অনতিবিলম্বে সংঘাত বন্ধের জন্য জাতিসংঘের আহ্বান

বাংলাদেশে চলমান সংঘাত অনতিবিলম্বে বন্ধে সকল পক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘের সাতজন মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ। তাদের মধ্যে ছয় জন জাতিসংঘের ‘বিশেষ দূত’ (স্পেশাল র‌্যাপোর্টিয়ার) এবং অপর জন জাতিসংঘের একজন ‘বিশেষজ্ঞ’ মর্যাদার।
শুক্রবার সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের ওয়েবসাইটে ওই সাত দূতের আহ্বান ও উদ্বেগ সংবাদ হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, গত ৫ ফেব্রুয়ারি থেকে বাংলাদেশে বড় ধরনের প্রতিবাদ-সংঘাত সকলকে বিচলিত করছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সংঘাতের পথ ছেড়ে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করা উচিত।
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, প্রতিবাদ-সংঘাতের বেশিরভাগই হচ্ছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ও এর রায়কে ঘিরে। বিভিন্ন দলের সমর্থকদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘর্ষে এ পর্যন্ত ৮৮ জন নিহত ও কয়েকশ আহত হয়েছে। হিন্দু সম্প্রদায়ের সদস্যদের বাড়িতে ও উপাসনালয়ের পাশাপাশি সাংবাদিক ও অন্যান্য গণমাধ্যম কর্মীদের উপর হামলার ব্যাপারেও উদ্বেগ রয়েছে।
বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড বিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ দূত ক্রিস্টফ হেইন্স বলেন, ‘নিরস্ত্র মানুষের উপর আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারসহ নিরাপত্তা বাহিনীর মাত্রাতিরিক্ত বল প্রয়োগে বিপুল সংখ্যক নিহত হওয়ার ঘটনায় আমি চরম শঙ্কিত।’ তিনি বলেন, ‘আšতর্জাতিক আইন অনুযায়ী সংঘাতময় সমাবেশ ভাঙতে হলে আইন প্রয়োগকারীকে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের আগে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শন করতে হয়। কেবল মাত্র অন্য একটি জীবন রক্ষার উদ্দেশ্যেই আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করতে পারে।’ হত্যার ঘটনাগুলো যেই ঘটাক না কেন সেগুলোর দ্রুত, নিরপেক্ষ ও কার্যকর তদšেতর জন্য তিনি বাংলাদেশের প্রতি আহ্বান জানান।
মত প্রকাশের স্বাধীনতাবিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ দূত ফ্রাঙ্ক লা রুই চলমান সংঘাতে সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীদের আহত হওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘চলমান সংঘাত বাংলাদেশে সাংবাদিকদের নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। এর ফলে অšতত একজন ব্লগার নিহত ও বেশ ক’জন আহত হয়েছেন। বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষ ১২টি ওয়েবসাইট বন্ধ করে দিয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সাংবাদিক ও গণমাধ্যম কর্মীদের উপর যে কোনো হামলা ও ভীতি প্রদর্শন থেকে বিরত থাকতে আমি সকল পক্ষের প্রতি আহ্বান জানাই। একই সঙ্গে, আমি সকল পক্ষকে সংঘাতে মদদ দেওয়া থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানাই।’
ধর্মীয় স্বাধীনতাবিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ দূত হেইনার বেলেফেল্ডট হিন্দু সম্প্রদায়ের সদস্য ও তাদের উপাসনালয়ে হামলা প্রসঙ্গে বলেন, ‘আšতর্জাতিক মানবাধিকার আইনের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে সরকারকে অবশ্যই এই সম্প্রদায়ের অধিকার ও স্বাধীনতার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।’
আবাসনবিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ দূত র‌্যাকুয়েল রোলনিক ও ধর্মীয় স্বাধীনতাবিষয়ক বিশেষ দূত হেইনার বেলেফেল্ডট হিন্দু সম্প্রদায়ের সদস্যদের বাড়ি ও মন্দির ভাঙার ঘটনায় চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
সংখ্যালঘু ইস্যুবিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ রিটা ইসাক বলেন, ‘হিন্দু সম্প্রদায় বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হওয়ায় তাদের উপর হামলা অত্যšত উদ্বেগের বিষয়। বাংলাদেশের ইতিহাসে অতীতে বিভিন্ন সময় হিন্দু সম্প্রদায় সংঘাতের শিকার হওয়ার ঝুঁকিতে ছিল।’ তিনি আরও বলেন, ‘রাষ্ট্রকে অবশ্যই সংখ্যালঘুদের এবং তাদের জাতীয় বা সাংস্কৃতিক, ধর্মীয়, ভাষাগত ও জাতিগত পরিচয়ের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া দেশের টেকসই উন্নয়ন, ঐক্য ও স্থিতিশীলতা সৃষ্টির প্রক্রিয়ায় তাদের (সংখ্যালঘুদের) কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।’
সত্য ও ন্যায়বিচার উৎসাহিত করণবিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ দূত পাবলো ডি গ্রেইফ বলেন, ‘সরকারকে অতীতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের ন্যায় বিচার পাওয়া নিশ্চিত করতে হবে এবং ফৌজাদারি বিচারের মাধ্যমে আইনের শাসনের প্রতি জনগণের বিশ্বাস পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ফৌজদারি বিচার আইনের শাসনের সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে সঙ্গতিপূর্ণ হতে হবে। যথাযথ প্রক্রিয়ার অভাবে সকল রায় বিশেষ করে মৃত্যুদন্ড পাওয়া ব্যক্তিরা আবারো সংঘাত ও সামাজিক অবিশ্বাসের কারণ হয়ে উঠতে পারে।’
এর আগে গত ৭ ফেব্রুয়ারি বিচারক ও আইনজীবীদের স্বাধীনতাবিষয়ক বিশেষ দূত গ্যাব্রিয়েলা নাউল ও বিচারবহির্ভূত হত্যাবিষয়ক বিশেষ দূত ক্রিস্টফ হেইন্স আšতর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করার অভিযোগ ও ন্যায়বিচার পাওয়া নিয়ে শঙ্কা এবং যুদ্ধাপরাধের দায়ে মৃত্যুদন্ড দেওয়ার ব্যাপারে উদ্বেগ জানান।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।