ট্রাইব্যুনালকে ‘নাটক’ বলল পাকিস্তানি মিডিয়া

বাংলাদেশে মানবতাবিরোধী অপরাধে জামায়াতে ইসলামীর বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতার ফাঁসি ও যাবজ্জীবনের রায় ঘোষণার পর পাকিস্তানের মিডিয়া এর বিরুদ্ধে সরব হয়ে ওঠেছে। বিশেষ করে পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামী এই নিয়ে বিক্ষোভ মিছিলও করেছে। তবে ইসলামাবাদ ‘যুদ্ধাপরাধের বিচারটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়’ বলে মন্তব্য করেছে।

পাকিস্তানের মিডিয়ায় বাংলাদেশের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারটি কিভাবে দেখা হচ্ছে এর একটি নমুনা এখানে তুলে ধরা হলো। পাকিস্তানের প্রভাবশালী উর্দু দৈনিক জং-এ ‘বাংলাদেশ কা হায়াবাখতা নাটক’ (বাংলাদেশে ট্রাইব্যুনাল নাটক) শিরোনামে ১৯ জুলাই শুক্রবার একটি কলাম ছাপা হয়েছে। লিখেছেন পাকিস্তানের বিশিষ্ট কলামিস্ট ইরফান সিদ্দিকী। গোটা লেখাতেই ট্রাইব্যুনালকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা হয়েছে।

ইরফান সিদ্দিকীর লেখাটির হুবহু অনুবাদ
বাংলাদেশে আবারো শুরু হয়েছে সংঘাত-সংঘর্ষ। শেখ মজিবুরের মেয়ের মন-মস্তিষ্কে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনকারীরা যেন কাঁটা হয়ে বিঁধে আছেন। তিনি ভারতকে তার ‘উদ্ধারকর্তা’ হিসেবে মনে করেন। একবার শেখ হাসিনা ওয়াজেদ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পাকিস্তানে সফরে আসেন। পাকিস্তান প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎকালে আমারও উপস্থিত থাকার সুযোগ হয়েছিল। আমি তখন দেখেছি, ওই সাক্ষাতে পাকিস্তান-বাংলাদেশের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনার পরিবর্তে শেখ হাসিনা বার বার ভারতের পক্ষে ‘ওকালতি’ করছিলেন। কেউ তাকে না চিনলে কথা শুনে মনে করবেন তিনি যেন ভারতের রাষ্ট্রদূত।

তিনি ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের বাণিজ্য, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের তাগিদ দেন। তিনি বেশ ‘পটু’ ভাষায় কথা বলেন। হাসিনা বলেন, “দেখুন প্রেসিডেন্ট সাহেব, আমাদের শিক্ষক বলতেন, পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে কোনো কঠিন প্রশ্ন থাকলে তা বাদ দিয়ে সহজ প্র্রশ্নগুলোর উত্তর দেবে।” এর উত্তরে পাকিস্তানি প্রেসিডেন্ট বলেন, “তবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী! সব সহজ প্রশ্নের উত্তর যদি পাসের জন্য যথেষ্ট না হয় তাহলে কী করবো?” শেখ হাসিনা হেসে প্রসঙ্গ পাল্টে ফেলেন। সম্ভবত ওই সফরেই তিনি যখন প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন তখন পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই’র বিরুদ্ধে তিনি অভিযোগের পাহাড় তুলে ধরে বলেন, আইএসআই আমাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে সহযোগিতা করছে।

হাসিনার অন্তরে পাকিস্তানের ব্যাপারে একটি ক্রোধ সাপের মতো সার্বক্ষণিক দংশন করতে থাকে। পাকিস্তানের সঙ্গে ন্যূনতম কোনো সম্পর্ক আছে এমন ব্যক্তিকেও তিনি ঘৃণা করেন। জামায়াতে ইসলামী তার বিশেষ টার্গেট। এর একটি কারণ এটাও যে, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ, যে বিএনপি হাসিনার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। হাসিনা জামায়াতের এই ‘দোষ’ ক্ষমা করতে প্রস্তুত নন।

নানা সমস্যায় জর্জরিত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ২০১০ সালে একটি ‘নামধারী’ ট্রাইব্যুনাল স্থাপন করেন, যাকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল হিসেবে নামকরণ করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হিসেবে বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালে যারা পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে মিলে অপরাধ সংঘটিত করেছে তাদের বিচার করা। এর প্রধান টার্গেট করা হয় জামায়াতে ইসলামের সাবেক আমির অধ্যাপক গোলাম আযমকে। তার বয়স বর্তমানে ৯১ বছর। তিনি নানা রোগব্যাধিতে ভুগছেন। হুইল চেয়ার ছাড়া চলাফেরা করতে পারেন না। তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত করা হয়েছে। আদালত তার বয়সের প্রতি লক্ষ্য করে ৯০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে। গোলাম আযম দুই বছর ধরে কারাগারে রয়েছেন। ট্রাইব্যুনালের দ্বিতীয় টার্গেট জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ, তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে।

