নিরাপত্তা উপদেষ্টা করেছেন নরেন্দ্র মোদি

তাদের পরামর্শ শিরোধার্য করে গোয়েন্দা শিরোমণি অজিত ডোভালকে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা করেছেন নরেন্দ্র মোদি। সাভারকরের জীবনী স্কুলপাঠ্য করার পক্ষে সওয়াল করেছে তার দফতর। কিন্তু তাও নতুন প্রধানমন্ত্রীর কার্যকলাপ নিয়ে কপালের ভাঁজ মেলাচ্ছে না সঙ্ঘ পরিবারের। মোদি যে ভাবে বিজেপির উপরে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে উঠে পড়ে লেগেছেন, তাতেই লাগাম হারানোর আতঙ্কে ভুগছেন সঙ্ঘের নেতারা।

বিজেপিতে যখন নেতৃত্বের লড়াই তুঙ্গে, জনপ্রিয়তার কারণেই সে সময়ে মোদিকে প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী বেছেছিল সঙ্ঘ। জনপ্লাবনে ভেসে আজ তিনি কুর্সিতে। প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ নেওয়ার পর আজ শনিবার ছিল প্রথম ছুটির দিন। দিনটা কাটালেন দলের সাধারণ সম্পাদকদের সঙ্গে বৈঠক করে। বিকেলে আলোচনা সারলেন রাজনাথ সিংহ, অরুণ জেটলি, নিতিন গডকড়ির মতো শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে। দলীয় নেতাদের প্রধানমন্ত্রী নিজের বাসভবনে ডেকে পাঠিয়ে আলোচনা করছেন এটাও দিল্লির রাজনীতিতে একটা নতুন নজির, যাকে দলের ওপর নিরঙ্কুশ আধিপত্য কায়েমের চেষ্টা বলেই মনে করছে আরএসএস।

সঙ্ঘের এই মনোভাব মোদিও বিলক্ষণ বুঝছেন। আগামী দিনে সঙ্ঘের সঙ্গে সংঘাতের আশঙ্কাও করছেন। কিন্তু সেই সংঘাত যাতে মাত্রা না-ছাড়ায়, সে বিষয়ে সতর্ক পদক্ষেপই করতে চাইছেন নরেন্দ্র মোদি। কার্যত, সংঘাত আঁচ করেই সরকার গড়ার পরে সপ্তাহ ঘুরতে না ঘুরতেই দলের সঙ্গে যোগসূত্র নিবিড় করতে চাইছেন তিনি। নিজের বাসভবনে দলের সাধারণ সম্পাদক ও অন্য নেতাদের ডেকে বোঝাতে চাইছেন, সরকার ও দল একে অপরের পরিপূরক। সাধারণ সম্পাদকদের মোদি বলেন, ভোটের সময় যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, তা পূরণ করার জন্য দলও যেন সরকারকে সাহায্য করে। সরকারের ভুল-ত্রুটি তারা যেন ধরিয়ে দেয়। সরকার ও সংগঠন মিলেমিশেই কাজ করবে।
আবার এটাও ঠিক, সরকারের রাশ নিজের হাতে তুলে নেওয়ার পর এবারে দলে নিয়ন্ত্রণ চান মোদি। পরবর্তী সভাপতি পদে নিজের পছন্দের লোক অমিত শাহই তার প্রথম পছন্দ। কিন্তু তাতে ঘোর আপত্তি সঙ্ঘের। প্রথমত, অমিত শাহের বিরুদ্ধে মামলার নিষ্পত্তি হয়নি। তা ছাড়া সঙ্ঘ জানে, অমিত সভাপতি হওয়া মানে সরকার ও দল উভয়েরই নিয়ন্ত্রণ মোদির হাতে চলে যাওয়া। তারা এখন বলছে, প্রধানমন্ত্রী ও দলের সভাপতি উভয়েই গুজরাট থেকে হলে দেশের অন্য অংশের নেতারা ক্ষুব্ধ হতে পারেন। তাই সঙ্ঘ এখন বিকল্প নাম নিয়ে আলোচনা করছে।
অটলবিহারী বাজপেয়ী যখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, সেই সময়ও আরএসএসের সঙ্গে সংঘাত নেহাত কম হয়নি সরকারের। সরকারের নানা সিদ্ধান্তের পদে পদে আপত্তি তুলতেন তৎকালীন সরসঙ্ঘচালক কে সুদর্শন। বাজপেয়ী সরকারের উদার অর্থনীতির বিরোধী ছিলেন তিনি। বিমা, টেলিকম বেসরকারিকরণের বিরোধিতাও করা হয়েছিল। স্বদেশি জাগরণ মঞ্চে বাজপেয়ী সরকারের উদার অর্থনীতির বিরুদ্ধে প্রস্তাব গ্রহণ করে সরকারকেই অস্বস্তির মুখে ফেলে দেন গোবিন্দাচার্য। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় সরকারের অবস্থানের বিরোধিতাতেও সরব হন সঙ্ঘ নেতা কুশাভাও ঠাকরে। যশোবন্ত সিংহকে বাজপেয়ী যখন অর্থমন্ত্রী করে নিয়ে আসেন, সেই সময়ও সঙ্ঘ তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিল। কিন্তু সে সময়ে সঙ্ঘের সঙ্গে যোগসূত্র বজায় রেখে সরকারের পক্ষে সব সামলে চলতেন লালকৃষ্ণ আদবানি।
মোদির কাছে সঙ্ঘের প্রত্যাশার তালিকাও ছোট নয়। এই বিপুল জয়ের পর মোদি সংবিধানের ৩৭০ ধারা বিলোপ, রামমন্দির নির্মাণ, অভিন্ন দেওয়ানি বিধি, গরু জবাই বন্ধের মতো বিষয়গুলি কার্যকর করতে সক্রিয় হবেন, সঙ্ঘের অনেক নেতাই সেই আশা করেন। মুরলীমনোহর জোশী মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রী থাকার সময় যেভাবে শিক্ষায় গৈরিকিকরণে উদ্যোগী হয়েছিলেন, সঙ্ঘ চায় মোদি সরকারও তা অনুসরণ করুক।

কিন্তু এখনও পর্যন্ত মোদি সঙ্ঘের আশাপূরণের কোনো ইঙ্গিত দিচ্ছেন না। প্রধানমন্ত্রী দফতরের প্রতিমন্ত্রী হয়ে জিতেন্দ্র সিংহ যখন ৩৭০ ধারা বিলোপ নিয়ে আলোচনার দাবি তুললেন, সঙ্ঘ নেতৃত্ব সে’টি লুফে নেয়। আরএসএস নেতা রাম মাধবও বিষয়টি নিয়ে গোটা দেশে বিতর্ক দাবি করেন। মোদি কিন্তু সেই মন্ত্রীকে ধমকে বক্তব্য প্রত্যাহার করান। সঙ্ঘ চায়, পাকিস্তানের সঙ্গে চড়া সুরে কথা বলুন মোদি। মোদি উল্টো শান্তির পায়রা ওড়াচ্ছেন। ভোটের আগে যে যশোবন্ত সিংহকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল, তাকেই আবার ফিরিয়ে আনতে চাইছেন নতুন প্রধানমন্ত্রী।
তাদের পরামর্শ মেনে মোদি ডোভালকে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা করেছেন বটে, কিন্তু তার পরেও তার কাজে স্বস্তি পাচ্ছে না আরএসএস।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।