। জনতা ব্যাংকের করপোরেট শাখা ওই দুই প্রতিষ্ঠানের নামে হিসাব খোলার পরপরই তাদের বিল কেনা শুরু করে। বিলে দেখানো হয়েছে, হলমার্ক ফ্যাশনসহ এই গ্রুপের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠান স্থানীয়ভাবে সুতা আমদানির জন্য আনোয়ারা ও ম্যাক্স স্পিনিংয়ের অনুকূলে সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা শাখায় স্থানীয় ঋণপত্র স্থাপন করে। জনতা ব্যাংকের করপোরেট শাখা এই বিল কিনে নেয় এবং সেই পরিমাণ অর্থ আনোয়ারা ও ম্যাক্স স্পিনিং মিলের হিসাবে জমা দিয়ে দেয়। এভাবে ওই দুই প্রতিষ্ঠান তুলে নেয় ৮৩ কোটি ৬৭ লাখ ৫৯ হাজার টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংক পরিদর্শন করে বলেছে, আসলে কোনো সুতাই কেনাবেচা হয়নি। বাস্তবে প্রতিষ্ঠান দুটির কোনো অস্তিত্বই নেই। কোনো সুতা কেনা হয়নি, ফলে রপ্তানিও হয়নি। অথচ কাগজ-কলমে সবই দেখানো হয়েছে। জনতা ব্যাংকের কাছে প্রতিষ্ঠান দুটি সম্পর্কে তথ্য চাওয়া হলে তারা তা দিতে পারেনি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, হলমার্ক গ্রুপ পুরোটা অর্থ সুকৌশলে হাতিয়ে নিয়েছে। এই অর্থ আত্মসাতের জন্য জনতা ব্যাংকের করপোরেট শাখার ব্যবস্থাপক আবদুস সালাম আজাদসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এবং আত্মসাৎ করা অর্থ শ্রেণীবিন্যাস করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জনতা ব্যাংকের স্থানীয় কার্যালয় প্রায় একইভাবে অর্থ আত্মসাতের সুযোগ করে দিয়েছে সোহেল স্পিনিং মিল নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠানকে। এ ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট ছিল সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা শাখা ও হলমার্ক গ্রুপ। হলমার্ক গ্রুপকে পণ্য রপ্তানির নামে অর্থ তুলে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হলেও বাস্তবে কোনো পণ্য রপ্তানি হয়নি। জনতা ব্যাংক যাচাই-বাছাই ছাড়াই সোহেল স্পিনিং মিলকে আর্থিক সুবিধা দেওয়ায় আটকা পড়েছে ২৬ কোটি ৫৯ লাখ টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জনতা ব্যাংকের করপোরেট শাখা সোহেল স্পিনিং মিল পরিদর্শন করা হয়েছে বলে একটি প্রতিবেদন কেন্দ্রীয় ব্যাংককে দিয়েছে। সেখানে প্রতিষ্ঠানটি চালু আছে বলা হলেও বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শক দল সেটি বন্ধ দেখে এসেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক জনতা ব্যাংককে সম্প্রতি একটি চিঠি দিয়ে বলেছে, সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা শাখার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশের মাধ্যমে ব্যাংকের বিপুল পরিমাণ অর্থ জালিয়াতিতে সহযোগিতা করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক এই অনিয়মের জন্য মহাব্যবস্থাপক ও শাখা ব্যবস্থাপক আমিনুল ইসলামসহ অন্যান্য কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস এম আমিনুর রহমান গতকাল শুক্রবার রাতে প্রথম আলোকে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা মেনে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ব্যবস্থা নিয়ে তা কেন্দ্রীয় ব্যাংককে জানিয়েও দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অধিকতর নিরীক্ষা করার জন্য উপব্যবস্থাপনা পরিচালককে প্রধান করে কমিটি করা হয়েছে। পুরো বিষয়টি পর্ষদকে জানানো হয়েছে বলেও জনতা ব্যাংকের এমডি জানান।
অগ্রণী ব্যাংক: কেন্দ্রীয় ব্যাংক অগ্রণী ব্যাংকের প্রিন্সিপাল শাখার ওপর পরিদর্শন করে সেখানেও ব্যাপকভাবে আর্থিক অনিয়ম পেয়েছে। পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্থানীয় বিল কেনার সীমা লঙ্ঘন করে ব্যাংকটির এই শাখা হলমার্ক গ্রুপ, প্যারাগন গ্রুপ ও নকশি নিট নামের তিনটি প্রতিষ্ঠানের বিল কিনছে। এ ক্ষেত্রেও স্বীকৃতি দিয়েছে সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা শাখা। এতে ৪২ কোটি ১৮ লাখ টাকা আটকে আছে। এর বাইরে বিটিএল, মাহিন টেক্সটাইল ও পিনাকল টেক্সটাইলকে একইভাবে ১৫৬ কোটি চার লাখ টাকার বিশেষ সুবিধা দিয়েছে অগ্রণী ব্যাংক।
অগ্রণী ব্যাংকের কাছে লেখা চিঠিতে বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শক দল গাজীপুরের একই ঠিকানায় প্রতিষ্ঠানগুলোর কারখানায় গিয়ে দেখেছে, সেখানে তুলা থেকে সুতা উৎপাদনের কোনো যন্ত্র নেই। অথচ কাগজ-কলমে তারা সুতা সরবরাহ করেছে বলে দেখায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের মন্তব্য হচ্ছে, সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা শাখা, অগ্রণী ব্যাংকের প্রিন্সিপাল শাখা এবং সংশ্লিষ্ট গ্রাহকপ্রতিষ্ঠান পারস্পরিক যোগসাজশে জালিয়াতির মাধ্যমে সুকৌশলে ব্যাংকের তহবিল বের করে নিয়েছে। এ ঘটনার জন্য শাখা ব্যবস্থাপক মিজানুর রহমান খানসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
সোনালী ব্যাংক: সোনালী ব্যাংকের আগারগাঁও শাখার বড় ধরনের অনিয়ম উদ্ঘাটন করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সেখানেও একইভাবে গ্রিন প্রিন্টার্স নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে সব ধরনের নিয়ম ও বিধি ভঙ্গ করে ১৪১ কোটি টাকার আর্থিক সুবিধা দিয়েছে। আগারগাঁও শাখা প্রতিষ্ঠানটির অনুকূলে ২০১১ ও ২০১২ সালে তিন শতাধিক ঋণপত্র খুললেও এর কোনো নথি সংরক্ষণ করা হয়নি। পরিদর্শন প্রতিবেদনে এগুলোকে ভুয়া ঋণপত্র মন্তব্য করে বলা হয়েছে, গ্রিন প্রিন্টার্সকে এভাবে অবৈধভাবে ও জালিয়াতি করে ১৪১ কোটি টাকার আর্থিক সুবিধা দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক এ ক্ষেত্রে বাইরের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিরীক্ষা করে দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে সোনালী ব্যাংককে নির্দেশ দিয়েছে।
এদিকে, সোনালী ব্যাংকের গুলশান শাখা থেকেও একইভাবে জালিয়াতি করে তুলে নেওয়া হয়েছে আরও ২৮১ কোটি টাকা। রোজবার্গ, এলএনএস গ্রুপসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে এই সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রেও দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা হচ্ছে বলে সোনালী ব্যাংক সূত্র জানায়।

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।