বাংলাদেশে স্থাপিত এই ট্রাইব্যুনাল ‘তামাশা’ ছাড়া আর কিছু নয়। নির্ভরযোগ্য সবগুলো মানবাধিকার সংস্থা এটাকে ‘অন্যায় ও অবৈধ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। চাক্ষুস সাক্ষ্য-প্রমাণ ছাড়া নিছক ধারণার ওপর বিচারকাজ চলছে। এর মূল টার্গেট জামায়াতে ইসলামকে সাজা দেয়া।

হাসিনা ওয়াজেদ এই ট্র্রাইব্যুনালের মাধ্যমে উত্তেজিত জনতার সস্তা আবেগ কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে চান। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হযেছে ৪২ বছর হয়ে গেছে। এই সময়ে হাসিনার দল আরো কয়েক বার শাসন ক্ষমতায় ছিলেন। কিন্তু সে সময় এই বিচারের গরজ বোধ করেননি তিনি। ২০০৮ সালের নির্বাচনে তিনি এ বিষয়টি সামনে নিয়ে আসেন।নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার দুই বছর পর তিনি ‘নামধারী’ এই ট্রাইব্যুনাল স্থাপন করেন। নির্বাচনের বাকি যখন মাত্র কয়েক মাস তখন তিনি বিচারের নামে ‘প্রহসন’ শুরু করেছেন।

জামায়াতে ইসলামী কখনো সন্ত্রাসী দল নয়। দলটি সব সময় গণতান্ত্রিক পন্থায় রাজনীতি করেছে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনেও দলটি অংশ নেয়। সে নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পর সবচেয়ে বেশি ভোট পায় জামায়াত। অন্যান্য রাজনৈতিক দলের মতোই জামায়াতও মনে করে শেখ মুজিবুর রহমানের ৬ দফা দেশের শান্তি-শৃঙ্খলায় বিঘ্ন ঘটাবে। ৭০ সালে পুরো নির্বাচনি কার্যাক্রমে জামায়াতকে আওয়ামী লীগের প্রতিরোধের মুখোমুখি হতে হয়। জামায়াতের প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা মওদুদিকে সভা করতে দেয়া হয়নি।

যখন সব রাজনৈতিক পথ বন্ধ হয়ে যায়, ইসলামাবাদ যখন বন্দুকের পথ বেছে নেয় এবং অপারেশন চালায় তখন জামায়াত বিশেষ কোনো পক্ষ অবলম্বন করেনি। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট বিদ্রোহে করে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ হয়। ভারতের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বাহিনী ছুটে আসে। এভাবে বড় যুদ্ধের দিকে ধাবিত হয় দেশ। ওই অবস্থায় পাকিস্তানপ্রেমী বাঙালিদের দুটি পথের একটি বেছে নিতে হয়-এক. বিদ্রোহী, দেশদ্রোহীদের পক্ষ নেয়া-যাকে ‘স্বাধীনতা সংগ্রাম’ নাম দেয়া হয়েছে এবং সরাসরি ভারতের ইন্ধনে যে যুদ্ধ পরিচালিত হচ্ছে তার সমর্থন দেয়া। দুই. বহু ত্যাগের বিনিময়ের অর্জিত পাকিস্তানের সুরক্ষায় চেষ্টা করা। জামায়াতে ইসলামীসহ পাকিস্তানপ্রেমী কিছু দল দ্বিতীয় পথ অবলম্বন করে। তবে ইতিহাসের নির্মম বাস্তবতা হলো, বিদ্রোহীরা বিজয়ী হয় এবং পূর্ব পাকিস্তান বাংলাদেশ নামে স্বতন্ত্র রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হয়।

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বাড়াবাড়ির কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। জামায়াতের তত্ত্বাবধানে গঠিত আল বদর, আল শামসও হয়ত কিছুটা সীমালঙ্ঘন করেছে, কিন্তু ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এবং মুক্তিবাহিনী কি তখন ফুল ছিটিয়েছে! জয়-পরাজয়ের কথা বাদ দিলে, মুক্তিবাহিনীর যুদ্ধাপরাধ সীমার বাইরে চলে গিয়েছিল। হাসিনা ওয়াজেদ যদি যথার্থই মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করেন তাহলে উভয়ের বিচার করতে হবে।

পাকিস্তান সরকারকে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে। লাখো বীর যারা আমাদের জন্য কষ্টের জীবন বেছে নিয়েছেন তাদের জন্য আমাদের আত্মমর্যাদাবোধ থাকা দরকার। মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নামে বাংলাদেশে যে ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়েছে তাকে শুধু জামায়াতের বিষয় হিসেবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। যারা ৪২ বছর আগে পাকিস্তানের জন্য লড়াই-সংগ্রাম তথা ত্যাগ স্বীকার করেছেন তাদের আমরা বাঁচাতে না পারলেও অনন্ত তাদের পক্ষে আওয়াজ তুলতে পারি। বিশ্বকে এই ‘অবৈধ’ ট্রাইব্যুনাল সম্পর্কে জানাতে পারি।


সম্পাদনা: শামীম ইবনে মাজহার,নিউজরুম এডিটর

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।