বাংলাদেশে এবারের নির্বাচনে প্রকৃতপক্ষে কেউই বিজয়ী হয়নি: দ্য হিন্দু

বাংলাদেশে এবারের নির্বাচনে প্রকৃতপক্ষে কেউই বিজয়ী হয়নি।  ভারতের ইংরেজি দৈনিক দ্য হিন্দু  পত্রিকাটির সম্পাদকীয়তে এই মন্তব্য করা হয়।

‘নো রিয়েল উইনার্স ইন বাংলাদেশ’ সম্পাদকীয়টিতে বলা হয়: “বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি (বিএনপি) এবং এর মিত্র ১৮ দলের নির্বাচন বর্জন, ব্যাপক সহিংসতা, প্রাণহানি ও সম্পদ বিনষ্ট এবং আওয়ামী লীগের জয়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষ হলো। নির্বাচন অনুষ্ঠানের সপ্তাহে ৩০ জনের মৃত্যু ঘটেছে এবং ভোটগ্রহণের দিন নির্বাচন বর্জনকারী দলগুলোর সমর্থকরা ভোটকেন্দ্র জ্বালিয়ে দিয়েছে। দেশটির নির্বাচন কমিশন বলছে, ৪০ শতাংশের কিছু কম ভোটার ভোট দিয়েছেন।”

“অন্যদিকে, বিরোধী দলগুলোর শক্ত দাবি, এর চার ভাগের এক ভাগ ভোট পড়েছে। এ সংখ্যা ২০০৮ সালের নির্বাচনে বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ৮০ শতাংশ ভোটারের অংশগ্রহণের ধারে কাছেও নেই, যা ওই বছর আওয়ামী লীগকে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়েছিল।”

“কিন্তু এবার দেশের ৩০০ আসনের অর্ধেকের বেশি আসনে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা না হওয়ায় আওয়ামী লীগ একটি ভোট পড়ার আগেই তাদের বিজয় নিশ্চিত করেছে। আর বাকি আসনগুলোতে তাদের বিপরীতে তাদেরই মিত্র দলের প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন এবং এর মধ্যে ১১০টি আসনে জয় পেয়ে দলটি ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে।”

“তবে এ নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোকে ‘কঠোর হাতে’ চলমান বিক্ষোভ-প্রতিবাদ দমনের নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু তার জানা থাকতে হবে যে, এ ধরনের নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্নটি খু্ব সহজে হারিয়ে যাবে না।”

“দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে দরিদ্রতা বিমোচন, পুষ্টিহীনতা দূরীকরণ, মাতৃমৃত্যু হার হ্রাস এবং লিঙ্গ বৈষম্য ঘোঁচাতে বাংলাদেশ ইতিমধ্যে ভারতের চেয়ে এগিয়ে যাওয়ার সুনাম অর্জন করলেও নির্বাচন ঘিরে এসব ঘটনায় সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে। হারিয়ে গেছে সরকারের বিগত বছরের অর্জন।”

“বিরোধী দলের সঙ্গে সংলাপে বসতে আমেরিকাসহ কয়েকটি পক্ষের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। তিনি ঘোষণা দেন যে, বিরোধী দল শুধুমাত্র সহিংসতা এবং সন্ত্রাসবাদ বন্ধ করে নিষিদ্ধ জামায়াতে ইসলামীকে ত্যাগ করলেই কেবল সংলাপ সম্ভব। এখন এই চলমান রাজনৈতিক সহিংসতা বন্ধ না হলে মধ্যবর্তী নির্বাচন দেয়াটা এর একমাত্র সমাধান বলে প্রতীয়মান হয়ে উঠতে পারে।”

“আওয়ামী লীগের এটা বোঝার সময় হয়েছে যে, ইসলামি মৌলবাদ দমনে তার সংগ্রাম ভালো। কিন্তু তা কেবলই একতরফা নির্বাচনে জয়ী হয়ে দেশে রাজনৈতিক মেরুকরণ সৃষ্টির মাধ্যমে সম্ভব নয়। বিএনপি নেতা খালেদা জিয়ারও প্রয়োজন রাস্তায় সহিংসতা-নাশকতা না চালিয়ে প্রতিবাদ প্রকাশের বিকল্প কার্যকর কোনো উপায় বের করা। ইসলামি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সুসম্পর্কের পরিণাম হিসেবে খালেদা জিয়ার দেখা উচিত, কট্টরপন্থী ইসলামিক দলগুলো পাকিস্তানের কী হাল করেছে।”

“নয়া দিল্লি বলছে, বাংলাদেশে শেখ হাসিনার এ নির্বাচন ‘সাংবিধানিক নিয়মতান্ত্রিকতা’। তবে দেখতে হবে, এর মাধ্যমে ভালো কোনো উদ্দেশ্য আদায় হচ্ছে কি না। বাস্তবিক অর্থে, এ নির্বাচন ক্ষমতা কুক্ষীগত করার নামান্তর বলে মনে হচ্ছে। ভারত যদি সত্যিকার অর্থেই বাংলাদেশের প্রতি গঠনমূলক এবং উদারনৈতিকভাবে সাহায্যের হাত বাড়াতে চায়, তবে দেশটিতে চলমান এই অচলাবস্থা নিরসনে শেখ হাসিনাকে আন্তরিকভাবে সাহায্য করতে হবে।”

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।